মাওলানা ওয়াহিদুদ্দীন খান : ১৫ নভেম্বর ১৯৬৮ সাল। মর্মান্তিক এক গাড়ি দুর্ঘটনায় শহীদ হলেন মাওলানা আসআদ মাদানী রহ.-এর শ্বশুর দারুল উলুম দেওবন্দের শূরা সদস্য মাওলানা হামিদউদ্দীন ফয়জাবাদী। আক্রান্ত হলেন গাড়ির ড্রাইভারও। দুর্ঘটনায় হযরতের স্ত্রী এবং তার সন্তান গুরুতরভাবে আহত হন।
মাওলানা মাদানী ১৬ নভেম্বর দেওবন্দে তাদের দাফন সম্পন্ন করার পর ১৭ তারিখ একটি প্রাদেশিক বৈঠকে দিল্লী চলে যান। এদিকে ১৯ তারিখ হাসপাতালে হযরতের ছেলের ওফাত হয়ে যায়। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার ওপর ১৯৬৮ সালের ২৯ নভেম্বর আল জামিয়া-তে একটি নিবন্ধ লিখেন মাওলানা ওয়াহিদউদ্দীন খান। নিবন্ধটির শিরোনাম ছিলো ” মাওলানা মাদানীর দুর্ঘটনা!”
খাঁন সাহেব তার নিবন্ধে লিখেন, মুজাফফর নগরের পুলিশ প্রধান যখন দুর্ঘটনার তদন্ত করতে চাইলেন, তখন মাওলানা মাদানী তা করতে নিষেধ করে দিলেন। তিনি বললেন, যা হবার তাই হয়েছে। এখন আর আইনি তদন্ত করে কী হবে? যে যাবার সে চলে গেছে, যার থাকবার সে থেকে গেছে। আইয়ুব জাফর সাহেব খুব মুশকিলে পড়ে গেলেন। তার গলা আটকে আসছিলো। তিনি বেদনাতুর হৃদয়ে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে মাওলানা মাদানীকে হাসপাতাল থেকে আসা ছেলের মৃত্যু সংবাদ জানালেন। কিন্ত মাওলানা কঠিন এ দুঃখের সংবাদটি এভাবে শুনলেন যেন তার কিছুই হয়নি। কোনও শোক ও কাতরতা স্পর্শ করেনি তাকে। যেন যা হবার তাই হয়েছে, এখন আর এ নিয়ে দুঃখ করে লাভ কী!
এ দুর্ঘটনায় কেন্দ্রীয় জমিয়ত তাদের বেশ কটি বৈঠক স্থগিত করার ঘোষণা দিল। যেখানে তার উপস্থিতি আবশ্যক ছিল। মাওলানা সাহেব এ সংবাদ শুনে অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে বললেন, এসব ঘটনার জন্য কী আমরা আমাদের কাজ বন্ধ করে দেব? বললেন, এখনি সবাইকে জানিয়ে দাও নির্ধারিত সময়েই বেঠক অনুষ্ঠিত হবে। লক্ষনীয় হলো, এখানে মাওলানা মাদানী কি আশ্চর্যজনকভাবে প্রতিটি দুঃসংবাদে ধৈর্যধারণ করেছেন। মোকােবলা করেছেন প্রতিটি হতাশা ও প্রবল কষ্টসমূহকে।
এক ব্যক্তি তার স্মৃতিচারণে বলেছিলেন, ‘মাওলানা মাদানী অস্বাভাবিক শক্তিশালী স্নায়ুবিক সম্পন্ন একজন মানুষ’ গভীর শোকের ভেতরও তার জাদুকরি বক্তৃতার বিভা মানুষের মাঝে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতো।
আরেকজন তার স্মৃতি টেনে বলেন, এই মানুষটি, মানুষের প্রকৃত চরিত্রকে পেছনে ফেলে আরো সামনে চলে এসেছিলেন। অমন কঠিন সময়েও মাওলানা মাদানী যেভাবে স্থির, দৃঢ়পদ ও অদম্য সাহস নিয়ে স্থিতিশীলতাকে জয় করেছেন। এরদ্বারা মূলত এটাই বোঝা যায় যে, নেতা কারা হবে। এই মহান দায়িত্বটির ভার বইতে পারবেন কারা! জাতীর নেতা সেই যে তার ব্যক্তিগত সব দুঃখ, বিষাদ ও দুশ্চিন্তাকে জাতির ভাবনায় ম্লান করে দেন। মাওলানা মাদানী তা করতে পেরেছিলেন। তার এ ঘটনাই এর প্রমাণ রাখে যে তিনি ছিলেন ধৈর্যের মূর্তপ্রতিক।
অনুবাদ : কাউসার মাহমুদ
সম্পাদনা : মাসউদুল কাদির
সূত্র : আল জামিআ- ২৯ নভেম্বর ১৯৬৮


