পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ড. মুহাম্মাদ মুরসি ইসা আল-আইয়াত। মিসরের মজলুম জননেতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রথম বৈধ প্রেসিডেন্ট। যাকে অন্যায়ভাবে ক্ষমতাচ্যুত করে মিসরের কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়। প্রহসনের এক বিচারিক আদালতে নিজের কথাগুলো উপস্থাপন করতে গিয়ে হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে শাহাদাত বরণ করেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)
কে এই মুরসি?
– ১৯৫১ সালের ২০ আগস্ট মিসরের শারক্বিয়া প্রদেশে জন্ম নেয়া মুহাম্মাদ মুরসি ইসা আল-আইয়াত কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকৌশল বিষয়ে ১৯৭৫-৭৮ সালে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ ক্যালিফোর্নিয়াতে প্রকৌশল বিষয়ে গবেষণাত্তোর ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। অতঃপর ক্যালিফের্নিয়ার স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্ম জীবন শুরু করেন।
১৯৮৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করে নিজ জন্মভূমি শারক্বিয়া প্রদেশের জাগাজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের উদ্দেশে মিসর ফিরে আসেন।
মুরসি ২০০০ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সে সময় রাজনৈতিকভাবে রাষ্ট্র কর্তৃক মুসলিম ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ থাকায় মুরসি মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই তাকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হয়।
২০১১ সালে ব্রাদারহুডের আদলে ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি (এফজেপি) গঠন করে পার্টির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মুরসি।
২০১২ সালে মিসরে দুই পর্বে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। উভয় পর্বে ড. মুরসি পর্বেই সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে মুরসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ফলাফল ঘোষণার পর ব্রাদারহুড ও এফজেপি থেকে তাকে অব্যাহতি দিয়ে মিসরের সর্বস্তরের মানুষের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসিকে অন্যায়ভাবে একবছরের মাথায় ২০১৩ সালে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং প্রহসনমূলক বিচারের মুখোমুখি করা হয়। সে বিচারে মুরসিকে ফাঁসির দণ্ডাদেশ দেয়া হয়। পরবর্তীতে ফাঁসি থেকে অব্যহতি দিয়ে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
অবশেষে সব উদ্বেগ ও শঙ্কা থেকে মিসরসহ বিশ্ববিবেককে মুক্তি দিয়ে মৃত্যুর মাধ্যমে শাহাদাতকেই বেছে নিলেন মজলুম জননেতা ড. মুহাম্মাদ মুরসি ইসা আল-আইয়াত।
ড. মুরসির মৃত্যুতে বিশ্বগণমাধ্যমসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, নেতা ও সংস্থার আবেগঘন বিবৃতি ও শোকে মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সরব। বাদ যায়নি সাধারণ মানুষের আবেগঘন স্ট্যাটাস। যার কিছু তুলে ধরা হলো-
কাতারের আমিরের শোক : কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি তার নিজ ভ্যারিফায়েড টুইটার অ্যাকাউন্ডে শোক জানিয়ে লিখেন- ‘মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদ মুরসির হঠাৎ মৃত্যুর খবর পেয়ে অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছি। তার পরিবার ও মিসরবাসীর জন্য সমবেদনা জানাই। নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং তার কাছে সবাইকে ফিরে যেতে হবে।
তুরস্কের প্রেসিডেন্টের শোক : তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইপে এরদোয়ান ড. মুরসির মৃত্যুতে সাংবাদিক প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বলেন- ‘গাড়ি থেকে নামার সময় আমার কাছে মুরসির মৃত্যুর খবর আসে। আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের শহিদ ভাইয়ের জন্য দোয়া করছি, আল্লাহ যেন শহিদের ওপর রহম করেন। আদালতের এজলাসেই তার মৃত্যু হয়েছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি আল্লাহর কাছে তার জন্য রহমত কামনা করি।
ব্রিটিশ এমপি প্যানেলের বিবৃতি : যথাযথ চিকিৎসা সেবা না দেয়ায় মুরসির অকাল মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন ব্রিটিশ রাজনীতিক ও আইনজীবীদের একটি প্যানেল। তারা বলেন- ‘দীর্ঘদিন ধরে অবহেলার ফলে মুরসির শারীরিক অবস্থা যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে তিনি অকালে মারা যেতে পারেন। মিসরের বর্তমান সরকার মুরসির ব্যাপারে এসব বক্তব্যকে মোটেও গুরুত্ব দেয়নি।
মৃত্যুর আগে তার পরিবারসহ বিভিন্ন মহল থেকেই সরকারি কর্তৃপক্ষকে মুরসির শারীরিক অবস্থা মোটেও ভালো নয় বলে জানানো হয়েছিল। এ অবহেলায় কারাগারে তার মৃত্যু হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছিল। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মুরসিকে যথাযথ চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে বলে বারবার তার পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল। যার কোনো গুরুত্ব দেয়নি সরকার ও কর্তৃপক্ষ। যার ফলশ্রুতিতে মুরসিকে অকালে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে।
মুসলিম ব্রাদারহুডের বিবৃতি : মিসরের জনপ্রিয় মুসলিম সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুড ড. মুরসির মৃত্যুতে সরকারের অবহেলা ও দায়িত্বশীলতার অভাব উল্লেখ করে বলেন- ড. মুহাম্মাদ মুরসিকে ক্রমান্বয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। গ্রেফতার ও পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদ শুরুর পর থেকেই মুরসির শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে থাকে এবং এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার মিসরের আদালতে বিচার চলাকালীন সময়ে তার মৃত্যু হয়।
ব্রিটিশ ইন্ডিপেনডেন্ট ডিটেনশান রিভিউ প্যানেলের বিবৃতি : ড. মুরসির মৃত্যুতে চরম অবহেলার অভিযোগ করে ব্রিটিশ ইন্ডিপেনডেন্ট ডিটেনশান রিভিউ প্যানেল। তারা বলেন- সাবেক এ প্রেসিডেন্টকে কারাবন্দি রাখার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। তার প্রতি অবহেলার কারণে মৃত্যু আগেই ক্ষমতাসীন আবদেল ফাত্তাহ আল সিসিকেও দায়ী করেছিল যুক্তরাজ্যের বিশেষ স্বাধীন বন্দিত্ব পর্যালোচনা প্যানেল ইনডিপেনডেন্ট ডিটেনশান রিভিউ প্যানেল।
তারা সহ আন্তর্জাতিক কয়েকটি সংস্থা আগেই মিসর সতর্ক করে বলেছিল যে, মুরসি কারাগারে অকালে মারা যেতে পারেন। কারণ তার প্রতি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে মিসর সরকার।
মিসরের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে মুরসির মৃত্যুর সংবাদ : মিসরের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়, সাবেক প্রেসিডেন্ট বিচারকের কাছে কথা বলার অনুমতি চাইলে তাকে কথা বলার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। এ সময় তিনি বুকে ব্যথা অনুভব করেন। এক পর্যায়ে তিনি হৃদক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
উল্লেখ্য যে, ড. মুহাম্মাদ মুরসি ইসা আল-আইয়াত ৬৭ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। রেখে গেলেন তেজোদ্বীপ্ত ইতিহাস। যুগ যুগ ধরে মানুষ স্মরণ করবে মুসলিম স্বার্থ রক্ষার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব শহিদ সাইয়েদ হাসান আল-বান্নার যোগ্য উত্তরসূরি মুরসিকে।
আল্লাহ তাআলা মজলুম জননেতা কুরআনের হাফেজ ড. মুহাম্মাদ মুরসি ইসা আল-আইয়াতকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।


