মুক্তিযুদ্ধে আলেম সমাজ | মাসউদুল কাদির

মুক্তিযুদ্ধে আলেম সমাজ | মাসউদুল কাদির

মুক্তিযুদ্ধে আলেম সমাজ

মাসউদুল কাদির ● মুক্তিযুদ্ধে কাদের অবদান বেশি? এমন প্রশ্ন করলে এককথায় একটা জবাব দেয়া যায়, ঈমানদার মুক্তিযোদ্ধারাই বেশি মুক্তিবাহিনীর খাতায় নাম লিখিয়েছেন। এমন কি সারিবেঁধে মাঠে দাঁড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধারা নামাজ আদায় করেছেন। আর যদি দেশের হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে পার্সেন্টিস আকারে হিসাব করি তাহলে নব্বই আর দশ দিয়ে হিসাব কষলেই বেরিয়ে যাবে কত মানুষ আসলে ঈমানদার মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। এখানে যদি সেকুলার বা ধর্মহীন কোনো জনগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করা হয় সে ক্ষেত্রে হিসাব তুলে ধরার কিছু নেই। কারণ এ হিসাব কষে বুঝানোর কিছু নেই। দেশের যেখানেই মুসলমান ছিলো সেখানেই রাজাকাররা সুবিধা নিতে চেয়েছে এটা সত্য তবে একসময় তারা তাড়া খেয়েছে। কেবল দেশের মুসলমান বা আলেম সম্প্রদায় নয় বিদেশের মুসলমান ও আলেম উলামা এ দেশের মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন।

ভারতের শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী এমনি এমনিই বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করেননি। তিনি সেখানকার আলেম উলামা ও সাধারণ মুসলমানদের ভয় পাচ্ছিলেন। কিন্তু সত্যিকার অর্থে জমিয়তে উলামা হিন্দ বাংলাদেশের মুসলমানদের পাশে দাঁড়ানোর গল্পটা দারুণ, উপভোগ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ইতিহাসে জমিয়তে উলামা হিন্দের নাম সেভাবে আসেনি। ধন্যবাদ জানাই, বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। মুক্তিযুদ্ধের বিদেশী বন্ধু আওলাদে রাসূল সাইয়্যিদ আসআদ মাদানী রহ.কে মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা দেয়া হয়েছে।

আমরা জানি, দেশের অগণিত মানুষের আত্মত্যাগের ফসল লালসবুজের স্বাধীনতা। আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগীপ্রাণদাতাদের, শহীদদের; যেসব নারী ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, তাদেরও।

দেশের মানুষ নয় মাস চরম বিভীষিকাময় অবস্থায় কাটালেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্সের ময়দানে মুক্তির বার্তা দিয়ে তখন থেকেই পাকিদের শূলে পরিণত হন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে আটক করে পাকিস্তানে নিয়ে তারা। চরম অন্ধকার প্রকোষ্টে আটকে রাখে নয় মাস। বঙ্গবন্ধুকে আঁতাতের প্রস্তাব দিয়েও গলাতে পারেননি শেষে ভুট্টু খান। শেষে শির উঁচু করে বাংলাদেশে ফিরেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এতে ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের প্রখ্যাত আলেম মাওলানা সাইয়্যিদ আসআদ মাদানী রহ.-এর অবদানও। ইন্দিরাকে বাংলাদেশের পক্ষে সহযোগিতার জন্য তিনি উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।

পেছনের ইতিহাসটা কেমন? রাজধানীর রেসকোর্স ময়দান জ্বলন্ত সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছে। ১৯৭১ সালের এই দিনে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ শেষে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আত্মসমর্পণ করেছিল পাকহানাদার বাহিনী। এরপরই পৃথিবীর বুকে অভ্যুদয় ঘটে লালসবুজের একটি পতাকার। একটি নতুন স্বাধীন বাংলাদেশের। যেই বাংলাদেশ পাওয়ার জন্য নয় মাস অবধি কারও ঘুম ছিলো না চোখে। জালেমের বিরুদ্ধে যে দামাল ছেলেরা রুখে দাঁড়িয়েছিল তা যুগ যুগ নয় শত শত বছর মনে রাখে এই বাঙালি।

আমরা যে দিনটিতে দাঁড়িয়ে আছি, সেটি কী? রাজাকার, আলবদর, আলশামস আর ঘৃণ্য পাকিদের দোষর ছাড়া সবার মনেই জেগে ওঠেছিল অনাবিল সুখ ও তৃপ্তি। আমরা মনে করি, স্বজন হারিয়েছেন যারা তাদের বেদনায় প্রলেপ স্বরূপ এই ষোল ডিসেম্বর।

যারা যুদ্ধ করেছে, বিজয়ের জন্য লড়াই করেছে, তাদের অবদান অস্বীকারের সুযোগ নেই। দেশের কয়েকজন আলেমও মুক্তিযুদ্ধে শাহাদত লাভ করেছেন। অসংখ্য আলেম মুক্তির জন্য লড়াই করেছেন রণাঙ্গণে, আবার সংগঠক হিসেবে কাজও করেছেন আলেমগণ। বিজয়লাভের পরও মুসলমানদের আবার সংগঠিত করার প্রয়োজনে কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রহ.-এর মতো অনেক কাজ করেছেন। মসজিদ-মাদরাসা খোলে দিয়ে অবদান রেখেছিলেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। পাকিরা যে ধর্মযুদ্ধ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধকে সাবেত করতে চেয়েছিলো সেটা ভুল প্রমাণ করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ইসলাম আতঙ্ক মনে করেননি। ইনশাআল্লাহ বলে যে ঘোষণা দিয়েছিলেন তা মাত্র নয় মাসে আল্লাহর মেহেরবানীতে পাকিদের জুলুমের বিরুদ্ধে আল্লাহ তাআলা দেশের মানুষকে মুক্তি দেন। এখন প্রয়োজন দেশকে সংঘটিত করা। সবাইকে নিয়ে পথচলা। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন। আমীন।

লেখক : শিক্ষক ও সাংবাদিক
mkadir1983@gmail.com

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *