মোদিকে সম্মান: আরবদের শক্তির পুজো

মোদিকে সম্মান: আরবদের শক্তির পুজো

মোদিকে সম্মান: আরবদের শক্তির পুজো

সগীর আহমদ চৌধুরী : ‘শক্তের ভক্ত’ বলে একটা কথা আছে, ‘শক্তির পুজো’ এটা আমার আখ্যা। মানুষ যখন বেয়াক্কেল-বেকুফ হয়, দুর্বলচিত্ত ও সাহসহীন হয়, দুরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার অভাব হয় তার মাঝে, আশাবাদী ও উচ্চআকাঙ্ক্ষী না হয় তবে তাদের অবস্থা আজকের আমিরশাহীদের মতোই হয়।

আরবদের অতীত শৌর্য-বীর্য, সাহসিকতা ও পৌরুষত্বের যে ঐতিহ্য ছিল বর্তমান আরব শাসকদের রক্তে তার ছিটে-ফোটাও প্রবাহিত নেই। আল্লাহর ইচ্ছায় মুসলিমরা আরও একবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে, বিশ্বনেতৃত্বে আসীন হতে পারে এবং পুরো জাহানকে শাসন করতে পারে সেই বিশ্বাস আরব শাসকদের মধ্যে নেই। আত্মবিশ্বাস নেই নিজেদের ওপর, বুদ্ধি-সুদ্ধিও কিছু খেলছে না মাথায় তাদের, কুফফারদের বিজ্ঞান-প্রযুক্তির উন্নতি ও সমরপ্রস্তুতি দেখে এদেরকে মোকাবেলা করার কল্পনাও তারা করতে পারে না, ভয়ে জবুথবু অবস্থা তাদের।

এমন অবস্থায় মানুষ কি করে? তখন মানুষ শক্তির পুজো ছাড়া কিছুই আর করে না। শক্তিশালীদের ভক্তি করে, সম্মান করে, পুজো করে, দাসত্ব করে এবং তাদের দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভর করে বসে থাকে; তাদের অনুগ্রহে বাঁচে-মরে। কিছুদিন আগে শাহ সালমান ও বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে রিয়াদে ডেকে এনে ভরি ভরি স্বর্ণের মেডেল দিয়েছিল, এটাও শক্তিশালীর পুজো। ভারতও একটি উদীয়মান শক্তি তাদের দৃষ্টিতে, ফলে এই দেবতারও পুজো দিলে মন্দ হয় না, তাই আমীরশাহি গুজরাটের কসাই নরেন্দ্র মোদিকে সম্মানিত করছে।

মোদিকে আমীরশাহির সম্মানিতকরণে আমি আশ্চর্য হয়নি, আমি বরং হতাশায় ভুগি, যদি এমন একটি মুসলিম শক্তির উদয়ন হতো! ইসলামি মূল্যবোধসম্পন্ন, বিশ্ব মুসলিমভ্রাতৃত্বে বিশ্বাসী, বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ, পরমাণু অস্ত্রধর, মহাকাশ গবেষণায় সফল, অর্থনীতিতে উন্নত, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও ইনসাফপূর্ন বিচারব্যবস্থাঅলা। তবে কি আমীরশাহিদের আজকে মোদিপুজো করতে হতো! ট্রাম্প্রের গলায় সোনার মেডেল পরাতে হতো শাহ সালমানদের!

উসমানি তুরস্কের খলীফা আবদুল হামীদ (রহ.), নিঃসন্দেহে একজন উত্তম শাসক ছিলেন, মুসলিম দরদি নেতা ছিলেন, প্রিয়নবীর পরম ভক্ত ও আশেক ছিলেন। খিলাফতামলে একটি অমর কৃতি হচ্ছে, হেজায রেললাইন। পতন্মোখ উসমানি খিলাফতের প্রতি মুসলিম বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং তাকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠত রাখাও এই হেজায রেলওয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। তুরস্ক থেকে পবিত্র মাদীনা শরীফ পর্যন্ত প্রায় ১৩২০ কিলোমিটার রেললাইন স্থাপনে সেই সময় কয়েক মিলিয়ন তুর্কি লিরার ব্যয় করতে হয়েছিল। কিছু অভ্যন্তরীণ কালেকশন, হায়দারাবাদের নিজামের অনুদান ছাড়া বাকী সিংহভাগ অর্থ সংগ্রহীত হয়েছিল বিভিন্ন ব্রিটিশ কোম্পানি থেকে ঋণ হিসেবে।

প্যানইসলামের উদ্দেশ্যে হেজায রেলওয়ে স্থাপিত হলেও তুরস্কের সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি, উসমানি খিলাফতের পতন রক্ষা করা যায়নি। রেলওয়ে স্থাপন নিশ্চয় একটি মহৎ কাজ ছিল, কিন্তু তার চেয়ে এই পরিমাণ অর্থ যদি প্রযুক্তি গবেষণায় খরচ করা হতো এবং পরমাণু গবেষণার প্রকল্প নেওয়া হতো তাহলে তুরস্কের পতন এতো সহজে হতো না।

কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, সুলতান আবদুল হামীদ (রহ.)-এর পক্ষে ইসন্তুনবুলে যে সিপাহী বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল এবং যারা সেই বিপ্লবে শরীয়া শরীয়া বলে চিল্লাচিল্লি করেছিল তারাই প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানে চরম অনাগ্রহী ছিল, আধুনিক অস্ত্র-শস্ত্র ব্যবহারের ঘোর বিরোধী ছিল।

আজ আমরা অনেকে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা তো বলি, কিন্তু মুসলমানদের শক্তিশালী হওয়ার কথা কয়জনে বলি? মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করছি, সব ছেলেসন্তানদেরকে মুহাক্কিক আলেম হওয়ার প্রতি গুরুত্ব দেই, কিন্তু দেশের প্রয়োজনে উম্মাহকে শক্তিশালীকরণের স্বার্থে কয়টা স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছি? দেশে স্কুল-কলেজ অহরহ আছে, বিজ্ঞান-প্রযু্ক্তি বিষয়ে লেখাপড়াও হচ্ছে, কিন্তু উন্নত গবেষণা এবং সেজন্য যথাযথ বরাদ্দ নেই কেন সে প্রশ্ন কয়জনে করছি? আজকে আমাদের অনেককে বলতে শোনা যায়, মাদরাসায় কেন বিজ্ঞানী-প্রযুক্তিবিদ হবে? অথচ আমরা যাদেরকে মুফাসসির-মুহাদ্দিস ও ফকীহ হিসেবে জানি-চিনি এটিই তাঁদের একমাত্র পরিচয় ছিল না, তাঁদের অনেকই ছিলেন মহাকাশ গবেষক, জ্যোতিবিজ্ঞানী, উদ্বিদবিজ্ঞানী, চিকিৎসক। তাহলে এ যুগের ফকীহ-মুহাদ্দিস ও মুফাসসিররা কেন উম্মাহর জন্য সেই অবদান রাখতে পারবেন না?

স্কুল-কলেজে পড়লে শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে বঞ্চিত হয়, সেই পরিবেশে যারা বিজ্ঞান-প্রযুক্তির জ্ঞান পায় তারা উম্মাহর কোনো কাজে আসে না, যদি মাদরাসা থেকেও একদল বিজ্ঞানী-প্রযুক্তিবিদ বের হতো তবে তাদের দ্বারা ইসলামি উম্মাহ ব্যাপক উপকৃত হতো।

তুরস্কের ইসলামি আন্দোলনের নেতা ড. নজমুদ্দীন আরবাকান ছিলেন একজন বিজ্ঞানী, বিদেশ থেকে শিক্ষা ও গবেষণা জীবন শেষে করে দেশে ফিরে মোটর পাম্প তৈরি করেছিলেন। যা আগে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো, এতে দেশের অনেক পয়সা বেঁচে যায়। তাঁর শায়খ ছিলেন একজন আলেমে দীন, তিনি তাঁর শায়খের দরবারে গেলে শায়খ তাঁকে মসজিদের বাইরে দাঁড়ানো কয়েক লাইন গাড়ি দেখিয়ে বললেন, এই গাড়িগুলোর মটরগুলোও সব বিদেশ থেক আমদানি করা, তোমরা চেষ্টা করে দেখ এসব মোটরও দেশে তৈরি করা যায় কিনা! এতে দেশের আরও পয়সা বাঁচবে, দেশ সমৃদ্ধ হবে। এটা কামালিজমের সময়কার ঘটনা।

একজন আলেমে দীন হয়ে তিনি কতোটা সুন্দর ভেবেছেন দেশের জন্য! কামালিজমের পতন তো অবশ্যাম্ভী, কিন্তু ওই মহান শায়খের ভাবনার বদৌলতে আগামীর তুরস্ক যে শক্তির উচ্চতায় পৌঁছাবে তাতে কি সন্দেহ আছে?

লেখক : রাজনীতিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *