উইকেট ভালো ছিল, ভুলটা আমাদের : তামিম
মুশফিক-মিঠুনে আশার আলো
পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : টেস্ট ক্রিকেট ধৈর্য্যের লড়াই। যেখানে প্রতিভা ও মানসিকতার পাশাপাশি বড় পরীক্ষা দিতে হয় মনোসংযোগ ও মানসিক শক্তিরও। কিন্তু সে পরীক্ষা দিতেই যেন রাজি নন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। ঢাকা টেস্টে একের পর এক ব্যাটসম্যান নাম লিখিয়েছেন আত্মহুতির মিছিলে। তবে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে লড়ার চেষ্টা করছেন মোহাম্মদ মিঠুন ও মুশফিকুর রহীম। তাদের ব্যাটেই এখন আশার আলো বাংলাদেশের।
ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৩০০ রানে আটকে রাখার পরিকল্পনা নিয়ে দ্বিতীয় দিনের খেলা শুরু করেছিল স্বাগতিকরা। নিজেদের এই পরিকল্পনায় সফল হয়নি বাংলাদেশ। নিচের দিকের ব্যাটসম্যানদের নৈপুণ্যে ক্যারিবীয়রা দাঁড় করিয়েছে ৪০৯ রানের বড় সংগ্রহ। জবাবে মুমিনুল হকের দলকে কাটিয়ে দিতে হতো শুধু এক সেশন। কিন্তু এটিও ঠিকঠাক করতে পারেনি টাইগাররা।
দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে বাংলাদেশ দলের সংগ্রহ ৩৬ ওভারে ৪ উইকেটে ১০৫ রান। ওয়েস্ট ইন্ডিজের করা ৪০৯ রানের চেয়ে এখনও ৩০৪ রানে পিছিয়ে বাংলাদেশ। এছাড়া ফলোঅন এড়িয়ে ক্যারিবীয়দের আবার ব্যাটিংয়ে নামাতে আরও অন্তত ১০৫ রান করতে হবে টাইগারদের। তৃতীয় দিন সকালে এ দায়িত্ব নিতে হবে দুই অপরাজিত ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহীম ও মোহাম্মদ মিঠুনকে।
চলতি ম্যাচের জন্য স্কোয়াডে ঢোকার আগে সবশেষ রাজশাহীতে স্থানীয় একটি টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট খেলেছেন বাঁহাতি পেস বোলিং অলরাউন্ডার সৌম্য সরকার। তার শুক্রবারের ব্যাটিংয়েও ফুটে উঠেছে ওয়ানডে ঘরানার এপ্রোচ। শ্যানন গ্যাব্রিয়েলের করা ইনিংসের প্রথম ওভারে লেগস্ট্যাম্পের ডেলিভারিতে অনড্রাইভ করতে গিয়ে শর্ট মিড উইকেটে দাঁড়ানো কাইল মায়ারসের হাতে। রানের খাতাও খুলতে পারেননি সৌম্য।
পরের ওভারে রাহকিম কর্নওয়ালকে সোজা মাথার ওপর দিয়ে ছক্কা হাঁকান তামিম ইকবাল। এর মাধ্যমে যেন বার্তা দেন টিকে থাকার জন্য পাল্টা আক্রমণের পথই বেছে নেবেন তিনি। কিন্তু এ পথে হাঁটাই কাল হয় তিন নম্বরে নামা নাজমুল হোসেন শান্তর জন্য।
গ্যাব্রিয়েলের করা ব্যক্তিগত দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলে দারুণ ড্রাইভে বাউন্ডারি হাঁকান তিনি। পরের বলটি আরেকটু বাইরে করেন গ্যাব্রিয়েল। আবারও বাউন্ডারির আশায় ব্যাট চালান শান্ত। কিন্তু এবার তার ব্যাটের কানায় লেগে বল চলে যায় গালিতে দাঁড়ানো এনক্রুমাহ বোনারের হাতে। মাত্র ১১ রানে ২ উইকেট হারিয়ে ফেলে বাংলাদেশ।
দলের বিপদের মুখে চওড়া হয় তামিমের ব্যাট। অধিনায়ক মুমিনুল হককে সঙ্গে নিয়ে এড়িয়ে যান প্রাথমিক বিপর্যয়। ইনিংসের শুরু থেকেই ক্যারিবীয় বোলারদের ওপর চড়াও হয়ে খেলতে থাকেন তারা দুজন। প্রায় প্রতি ওভারেই হাঁকান একটি করে বাউন্ডারি।
বেশি আগ্রাসী ছিলেন তামিমই। আলঝারি জোসেফের করা ষষ্ঠ ও অষ্টম ওভারে দুইটি করে চার মারেন তিনি। যার সুবাদে রান উঠতে থাকে বলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। পরে জোসেফের করা ইনিংসের দশম ওভারে জোড়া বাউন্ডারি হাঁকান মুমিনুল হক।
ইনিংসের ১২তম ওভারে গ্যাব্রিয়েলের বলে ফাইন লেগে চার মেরে দলীয় পঞ্চাশ পূরণ করেন টাইগার অধিনায়ক। গ্যাব্রিয়েলের করা পরের ওভারটিতে আগের সবকিছু ছাড়িয়ে যান তামিম ও মুমিনুল। দুইটি বাউন্ডারি হাঁকান তামিম, মুমিনুল মারেন একটি। তিন বাউন্ডারিতে সেই ওভারে আসে ১৪ রান। ওভার শেষে দলীয় সংগ্রহ দাঁড়ায় ২ উইকেটে ৬৮ রান, ওভারপ্রতি রানরেট ৪.৮৫!
অতি দ্রুত রান তোলার এ ছন্দে ব্যাঘাত ঘটে ঠিক পরের ওভারেই। কর্নওয়ালের অফস্ট্যাম্পের বাইরের বলে স্কয়ার ড্রাইভ করতে গিয়ে উইকেটের পেছনে ধরা পড়েন অধিনায়ক মুমিনুল। দুর্দান্ত দক্ষতায় ক্যাচটি গ্লাভসবন্দী করে ২১ রানেই মুমিনুলকে থামান উইকেটরক্ষক জশুয়া ডা সিলভা। তার বিদায়ে ভাঙে ৫৮ রানের তৃতীয় উইকেট জুটি।
বিভীষিকাময় ২০১৯ সালের নিউজিল্যান্ড সফরের অসমাপ্ত টেস্ট সিরিজের প্রায় দুই বছর পর ফিফটির কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন তামিম। কিন্তু শেষপর্যন্ত আর পারেননি। মুমিনুল ফেরার পরের ওভারে ঠিক সৌম্যর মতো করে আউট হন তামিম। শর্ট মিড উইকেটে দাঁড়িয়ে তার ক্যাচ ধরেন সেই মোজলিই। তামিম ফেরেন ৫২ বলে ৬ চার ও ১ ছয়ের মারে ৪৪ রান করে।
বাংলাদেশ দলের সংগ্রহ তখন ৪ উইকেটে ৭১ রান, বিপর্যয় তখন চরমে। এমন পরিস্থিতিতে ঝুঁকি নিয়ে রান বাড়ানোর চেয়ে উইকেটে থিতু হওয়ার দিকেই বেশি মনোযোগ দেন মুশফিক ও মিঠুন। একদম টেস্ট মেজাজে খেলছেন মিঠুন, প্রথম রান করতে তিনি খেলেন ১৬ বল।
এর আগেই অবশ্য একবার ভয় পাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছিল মিঠুনের। ইনিংসের ২০তম ওভারের তৃতীয় বলে তাকে কট বিহাইন্ড আউট দিয়ে দেন আম্পায়ার। সঙ্গে সঙ্গে রিভিউ নেন মিঠুন। রিপ্লেতে দেখা যায় বল তার ব্যাটে নয়, থাই প্যাডে লেগে গিয়েছে। ফলে বদলে যায় আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত, বেঁচে যান মিঠুন। এরপর আর কোনো বিপদ ঘটতে দেয়নি মিঠুন-মুশফিক জুটি। দিন শেষে ৩ চারের মারে ৬১ বলে ২৭ রানে অপরাজিত রয়েছেন মুশফিক। ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিয়ে মিঠুন খেলছেন ৬১ বলে ৬ রান নিয়ে।
টেস্ট ক্রিকেটে টোপ দিয়ে উইকেট নেয়া বেশ পুরনো কৌশল। লাল বলের অভিজাত ফরম্যাটে প্রতিপক্ষের এই সাজানো টোপে নিয়মিতই আটকা পড়েন বাংলাদেশ দলের ব্যাটসম্যানরা। ব্যতিক্রম হলো না চলতি ঢাকা টেস্টেও। শুক্রবার ম্যাচের দ্বিতীয় দিন শেষ সেশনে রীতিমতো আত্মহত্যার মিছিলে যোগ দেন সৌম্য সরকার, নাজমুল হোসেন শান্ত, তামিম ইকবালরা।
সবচেয়ে বড় উদাহরণ নাজমুল শান্তর উইকেট। শুরুতেই সাজঘরে ফিরে গেছেন ওপেনার সৌম্য, চাপ সরাতে আগের ওভারে ছক্কা হাঁকিয়েছেন আরেক ওপেনার তামিম। এমতাবস্থায় ইনিংসের তৃতীয় ওভারের প্রথম বলটি ড্রাইভ করতে দেন গ্যাব্রিয়েল, সুযোগ হাতছাড়া না করে বাউন্ডারি মেরে দেন শান্ত। যা ছিল তার মোকাবিলা করা প্রথম বল।
পরের বলটি একই লেন্থে রাখলেও, অফস্ট্যাম্পের আরও বাইরে করেন গ্যাব্রিয়েল। আগের বলের মতোই ড্রাইভের চেষ্টা করেন শান্ত। কিন্তু শরীর থেকে অনেক দূরের বলটি তার ব্যাটের বাইরের কানায় লেগে চলে যায় গালিতে দাঁড়ানো এনক্রুমাহ বোনারের হাতে। সমাপ্তি ঘটে শান্তর দুই বলের ছোট্ট ইনিংসের।
শান্তর মতোই নিজেদের উইকেট বিলিয়ে দেন তামিম, সৌম্য এবং অধিনায়ক মুমিনুল হক। যে কারণে ম্যাচের দ্বিতীয় দিন শেষে স্বস্তিতে নেই বাংলাদেশ, ৪ উইকেটে স্বাগতিকদের সংগ্রহ ১০৫ রান। ক্যারিবীয়দের চেয়ে এখনও ৩০৪ রানে পিছিয়ে টাইগাররা, ফলোঅন এড়াতে করতে হবে আরও ১০৫ রান।
দিনের খেলা শেষে দলের অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান তামিম মেনে নিয়েছেন নিজেদের ভুল, জানিয়েছেন উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য অসম্ভব ভালো ছিল। শুক্রবার যদি বাংলাদেশ দুইটি উইকেট কম হারাতো, তাহলে অবস্থান আরও ভালো থাকতো বলে করেন দেশসেরা এ ওপেনার।
তামিমের ভাষ্য, ‘উইকেট অসম্ভব ভালো ছিল। আমরা যখন ব্যাটিংয়ে নামি, তখনও অনেক ভালো ছিল। তেমন কিছু হচ্ছিল না উইকেটে। আমার কাছে মনে হয়, যে চারটা উইকেট পড়েছে, কোনোটা যে খুব ভালো বলে বা উইকেটের কারণে পড়েছে, তা নয়। আপনি যদি দেখেন, চারটাই ব্যাটসম্যানদের ভুল ছিল দেখে পড়েছে।’
তিনি যোগ করেন, ‘আজ যদি আমাদের ২টা উইকেট কম পড়তো এবং এ রানটা (১০৫) থাকতো, তাহলে আমাদের অবস্থান আরও ভালো হতো। যেহেতু ৪টা উইকেট পড়ে গেছে, তাই বলতেই হবে ওরা চালকের আসনে। তবে আমরা যদি কাল বড় পার্টনারশিপ করতে পারি, ১০০-১৫০ রানের জুটি গড়তে পারি, তাহলে আবার ম্যাচে ফিরতে পারব।’
আগেরদিনে করা ৫ উইকেটে ২২৩ রান নিয়ে শুক্রবার খেলা শুরু করেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। প্রথম দিনের খেলা শেষে আবু জায়েদ রাহি জানিয়েছিলেন, ক্যারিবীয়দের ৩০০ রানের মধ্যে আটকে রাখতে চান তারা। তা হয়নি, উল্টো চারশ রানের গ-ি পেরিয়ে ৪০৯ রানে থেমেছে সফরকারিদের ইনিংস। তাদের ৩০০ রানে আটকে রাখার পরিকল্পনায় সফল না হওয়ার পেছনে নিজেদের ভুলের চেয়ে প্রতিপক্ষের কৃতিত্ব বেশি দেখছেন তামিম।
তামিমের মতে, সবকিছু শুধু বাংলাদেশের ভুলের কারণেই হয় না। তিনি বলেন, ‘আমরা তো চেয়েছিলাম, শুক্রবার যত তাড়াতাড়ি উইকেট নিতে পারি। (উইকেট) নিয়ে ওদেরকে যদি ৩০০’র নিচে রাখা যেতো, তাহলে এটা আমাদের জন্য খুব ভালো হতো। তবে এটাও বুঝতে হবে, উইকেট খুব ভালো ছিল, আমাদের স্পিনারদের একদমই সাহায্য করেনি।’
টাইগার ওপেনার আরও বলেন, ‘এছাড়া তারা বেশ ভালো ব্যাটিংও করেছে। সবকিছু আমাদের ভুলের কারণে এমন নয়, কিছু কৃতিত্ব তাদেরও দিতে হবে। তারা অসাধারণ ব্যাটিং করেছে। জোসেফ নেমে খুব ভালো খেলেছে। সে ৭০ এর বেশি (৮২) রান করেছে, উইকেটরক্ষক (জশুয়া ডা সিলভা) ভালো খেলেছে। আমরা অবশ্যই কিছু না কিছু ভুল করেছি, তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজকেও কৃতিত্ব দিতে হবে।’


