মাদক বিরোধী আদর্শে ইসলাম | প্রথম পর্ব

মাদক বিরোধী আদর্শে ইসলাম | প্রথম পর্ব

মাহতাব উদ্দীন নোমান : আল্লাহ তাআলা মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁর ইবাদতের জন্য। আর পৃথিবীর অন্য সব প্রাণী মানুষের খেদমতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। মানুষ ও পশুর মধ্যে পার্থক্য হলো, মানুষের বিবেক-বুদ্ধি আছে আর পশুর বিবেক-বুদ্ধি নেই। সুতরাং এই সৃষ্টির সেরা মানুষের যদি বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে যায়, তাহলে সে পশুর মত হয়ে যায়। পশুর স্বভাব তার মধ্যে এসে যায়। তখন হিংসা-বিদ্বেষ, শত্রুতা, লোভ-লালসা, চুরি-ডাকাতি, যিনা-ধর্ষন সমাজের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের শান্তির সমাজ নরকে পরিণত হয়।

মাদক এমন একটি পদার্থ, যা মানুষের বিবেক-বুদ্ধি ও দৈহিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি সাধন করে, ক্ষতি সাধন করে তার দ্বীন ও দুনিয়ার। মাদক একজন ব্যক্তিকে, একটি পরিবারকে, একটি সমাজকে, একটি রাষ্ট্রকে ধ্বংসের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে দেয়।

আদিকাল থেকে আরবে মাদকের খুব প্রচলন ছিল। যার ঘরে যত পুরাতন মদ থাকত তাকে ততো ধনী মনে করা হত। যারা মদের ব্যবসা করতো তাদেরকে সমাজের সম্মানিত মানুষ মনে করা হতো। মদ তাদের কাছে সর্বাধিক প্রিয় পানীয় ছিল। মদ ব্যতীত তাদের একদিন অতিবাহিত হওয়া কল্পনাতীত বিষয় ছিল । এর কারনে তাদের সমাজে এমন কোন হীন কাজ ছিল না, যা থেকে তারা বিরত থাকতো। জুলুম-নির্যাতন, অন্যের ক্ষতি সাধন, লুটতরাজ ইত্যাদি তাদের দৈনন্দিনের কাজ। তাদের সমাজে কোন ব্যক্তি নিরাপদে জীবন যাপন করতে করতে পারতো না। তাদের সময়কেই অন্ধকারের সময় বলা হয়।

সমাজে ব্যাপক প্রচলনের দিকে লক্ষ্য রেখে প্রাথমিক পর্যায়ে ইসলাম মাদককে নিষেধ করেনি। সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর মাঝেও কেউ কেউ মদ্যপান করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় হিজরতের পরে কিছু সাহাবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে মদ ও জুয়ার বিধান জানতে চান। আল্লাহ তাআলা তখন আয়াত নাযিল করেন,

তারা আপনার কাছে মদ ও জুয়ার বিধান জিজ্ঞাসা করে, আপনি তাদেরকে বলে দিন, উভয়ের মধ্যে গুরুতর পাপ রয়েছে এবং মানুষের জন্য উপকারও রয়েছে। কিন্তু এগুলোর উপকার অনুপাতে পাপ অনেক বড়। (সূরা বাকারা, আয়াত নং -২১৯)

উক্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলা শুধু মদের উপকার ও অপকারের কথা বর্ননা করে এর অপকারের দিক বেশি বলে সতর্ক করেছেন। কিন্তু মদ্যপান করতে সুস্পষ্ট ভাবে নিষেধ করেননি।

ঘটনাক্রমে একদিন হযরত আব্দুর রহমান বিন আওফ রা. কিছু সাহাবীকে দাওয়াত করলেন এবং তাদের জন্য মদের ব্যবস্থা করলেন। তারা সবাই মদ পান করে নেশাগ্রস্ত হয়ে গেলেন। মাগরিবের সময় হলে তারা নামাজে দাঁড়ালেন। কিন্তু তাদের ইমাম নেশাগ্রস্ত হওয়ার কারনে কেরাতে অনেক ভুল হলো। এই প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা আয়াত নাযিল করলেন,

হে মুমিনগন! নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের কাছেও যেও না যতক্ষন না তোমরা ভালো ভাবে বুঝতে পারো যা তোমরা মুখে বলো। (সূরা নিসা, আয়াত নং -৪৩)

তখন সাহাবায়ে কেরাম নামাজের সময় ছাড়া অন্য সময় মদ্যপান করতে লাগলেন। যেহেতু তখনও এ সম্পর্কে স্পষ্ট বিধান আসেনি।

কিন্তু যেহেতু মদ্যপান মানুষকে পশু বানিয়ে দেয়, এর দ্বারা সমাজ ও রাষ্ট্রে কল্পনাতীত ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়, এবং সমাজে ফেৎনা সৃষ্টি হয়, তাই তৃতীয় হিজরীর শেষ দিকে আল্লাহ তাআলা মাদকের ব্যাপারে চূড়ান্ত বিধান নাযিল করেন। ইরশাদ করেন,

হে ঈমানদারগন! মদ, জুয়া, মুর্তি পুজার বেদী ও পাশা (ভাগ্য নির্ধায়ক শর) অত্যন্ত নাপাক, শয়তানী কাজ। অতএব তোমরা এসব কাজ বর্জন কর যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।

শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর জিকির ও নামাজ থেকে বিরত রাখতে চায়। তোমরা কি (এসব মন্দ কাজ থেকে) বিরত থাকবে না ? (সুরা মায়েদা, আয়াত নং – ৯০-৯১)

এখানে আল্লাহ তাআলা মাদক ও জুয়াকে শয়তানের কাজ, এবং শয়তান এর দ্বারা মানুষের মধ্যে পরস্পর শত্রুতা, হিংসা বিদ্বেষ সৃষ্টি করা এবং শয়তান মানুষকে আল্লাহর জিকির ও নামাজের মত ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ থেকে বিরত রাখার কথা স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দিলেন এবং কেয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির উপর মাদক হারাম করে দিলেন।

এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সাথে সাথেই সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের কাছে সংরক্ষিত সব মদ মাটিতে ফেলে দিলেন। যারা মাত্রই মুখে মদ নিয়েছেন, তারাও ঘোষণা শোনামাত্রই মুখ থেকে মদ ফেলে দিলেন।

হযরত আনাস রা. বলেন, একদিন আমি আবু তালহার বাড়িতে লোকজনকে মদ পান করাচ্ছিলাম। সেদিন তারা ফাজিখ নামক মদ পান করছিল। এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তিকে আদেশ করলেন এই মর্মে ঘোষণা দিতে যে, ‘সাবধান! এখন থেকে মদ হারাম করে দেওয়া হয়েছে’।

এই ঘোষণা শুনে আবু তালহা আমাকে বললেন, ‘বাহিরে যাও এবং ঘরের সমস্ত মদ ফেলে দাও।’ আমি বাহিরে গেলাম এবং সমস্ত মদ রাস্তায় ঢেলে দিলাম।

আনাস রা. বলেন, সেদিন মদিনার রাস্তাঘাটে মদের প্লাবন বয়ে গিয়েছিল। (বুখারী, হাদীস নং : ২৪৬৪, মুসলিম, হাদীস নং : ১৯৮০)

কিন্তু মাদকের ভয়াবহতার ছোবল থেকে উম্মতকে রক্ষা করতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কেবল এই বিধানই পৌঁছে দেননি, ধারাবাহিকভাবে নানা সময়ে উম্মতকে এই বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। আগামী পর্বে হাদীসের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা থাকছে।

মাদকের সহজলভ্যতার এই যুগে আমাদের তাই এই বিষয়ে সবসময় সজাগ ও সচেতন থাকবে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফিক দান করুন।

লেখকঃ খতীব ও শিক্ষক

 

( আগামী পর্বে সমাপ্য)

 

আরও পড়ুনঃ মাদকাসক্তের মাদকে বছরে খরচ ৬০ হাজার কোটি টাকা!

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *