মা ও শিশুস্বাস্থ্য রক্ষায় পরিবেশবান্ধব চুলা

মা ও শিশুস্বাস্থ্য রক্ষায় পরিবেশবান্ধব চুলা

সচেতনতা। আব্দুল বাতিন বাবু

মা ও শিশুস্বাস্থ্য রক্ষায় পরিবেশবান্ধব চুলা

দেশে প্রতিবছর রান্নাঘরের ধোঁয়ার কারণে লাখ লাখ শিশু ও নারী শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত রোগ যেমন- যক্ষ্মা, অ্যাজমা, হৃদরোগ, চোখের সমস্যা ও ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগে ভোগে এবং মারা যায়। আর ঘরে বায়ুদূষণের শিকার হওয়া শতকরা ৭০ ভাগই হচ্ছে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু।

শুকনো গোবর, পাটকাঠি, কাঠ ও অন্যান্য কৃষিজাত পণ্যের আবর্জনা দিয়ে দেশের শতকরা ৮০ ভাগ নারী বিশেষ করে যারা গ্রামে বাস করে তারা এখনও রান্নার কাজে এসব চিরাচরিত জ্বালানি ব্যবহার করে থাকে। তাদের অধিকাংশ পরিবারই ঘরে অপর্যাপ্ত বায়ুনির্গমন ব্যবস্থায় সনাতনী মাটির চুলা ব্যবহার করে। এ চুলায় প্রচুর ধোঁয়া হয়। এ ধোঁয়ায় থাকে কার্বন মনোক্সাইড যা ক্যান্সারসহ নানারকম রোগ সৃষ্টিকারী উপাদান তৈরি করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দূষণের মাত্রা গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে অনেক গুণ বেশি থাকে। যেসব নারী এসব চুলায় রান্না করেন তারা এবং তাদের শিশুরা এসব উচ্চমাত্রার বিষাক্ত ধোঁয়ার মধ্যে অরক্ষিত অবস্থায় থাকে প্রতিদিন তিন থেকে সাত ঘণ্টা।

রান্নার কাজে জৈব উপকরণের ওপর নির্ভরশীলতা আমাদের দেশে গ্রামগঞ্জে অন্তত আরো কয়েক বছর থেকেই যাবে। তবে বর্তমানে গ্রামেও অনেক বাড়িতে সিলিন্ডার গ্যাস (এলপি) গ্যাসের রান্না করা হচ্ছে এবং সনাতনী চুলার পরিবর্তে বন্ধু চুলা ব্যবহার করা হচ্ছে। এখন শতকরা ৭৩ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার মধ্যে এসেছে। সরকার ২০২১ সালের মধ্যে সবার ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। আমদের দেশে গ্রামাঞ্চলে শতকরা ৭০ ভাগ মানুষের বসবাস করে। শহরকেন্দ্রিক প্রায় শতভাগ মানুষ প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলপি গ্যাসে রান্না করে। তবে গ্রামে এখন মানুষ জৈব জ্বালানীর ওপর নির্ভরশীল। তাই রান্নাবান্নায় চুলার ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। মাটির চুলায় জ্বালানি পুড়িয়ে যতটুকু তাপশক্তি পাওয়া যায়, তার সামান্যই কাজে লাগে। এ চুলা থেকে সৃষ্ট গ্যাস ও বিভিন্ন ভাসমান কণা ব্যবহারকারীর স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। সেই সাথে দূষণ সৃষ্টি করে পরিবেশের। এ সমস্যার সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ ও ব্যাপকভাবে পরিবেশবান্ধব উন্নতমানের চুলা ব্যবহার করা দরকার।

বাংলাদেশ সরকারের জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট এবং জার্মান সংস্থার যৌথ অর্থায়নে পরিবেশ অধিদপ্তর পরিবেশবান্ধব চুলার বাজার উন্নয়নে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ চুলার নাম ‘বন্ধুচুলা’। ২০১২ সালের এপ্রিল থেকে প্রকল্পটির আওতায় সারাদেশে বন্ধুচুলা স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হয়। এর আগে গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমণ কমানোর লক্ষ্যে ২০০৬ সাল থেকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং জার্মান সরকারের যৌথ উদ্যোগে সারাদেশে বন্ধুচুলা তৈরির পদক্ষেপ নেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে আইলাদুর্গত সাতক্ষীরার শ্যামনগরে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি চুলা স্থাপন করা হলেও পরে দেশের অধিকাংশ জেলায়ই এ চুলা স্থাপনের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়।

বন্ধুচুলা উন্নত চুলার একটি পরিমার্জিত, পরিবেশবান্ধব, জ্বালানি সাশ্রয়ী এবং স্বাস্থ্যসম্মত সংস্করণ। বন্ধুচুলার সুবিধা অনেক। এ চুলা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত জৈব উপকরণ অনেক বেশি দক্ষতার সাথে জ্বালায়। ফলে এর ব্যবহারে ৫০ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় হয়, রান্নার সময় কম লাগে। একইসাথে আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এটিকে এমন কাঠামোতে তৈরি করা হয় যেন রান্নার সময় সৃষ্ট ধোঁয়া ও বিষাক্ত উপকরণগুলো পদ্ধতিগতভাবে ঘর থেকে বের হয়ে যায়, যা ঘরের লোকদের বিশেষত নারী ও শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করে ও তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাস পায়। এ চুলা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমণ হ্রাস করে গ্রিনহাউজ ইফেক্ট কমাতে সাহায্য করে। এটি জ্বালানি খরচ অর্ধেক কমিয়ে আনে, রান্নাঘর ধোঁয়া ও দূষণমুক্ত রাখে। চোখ জ্বালা, হাঁপানি, মাথাব্যথা ও ক্যান্সারের মতো রোগের ঝুঁকি অনেক কমায়। রান্নাঘর পরিচ্ছন্ন, কালি ও ঝুলমুক্ত থাকে এবং অগ্নিজনিত দুর্ঘটনার আশংকা কমায়।

জৈব জ্বালানির ধোঁয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা পৃথিবীর অনেক দেশের পরিবারের জন্য সাধারণ বিষয়। যারা রান্না ও তাপ সৃষ্টির কাজে প্রধানত কাঠ, শস্য ও শস্যগুল্মের অবশিষ্টাংশ এবং পশুর গোবর ব্যবহার করে থাকে। উন্নয়নশীল বিশ্বে এসব জৈব জ্বালানির ব্যবহার তুলনামূলক অনেক বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, শ্বাসনালির বিভিন্ন সংক্রমণ ও রোগের জন্য ঘরের ধোঁয়ায় আক্রান্ত হওয়া অন্যতম কারণ। শিশু, গর্ভবতী নারীদের রোগ প্রতরোধ ক্ষমতা কম থাকে তাই তারাই বেশি আক্রান্ত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব মতে, এর ফলে বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর এক থেকে দুই মিলিয়ন লোকের অকাল মৃত্যু হয়। স্বাস্থ্য সাময়িকী ল্যানচেটের গবেষণায় যক্ষ্মা, চোখে ছানি রোগ, জন্মত্রুটি, ক্যান্সার এবং অ্যাজমার সাথেও এর সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়েছে।

সারাদেশে সব মাটির তৈরি সাধারণ চুলার পরিবর্তে বন্ধু চুলার ব্যবহার করা গেলে হাজার হাজার জীবন রক্ষা পাবে, পাশাপাশি প্রতিবছর জৈব জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস করা সম্ভব হবে। এর ফলে বাংলাদেশে কেবল জ্বালানি অবস্থারই উন্নতি হবে না বরং বন সংরক্ষণ এবং পরিবেশ রক্ষায়ও তা বিরাট ভূমিকা রাখবে। সাধারণ মাটির তৈরি চুলার সৃষ্ট ধোঁয়া নিউমোনিয়া বা অনুরূপ রোগ সৃষ্টির সাথে সংশ্লিষ্ট। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, খোলা ও সাধারণ চুলা থেকে সৃষ্ট ধোঁয়ার প্রভাবে নারী ও ছোটো শিশুরা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে।

গবেষণায় আরো দেখা গেছে, যেসব বাড়িতে তাদের রান্নার জন্য বন্ধুচুলা বা ধোঁয়া হ্রাসকারী চিমনি লাগানো থাকে সেসব বাড়ির ছেলেমেয়েদের মধ্যে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার হার এক-তৃতীয়াংশ কম। আবার সাধারণ চুলার ধোঁয়ায় আক্রান্ত হওয়া গর্ভবতী মায়ের শিশুদের বুদ্ধাংক বা ওছ কম হওয়ার আশংকা বেশি থাকে।

পরিবার পর্যায়ে বা রান্নার কাজে ব্যবহারের জন্য ধোঁয়ায় আক্রান্ত হওয়া একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা। এ সমস্যা থেকে অনেকাংশে মুক্তি দিতে পারে বন্ধুচুলা। সরকার পরিবেশবান্ধব বন্ধু চুলা ব্যবহারে উৎসাহিত করছে, পাশাপাশি এলপি গ্যাসের দামও কমিয়েছে। আশার কথা গত কয়েক বছরে এ চুলার ব্যবহার ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ চুলা তৈরিতে খরচও বেশি হয় না, স্বাস্থ্যসম্মতও বটে। তাই এ চুলা তৈরিতে অনেকেই এখন বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন। আর পরিবেশবান্ধব হওয়ায় গ্রামাঞ্চলের মানুষের মধ্যেও এ চুলা ব্যবহারের হার বাড়ছে। পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলের একটু স্বচ্ছল পরিবারের মধ্যে এলপি গ্যাস ব্যবহারের হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আমাদের মত জনবহুল দেশে সবাই এলপি গ্যাস ব্যবহার করতে না পাড়লেও পরিবেশবান্ধব বন্ধুচুলার ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। এ চুলা ব্যবহারের উপকারিতা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে এসব বিষয়ের জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টতা বিবেচনার গুরুত্ব ও প্রয়োজন তুলনামূলক বেশি। তাই শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যসহ সার্বিক পরিবেশগত দিক বিবেচনায় পরিবেশবান্ধব বন্ধুচুলার ব্যবহার আমাদের দেশে অত্যন্ত প্রয়োজন। পিআইডি নিবন্ধ

লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *