মুসলিম উম্মাহর প্রতি কাবা শরিফের খতিবের নসিহত
পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : পবিত্র নগরী মক্কার মসজিদে হারাম তথা কাবা শরিফে ২৪ জুলাই শুক্রবার জুমআর খুতবা দেন শায়খ ডক্টর মাহির বিন হামদ আল-মুয়াইকিলি। বিশ্বব্যাপী সুমিষ্টি কণ্ঠের অধিকারী কাবা শরিফের এই ইমাম ও খতিব মুসলিম উম্মাহর উদ্দেশ্যে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের কিছু কষ্ট ও পরিশুদ্ধ নিয়তের বরকতের কথা তুলে ধরেন। কাবা শরিফে ২৪ জুলাইয়ের খুতবার সার-সংক্ষেপ পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-
‘হে মুসলিম জাতি! হিজরতের নবম বছরের সপ্তম মাস রজবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরব উপদ্বীপের উত্তরে ঐতিহাসিক তাবুকের দিকে রওনা হন। এটি ছিল দীর্ঘ ৫০ দিনের কষ্টকর সফর। ওই সফরে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনা থেকে তাবুক পর্যন্ত দীর্ঘ ত্রিশ দিনের কষ্টকর পথ অতিক্রম করেন। সেখানে গিয়ে ২০ দিন অবস্থান করেন। অতপর পবিত্র রমজান মাসে মদিনায় ফিরে আসেন।
এ সফরের সময় বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ষাটোর্ধ্ব বয়স অতিক্রম করছিলেন। প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তাবুকের এ অভিযান ‘গাজওয়ায়ে তাবুক’ নামে পরিচিত। কুরআনের ভাষায় এটিকে সাআতুল উসর বা কষ্টের সময় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা সে সময় চারদিক-ই কষ্টে আচ্ছাদিত হয়ে গিয়েছিল।
তাবুক অভিযান সম্পর্কে হজরত জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, দ্বিপ্রহরের প্রচণ্ড তাপদাহ, পানির প্রাপ্তির দুর্লভতা ও পাথেয়ের স্বল্পতা ইত্যাদি সব কষ্ট একত্র হয়ে গিয়েছিল।
শায়খ মুয়াইকিলি তার খুতবায় সহিহ ইবনে হিব্বানে বর্ণিত একটি হাদিস তুলে ধরেন- হজরত ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলা হয়েছিল- তাবুকের কষ্ট সম্পর্কে আমাদের কিছু বলুন! তিনি বললেন, ‘আমরা প্রচণ্ড গরমে তাবুকের দিকে যাত্রা করেছিলাম এবং আমরা এমন স্থানে অবস্থান করেছিলাম যেখানে আমরা তৃষ্ণার্ত ছিলাম, এমনকি আমরা অনুভব করতে লাগলাম, যেন আমাদের ঘাড় কেটে ফেলা হচ্ছে। লোকেরা নিজেদের উট জবাই করে সেগুলোর পাকস্থলী চিপে তরল খাদ্য পান করেছিল। কলিজার পানি পরবর্তী সময়ের জন্য রেখে দিয়েছিল।’
তাবুকের পথ ছিল সুদীর্ঘ এবং পাথেয় সামগ্রী ছিল খুবই অল্প। সেখানে ছিল প্রচণ্ড গরম। পবিত্র মদিনাতে তখন ফল পাকার মৌসুম। লোকেরা এসময় মদিনাতেই অবস্থান করা বেশি পছন্দ করত। সুতরাং যারা এই পার্থিব জীবনের সুখ-শান্তি উপেক্ষা করে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দিয়েছে এবং নবির সোহবত ত্যাগ না করার প্রত্যয়ী হয়েছে একমাত্র তারা-ই এ জিহাদে শরিক হয়েছিল।
নিয়তের পরিশুদ্ধতা : তাবুক অভিযানে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা ছিল প্রায় ত্রিশ হাজার। আর যারা মদিনাতেই বসে ছিলেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তাদের ওজর কবুল করে তাদের এই অপারগতা মেনে নিয়েছিলেন এবং প্রতিদান তাদের সাচ্চা নিয়তের উপর ছেড়ে দিয়ে ছিলেন।
হজরত আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গাজওয়ায়ে তাবুক থেকে ফিরে এসে বললেন, মদিনাতে এমন কিছু লোক আছে, তোমরা যেখানেই গিয়েছ বা যে উপত্যকা পার হয়েছো তারা তোমাদের সঙ্গেই ছিল।
অন্য বর্ণনায় এসেছে, তারা তোমাদের সাওয়াবে শরিক ছিল। সাহাবা রাদিয়াল্লাহু আনহু আজমাইন বললেন, তারা কি মদিনাতেই ছিল? নবীজি বললেন, তারা মদিনায় ছিল, ওজর দ্বারা তারা আটকে ছিল।’ (বুখারি ও মুসলিম)
শায়খ মুয়াইকিলি নিয়তের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, ‘হে ঈমানদার ভাইয়েরা! নিয়ত হল একটি দুর্দান্ত বিষয়, কারণ এটি পুণ্যের প্রধান, কাজের ভিত্তি, সৎকর্মের অভিপ্রায়ের কর্মবিধায়ক এবং মাকছাদে পৌঁছানোর রাস্তা। তাই আমাদের উত্তম পূর্বপুরুষরা নিয়তের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
এমনি কি সালফে সালেহিনদের সম্পর্কে হজরত সুফিয়ান সাওরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘তারা আমলের জন্য আগে নিয়ত শিখেছেন, যেমন তোমরা আমল শিখছো।’
যদি নিয়ত সুন্দর ও স্বচ্ছ হয় তবে আমলও কবুল হয়। এমন অনেক ছোট আমল আছে, যেগুলো নিয়তের কারণে অনেক বড় হয়েছে। আবার এমন অনেক বড় আমল আছে যেগুলো সঠিক নিয়তের অভাবে ছোট হয়েছে। সুতরাং খাঁটি নিয়তের মাধ্যমে মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করবে; এমনকি যদি সে উক্ত আমল করার ফুরসতও না পায়।
শায়খ মুয়াইকিলি এ সম্পর্কে সহিহ মুসলিমের একটি বর্ণনা তুলে ধরেন- ‘বনি ইসরাইলের এক ব্যক্তি একশ জনকে হত্যা করেছিল, অতপর সে অনুতাপের সন্ধান করতে গিয়ে তার গ্রাম থেকে এমন এক গ্রামে চলে যায় যেখানে ধার্মিক লোকেরা বাস করত। যাত্রা পথে থাকতেই তার মৃত্যু হয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা তার তওবাহ কবুল করেন এবং এই খাঁটি নিয়তের জন্য জাযায়ে খায়ের দান করেন।’
হজরত আমর ইবনে সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহু ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় ঈমান গ্রহণ করেননি। তারপর উহুদের যুদ্ধের দিন ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন তরবারী হাতে নিয়ে লোক সমাগমে ছুটে গিয়ে লড়াই শুরু করেন। অতপর ক্ষত-বিক্ষত হয়ে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে সাহাবাগণ তারঁ কথা উল্লেখ করলেন- তখন প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, ‘সে জান্নাতীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।’ (মুসনাদে আহমাদ)
অতএব একত্ববাদের সাক্ষ্য, ঈমান ও নেক আমলের ব্যপারে সুদৃঢ় সংকল্পের কারণে তিনি জান্নাতীদের অন্তর্ভূক্ত হলেন। যদিও মৃত্যুর আগে একটাও সেজদাহ করেননি। (সুবহানাল্লাহ!)
শায়খ মুয়াইকিলি আরও বলেন, ‘আল্লাহ যখন বান্দার নেক নিয়ত, সৎ উদ্দেশ্য ও নির্ভেজাল আন্তরিকতা দেখেন। তখন তার কাজে বরকত দেন এবং তার প্রচেষ্টা কবুল করেন। আল্লাহ তাআলা কুরআনে ঘোষণা করেন-
‘আর যে পরকাল চায় এবং এর জন্য চেষ্টা করে এমন অবস্থায় যে সে মুমিন, তাহলে তার এই চেষ্টা কবুল করা হবে।’ (সুরা বনি ইসরাইল : আয়াত ১৯)
নেক আমলের নিয়ত বান্দার আমলের ত্রুটিগুলো পূরণ করেন। আল্লাহ তাআলা তাকে আজর ও সওয়াব দান করেন। হাদিসে এসেছে-
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিয়ত করে যে সে রাতে নামাজ আদায় করবে। অতপর ঘুমিয়ে যায় কিন্তু জেগে দেখে সকাল হয়ে গেছে। সে রাতে যে নিয়ত করেছিল সে তার (নিয়তের) সওয়াবই পাবে। ঘুমটা তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে সদকা।’ (নাসাঈ)
আল্লাহ তাআলা কুরআনে ঘোষণা করেন- ‘আর যে ব্যক্তি তার বাড়ি থেকে আল্লাহর এবং তাঁর রাসুলের উদ্দেশ্যে হিজরতে বের হয় আর পথিমধ্যে তার মৃত্যু এসে যায়, তবে সে ওই হিজরতের সওয়াব লাভ করবে।’ (সুরা নিসা : আয়াত ১০০)
বিখ্যাত তাফসির গ্রন্থ ইবনে কাসিরে এসেছে- ‘ যে ব্যক্তি হিজরতের অভিপ্রায় নিয়ে ঘর ছেড়ে চলে যায় এবং সে পথেই মারা যায়।আল্লাহ তাআলা তাকে (ইসলামের জন্য হিজরতকারী) মুহাজিরদের সওয়াবই দান করেছেন।’
হে সম্মানিত ঈমানদারগণ! নেক নিয়তের ফায়দা হলো নিয়তকারী যে আমলের নিয়ত করেছে তা সহিহভাবে করতে না পারলেও এর সওয়াব পেয়ে যায়। বুখারি ও মুসলিমে এসেছে-
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগের এমন একজন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছেন যে দান করতো এবং গোপন করতো এমনকি নিজের থেকেও। অতপর প্রথম দান ব্যভিচারিণীর হাতে পড়েছিল, দ্বিতীয়টি ধনী ব্যক্তির হাতে এবং তৃতীয়টি চোরের হাতে। বিষয়টি তাকে উৎকণ্ঠিত করলো। তাকে স্বপ্নে বলা হলো- আপনার দান গ্রহণ করা হয়েছে। কারণ ব্যভিচারিণী হয়ত পতিতাবৃত্তি ছেড়ে দিবে। ধনী ব্যক্তি হয়ত শিক্ষা নিয়ে আল্লাহর পথে মাল খরচ করবে। চোর হয়ত চুরি করা ছেড়ে দেবে।’
ইবনে হাজার রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, দানকারীর নিয়ত খাঁটি হলে আল্লাহ তাআলা তা কবুল করেন। যদিও অপ্রয়োজনীয় স্থানে দান সংঘটিত হোক না কেন! অর্থাৎ যদি এর প্রাপ্য ব্যক্তির হাতে দান না-ও পৌঁছে। যেমন-
নেক নিয়তের কারণে মুমিনকে তার পার্থিব কর্মের জন্য এবং তার জীবিকা নির্বাহের প্রচেষ্টার জন্য সওয়াব দেয়া হবে। মূলত এখানে অভ্যাসগুলি ইবাদতে রূপান্তরিত হবে। সুতরাং সদকা হলো সওয়াব কামায়ের বিশাল ফটক। অথচ এ ব্যাপারে অনেক লোকই অবহেলা করে। হাদিসে এসেছে-রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে যে সদকা করবে এর প্রতিদানে সওয়াব লাভ করবে। এমনকি নিজ স্ত্রীর মুখে যে খাদ্য তুলে দাও।’ (বুখারি ও মুসলিম)
ইমাম নববি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘স্ত্রীর মুখে লোকমা তুলে দেয়া হয় সাধারণত স্ত্রীসুলভ প্রেম, ভালবাসা, হৃদ্যতা ও আন্তরিকতার কারণে যেখানে ইবাদত ও আখেরাতের বিষয়ের কোনো অবকাশ থাকে না। তবুও রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সুসংবাদ দিয়েছেন যে, যদি কেউ এ লোকমাতেও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের নিয়ত করে তাহলেও সে সওয়াব লাভ করবে।
সাহাবায়ে কেরামই হাদিসে পরিপূর্ণ মর্ম আয়ত্ত করতে পেরেছিলেন। এ কারণেই হজরত মুয়াজ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, ‘বলেছিলেন আমি আমার ইবাদতকে যেমন মনে করি তেমন নিজের ঘুমকেও গণ্য করি।’ অর্থাৎ তিনি নামাজ-কেয়ামে সওয়াবে প্রত্যাশা করেন। সমানভাবে তেমনি তিনি ঘুমের মধ্যেও সওয়াবের প্রত্যাশা করেন। যদিও ঘুমের মাধ্যমে আরাম লাভ হয়।
হে মুমিন মুসলমান! যিনি অসুস্থের কারণে অকেজো হয়ে গেছেন বা সফরের কারণে কোনো ভাল কাজ করতে পারেন না অথবা এমন কোনো অজুহাত রয়েছে যা আল্লাহ জানেন। তবে ইনশাআল্লাহ আপনার আমলনামায় সওয়াব লেখা হবে। আপনার সুস্থ- সবল অবস্থার সব আমলের সওয়াব লেখা হবে।
কেননা হাদিসের বিখ্যাত গ্রন্থ বুখারিতে এসেছে- যদি কোনো বান্দা অসুস্থ হয়ে পড়ে বা সফরে থাকে তবে তার আমলনামায় তা-ই লেখা হয় যা সে সুস্থ ও বাড়িতে থাকতে করতো।’
পরিশুদ্ধ নিয়ত সর্বোত্তম জিনিস। যার দ্বারা একজন ব্যক্তি তার দিন শুরু করে এবং দিনটি শেষ করে এবং এটি রবের কাছে রাখা সর্বোত্তম সঞ্চয়। সুতরাং সুংবাদ মুমিনের জন্য সে তার কথা ও কর্মে নেক নিয়ত করবে। এমনকি এ সময় তার মৃত্যু এসে যায় আর তার ও আমলের মাঝে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয় তবুও আল্লাহ তাআলা আমলের সওয়াব লিখবেন।
ইমাম আহমদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহির এর পুত্র তাকে (বাবাকে) জিজ্ঞাসা করল, ‘হে আমার পিতা, আমাকে সুপারিশ করুন, তখন তিনি বলেছিলেন- প্রিয় বৎস, কল্যাণের নিয়ত করো কেননা যতক্ষণ কল্যাণের নিয়ত করবে ততক্ষণ কল্যাণের সঙ্গে থাকবে।


