মাসুদ আজহারকে ‘সন্ত্রাসী’ ঘোষণায় চীনা বাধার রহস্য কী?

মাসুদ আজহারকে ‘সন্ত্রাসী’ ঘোষণায় চীনা বাধার রহস্য কী?

মাসুদ আজহারকে ‘সন্ত্রাসী’ ঘোষণায় চীনা বাধার রহস্য কী?

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : চীন বাধা দিয়েছে আর কূটনীতিতে ব্যর্থ হয়েছে ভারত। সেটা যাই আপাতত মাসুদ আজহারকে কী কারণে একহাত নিয়েছে চীন? তাদের লাভটা কী? এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। এটা ব্যক্তি মাসুদ আজহারকে রক্ষা করলো নাকি গোটা পাকিস্তানকেই একহাত নিলো চীন। সেটাই ভাবনার বিষয়। বাস্তব খবরটা হলো, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে জৈশ-ই-মুহম্মদের প্রধান মাসুদ আজহারকে ‘গ্লোবাল টেররিস্ট’ বা ‘বৈশ্বিক সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রস্তাব আবার চীনের বাধায় প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।

গত মাসে জৈশ-ই-মুহম্মদ ভারত-শাসিত কাশ্মীরের পুলওয়ামাতে আত্মঘাতী হামলার দায় স্বীকার করার পর থেকেই ভারত নতুন করে এই চেষ্টা শুরু করেছিল।

এরপরই আমেরিকা, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স যৌথভাবে নিরাপত্তা পরিষদে মাসুদ আজহারের বিরুদ্ধে এই প্রস্তাব এনেছিল।

কিন্তু এর আগেও অন্তত তিনবার চীন এধরনের প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে – এবারেও তার ব্যতিক্রম হল না।

কিন্তু মাসুদ আজহারকে আন্তর্জান্তিকভাবে কোণঠাসা করতে ভারতের কূটনৈতিক চেষ্টা কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে? চীন কি কারণে জৈশ-ই-মুহম্মদেরই নেতাকে সন্ত্রাসী ঘোষণা করতে দিচ্ছে না? এক কারণ কি কূটনৈতিক, না কি কৌশলগত?
পাকিস্তানভিত্তিক জৈশ-ই-মুহম্মদের প্রধান মাসুদ আজহারকে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করতে জাতিসংঘে এই প্রস্তাবটি আনা হয়েছিল ১২৬৭ আল কায়দা স্যাংশনসের আওতায়।
নিরাপত্তা পরিষদে এটি গৃহীত হলে মাসুদ আজহার ও তার সংগঠনের বিরুদ্ধে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা, বিদেশ সফর ও অস্ত্র সংগ্রহ নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার পথ প্রশস্ত হত।
ভারতের অনুরোধে সাড়া দিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের তিন স্থায়ী সদস্য দেশ আমেরিকা, ব্রিটেন ও ফ্রান্স যৌথভাবে প্রস্তাবটি এনেছিল- কিন্তু শেষ পর্যন্ত আগের তিনবারের মতোই চীনের ভেটোতেই তা আবারও খারিজ হয়ে গেল।
ভারতের অন্যতম বিরোধীদলীয় নেতা আসাদউদ্দিন ওয়াইসির কথায়, চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দোলনায় ঝুলে নরেন্দ্র মোদী যে কূটনীতি করতে চেয়েছিলেন – এটা তারই ব্যর্থতা।
আসাদউদ্দিন ওয়াইসি তীর্যক মন্তব্য করে বলেন, এক দিকে চীন একজন জঙ্গিকে কালো তালিকাভুক্ত করার চেষ্টায় বাধা দিচ্ছে – অথচ সেই চীনকেই আবার আমরা ভারতীয় সেনাদের বুলেটপ্রুফ ভেস্ট কেনার জন্য প্রায় সাড়ে ছশো কোটি রুপির অর্ডার দিচ্ছি। তো এটা ‘দোলনা কূটনীতির’ ব্যর্থতা ছাড়া আবার কী?
ভারতে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীও এদিন টুইট করেছেন, দুর্বল মোদী আসলে চীনা প্রেসিডেন্টের ভয়ে ভীত। চীন যখন ভারতের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয় – তখন তিনি ভয়ে মুখই খুলতে পারেন না।
তবে প্রধানমন্ত্রী মোদী নিজে এদিন কোনও মন্তব্য না-করলেও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে স্বীকার করেছে, চীনের পদক্ষেপে তারা অত্যন্ত হতাশ।
কিন্তু গত প্রায় এক দশক ধরে বারবার জাতিসংঘে ভারতের এই ধরনের পদক্ষেপ কেন ব্যর্থ হচ্ছে, কেন তারা জঙ্গিবাদের বিপদ নিয়েও চীনকে বোঝাতে পারছে না?
দিল্লির জেএনইউ-তে চীন গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান ড: অলকা আচারিয়া বলছিলেন, আমি চীনের সিদ্ধান্তে এতটুকুও অবাক নই, কারণ চীনের অবস্থানে এতদিনেও কোনও পরিবর্তন হয়নি। চীন বরাবরই বলে এসেছে, এই ব্ল্যাকলিস্টিং নিছকই একটা টেকনিক্যালিটি।
অধ্যাপক আচারিয়া বলেন, তাই যদি হয়, ভারত কেন তাহলে তার সমাধান দিতে পারেনি? আর যদি এটা চীনের সামরিক বা কৌশলগত অবস্থানই হয়, তাহলেও তো ভারতের উচিত ছিল এমন কোনও পদক্ষেপ নেওয়া যাতে চীন এই ইস্যুটাকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয়!
জেনেভাতে ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস কনফারেন্সের প্রধান বশির নাভিদ এদিন মন্তব্য করেছেন, তার ধারণা পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের ভেতর দিয়ে যে চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর যাচ্ছে, জৈশ-ই-মুহম্মদ সেটার নিরাপত্তায় সাহায্য করতে পারে – এই ধারণা থেকেই বেজিং কিছুতেই মাসুদ আজহারের বিরুদ্ধে যাচ্ছে না।

কিন্তু সেটাই যদি বাস্তবতা হয়, তাহলে চীনকে রাজি করানোর জন্য ভারতের হাতে উপায়টাই বা কী?
দিল্লিতে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ পি কে সেহগল মনে করেন, ভারতের বা আন্তর্জাতিক বিশ্বের সংবেদনশীলতা নিয়ে চীনের আসলে কোনও মাথাব্যথাই নেই।

“কিন্তু তাদেরও এটা বোঝাতে হবে যে সব খেলাতেই দুটো পক্ষ থাকে, আর একজন যদি বারবার অন্যজনের সংবেদনশীলতা উপেক্ষা করতে থাকে তাহলে সে-ও কিন্তু একই জিনিস করতে পারে।”

“ফলে আমার মনে হয় ভারতের এখন ‘তাইওয়ান বা তিব্বত কার্ড’ বেশি করে খেলা উচিত, যাতে চীনকেও অস্বস্তিতে ফেলা যায়”, বলছেন মি সেহগল।

তবে গত দশ বছরে কখনই মাসুদ আজহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চীনকে বোঝাতে পারেনি ভারত – এখন দেখা গেল পুলওয়ামাতে বিধ্বংসী জঙ্গি হামলার পরও সেই পরিস্থিতি বিন্দু বদলায়নি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *