বক্তব্য শেষ করার আগে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় মহিউদ্দিন চৌধুরী বললেন, ‘নাছির ভাই, ইক্কা আইয়ুন।’ (নাছির ভাই, এদিকে আসুন)। এ সময় মঞ্চে নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে হাসিমুখে এগিয়ে গেলেন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। মহিউদ্দিন চৌধুরীর পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর হাত ধরে মাইক্রোফোনে তিনি বললেন, ‘উনার (মহিউদ্দিন চৌধুরী) সঙ্গে কাজ করব উনার নেতৃত্বে।’ এ সময় উপস্থিত নেতা-কর্মীরা উল্লাসে ফেটে পড়েন।
এ ঘটনার মধ্য দিয়ে এক সপ্তাহ ধরে চলা চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ দুই নেতার তীব্র বাগ্যুদ্ধ ও পরস্পরের প্রতি বিষোদগারের আপাত-অবসান ঘটেছে বলে মনে করছেন নেতা-কর্মীরা। ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস উপলক্ষে সোমবার বিকেলে চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভার শেষ দৃশ্য ছিল এটি।
নগরের শহীদ মিনার চত্বরের এই আলোচনা সভাকে ঘিরে সোমবার দিনভর শঙ্কা ও উত্তেজনা ছিল। দুপুরেই পুলিশ শহীদ মিনারের দুই দিকের রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তোলে। সভার শুরুতে সিটি মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন উপস্থিত না থাকায় দ্রুত নানা গুঞ্জনও ছড়িয়ে পড়ে।
এর আগে ১০ এপ্রিল লালদীঘি মাঠের সমাবেশে চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিন চৌধুরী মেয়র নাছিরকে ‘খুনি’ ও ‘অযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন। মেয়রকে অপসারণের উদ্যোগ নেবেন বলেও জানান তিনি। সাবেক মেয়র মহিউদ্দিনের এই বক্তব্যকে ‘পাগলের প্রলাপ’ বলে পাল্টা মন্তব্য করেন মেয়র নাছির। নগর আওয়ামী লীগের দুই শীর্ষ নেতার পাল্টাপাল্টি বাগ্বিতণ্ডার কারণে নেতা-কর্মীরাও অস্বস্তিতে ছিলেন।
গতকাল বিকেল ৪টা ২৮ মিনিটে অনুষ্ঠানস্থলে মহিউদ্দিন চৌধুরী উপস্থিত হওয়ার পর সড়কের দুদিক থেকে তাঁর অনুসারীরা মিছিল নিয়ে আসতে থাকেন। বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে মেয়র নাছির মঞ্চে উঠলে মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারীরা তাঁর পক্ষে স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় মাইক্রোফোন নিয়ে মহিউদ্দিন চৌধুরী স্লোগান বন্ধ করার নির্দেশ দেন।
সভায় মেয়র নাছিরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত কয়েকজন নেতা ও কিছু সমর্থক ছাড়া কাউকে দেখা যায়নি। নাম না প্রকাশের শর্তে মেয়র নাছিরের অনুসারী ছাত্রলীগ ও যুবলীগের বেশ কয়েকজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, সংঘাত হতে পারে, এমন আশঙ্কায় কর্মীদের অনুষ্ঠানস্থলে না যেতে পরামর্শ ছিল মেয়রের।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের দুজন কর্মকর্তা গতকাল শহীদ মিনার চত্বরে বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালনের স্বার্থে মেয়রের অনুসারীদের অনুষ্ঠানে না আসতে অনুরোধ করা হয়েছে।
মেয়র নাছিরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত নগর আওয়ামী লীগের সদস্য বেলাল আহমেদ বলেন, ‘দুজনের মধ্যে বিভাজনের কারণে নেতা-কর্মীরা শঙ্কিত ছিল। আমাদের এই দুই নেতার ঐক্যে আওয়ামী লীগ লাভবান হয়েছে।’
সভায় মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘সাংবাদিক ভাইয়েরা আবেদন করব, আপনাদের লেখনিতে জাতির ঐক্য যেটা হচ্ছে তাতে যেন ফাটল না হয়। গভীর আগ্রহ নিয়ে ফাটল ধরিয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে আমাদের খাটো করার চেষ্টা করবেন না আল্লাহর ওয়াস্তে।’ তিনি বলেন, ‘ভুল আমরা করতে পারি। সংশোধন করে দেবেন।’ এরপর আঞ্চলিক ভাষায় তিনি বলেন, ‘খালি ইক্কার ল ইক্কা গরিয়েরে লেখের।’ (শুধু এদিক-ওদিক করে লিখে দিচ্ছে)।
মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘পদবির জন্য অনেক কিছু হতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে মারামারি কিংবা খুনোখুনি করব। বক্তব্যতে অনেক সময় অনেক কিছু বলেছি আমি। বলেছি এ জন্যই, সেটা আজকে নাই বা বললাম। আগামীতে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে চলব।’
এর আগে মেয়র নাছির বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে চলছে।


