মোদির বিজয়কে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিচ্ছে মুসলমানরা
ভারতের লোকসভা নির্বাচন ও বঙ্গবাসীর ভাবনা
ফয়জুল্লাহ আমান : হরে হরে মোদি, ঘরে ঘরে মোদি এ শ্লোগান এখন পশ্চিমবঙ্গের পথঘাটেও শোনা যাচ্ছে। সব কা সাথ সব কা বিকাশ এর প্রতিশ্রুতি দিয়ে মোদিজি ২০১৪ সালের পর ২০১৯ সালে দ্বিতীয়বারের মত প্রধানমন্ত্রি হচ্ছেন। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে হিন্দুত্ববাদী এ দল। প্রায় তিনশ আসনে এককভাবেই বিজয়ী হয়েছে বিজেপি। শরীক দলগুলিসহ আরও প্রায় পঞ্চাশটি আসন। সত্যি বিস্ময়কর। তবে এখানে নির্বাচনের তফসিলি জরিপ নিয়ে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। নির্বাচনকে ঘিরে আমাদের চিন্তা ও বাস্তবতা খতিয়ে দেখা দরকার। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অধিবাসী হওয়ায় ভারতের জাতীয় ঘটনাবলীর প্রভাব আমাদের ওপর পড়ে। আমাদের দেশে ভারতের নির্বাচন নিয়ে নানা রকম ভাবনা আছে। সেদেশের মুসলমানদের নিয়ে রয়েছে অধিকাংশের শংকা। রোহিঙ্গাদের মত হয়ত ভারত ছেড়ে সব মুসলমান বাংলাদেশ আসে কি না। ৩০ কোটির উপর মুসলমানের বসবাস ভারতে। সব যদি বাংলাদেশ এসে যায় তাহলে সত্যি বড় মসিবত হয়ে যাবে। তবে ভারতের মুসলমানরা আর যেখানেই যাক পাকিস্তান যে যাবে না সে নিশ্চয় করেই বলা যায়।
একটু পেছন ফিরে যাব। সেই ১৯৪৭ সাল। মুসলিম লীগের চরম উন্মাদনার সময়। মুসলমানদের প্রতি দরদ দেখিয়ে চমকপ্রদ সব শ্লোগান দিয়ে চরম এক বিশৃংখল পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল ভারতবর্ষ জুড়ে মুসলিম সমাজে। রক্তের গঙ্গা বহায়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের লাশের উপর দিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল পাকিস্তান। সাত কোটি মুসলমানের ভেতর চার কোটি মুসলমানই রয়ে গেলো ভারতে। ভারতে রয়ে যাওয়া মুসলমানরা নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে ছিল। হিন্দুরা বলছিল তোমরা তোমাদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র করে নিয়েছ কাজেই ভারতে তোমাদের বসবাসের কোনো অবকাশ নেই। বিরূপ পরিস্থিতির ভেতর অবস্থান করতে হয়েছে সেখানের মুসলমানদের। সংখ্যালঘু হয়ে ভীতিকর এক পরিবেশে তাদের থাকতে হয়েছে সেখানে। তবু শাইখুল ইসলাম মাদানী রহ. ও অন্যান্য দেওবন্দী আকাবিরের কল্যাণে অস্তিত্ব বিলোপের সম্মুখীন হতে হয়নি। সামাজিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ভারতীয় মুসলমানদের একটা অবস্থান তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিকভাবে ইন্ডিয়ান মুসলমানদের মর্যাদা পাকিস্তান বা বাংলাদেশের মুসলমানদের চেয়ে খুব একটা নিচে নয় এ সত্য অস্বীকারের উপায় নেই।
মূলত সাতচল্লিশে মুসলিম লীগের তা-বের কারণে ভারতীয় মুসলমানদের স্বাভাবিক রাজনীতিতে ফেরা কষ্টকর হয়ে পড়ে। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে সামাজিক সংগঠনে পরিণত হয়। তখনকার দিনে সেকুলার দল হিসেবে কংগ্রেসকে সাপোর্ট দিতে থাকে। অন্য কোনো প্লাটফর্ম তৈরি হতে পারে না ইন্ডিয়ান মুসলমানদের। এভাবে অর্ধশতাব্দি কেটে যায়। দেশভাগের ধাক্কা সামলে ওঠা নিঃসন্দেহে সময় সাপেক্ষ ব্যাপার ছিল। মনে পড়ে আমরা যখন দারুল উলুম দেওবন্দে পড়া শোনা করি; সেই ২০০৪ সাল। তখনও রাজনৈতিক সচেতনতা গড়ে ওঠেনি মুসলমানদের। অনেক ছাত্রের কাছে জানতে চাইতাম তোমার এলাকার এম এল এর নাম জান কি না। অধিকাংশ ছাত্রই দেখতাম বলতে পারত না। দেওবন্দ বা সাহারানপুরের সাধারণ মুসলমানরাও অনেকের হাল একই ছিল। এরপর একযুগ পর কিছু দিন আগে যখন ভারত গেলাম সেখানের মুসলিম সমাজের চিত্র অনেক পরিবর্তিত দেখতে পেলাম। এখন তারা অনেক বেশি রাজনীতি সচেতন। দেশভাগের ইতিহাস সম্পর্কেও তাদের খুব সজাগ দেখলাম। তা সত্ত্বেও মুসলমানদের কোনো স্বতন্ত্র প্লাটফর্ম গড়ে ওঠেনি। কিংবা তাদের সামনে স্পষ্ট কোনো সমাধান এখন পর্যন্ত অনুপস্থিত।
রাজেন্দ্র সাচার কমিটির রিপোর্ট প্রকাশের আগে নেতৃবৃন্দের মোহ কাটে না। গত দশকের শেষ দিকে এই রিপোর্ট বিশ^বাসীর সামনে আসে। তাতে মুসলমানদের বঞ্চনার দিকগুলি ফুটে ওঠে। দলিতদের চেয়ে দুরাবস্থায় রয়েছে মুসলমানরা। সেকুলার দল কংগ্রেসকে অপরিহার্য মনে করার মোহ সেই প্রথম ধাক্কা খেল। তবু বিজেপিকে সমর্থনের প্রশ্নই আসে না। কারণ কংগ্রেস আর যা হোক সেকুলারিজমে বিশ্বাস করে। ভারতীয় মুসলমানদের জন্য যা রক্ষাকবচ। বিজেপি নেতৃবৃন্দের মত গেরুয়া বসন পরে সভা সমাবেশ করে না। হিন্দুত্ববাদকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কোনো কারণ নাই। তবু কংগ্রেসের প্রতি তাদের অটুট বিশ্বাসে কিছুটা হলেও ফাটল ধরে। মাওলানা মাহমুদ মাদানী স্পষ্টই কংগ্রেসের প্রতি নিজের অসন্তোষের কথা উচ্চারণ করেন। পশ্চিমবঙ্গে আমার কিছু বন্ধুর মুখে আমি শুনেছি তারা মাওলানা মাহমুদ মাদানী সম্পর্কে বলছেন, আর এস এস মাওলানা মাদানীকে কিনে নিয়েছে। যতই কনফিডেন্সের সঙ্গে গান্ধিজির ভক্তি প্রকাশ করুন, ফাটল যে ধরেছে তা আর গোপন রাখা সম্ভব হয় না।
দক্ষিণ ভারতে উয়াইসির নেতৃত্বে ইত্তিহাদুল মুসলিমিন নামে আরেকটি রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে ওঠে। মুসলিম লীগের আদলে তারা ভারতীয় মুসলিমদের মাঝে উন্মাদনা সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। এ নির্বাচনে দেখা যাচ্ছে ইন্ডিয়ার মুসলমানরা ততটা মজেনি তাদের কথায়। ফলাফল প্রকাশের পর ইত্তিহাদুল মুসলিমিনের নেতাদের স্বর কিছুটা নতই মনে হচ্ছে। এর বিপরীতে সেকুলার বিচারধারায় বিশ^াসী জমিয়ত সমর্থিত আসামের বদরুদ্দিন আজমালের দল আগের মতই বেশ কটি আসনে ভালো ফল করেছে।
বিজেপি যতই গেরুয়া বসনে আবৃত হোক না কেন; ভারতে রাজনীতি করতে হলে অবশ্যই সেকুলারিজমকে নীতি হিসেবে মেনে নিয়েই কাজ করতে হবে। বিগত দিনগুলিতে আমরা দেখেছি মোদির সরকার বিভিন্ন সময়ে এদিক সেদিকের কথা বললেও সব কা সাথ সব কা বিকাশকেই নিজেদের মূলনীতি বলে প্রচারণ চালাতে বাধ্য হয়েছে।
সবশেষে প্রশ্ন, ভারতের মুসলমানদের এখন কী করণীয়? তাদের করণীয় তারা নিজেরাই নির্ধারণ করবেন। তবে যতদূর মনে হচ্ছে মুসলিম লীগি চিন্তাভাবনা তাদের কোনো কাজে আসবে না। কেবল কিছু বাহবাই পাওয়া যবে। মূর্খ হুজুগে জনতার করতালি পাওয়া যাবে; আকবরুদ্দীন ওয়াইসির বড় গলার বক্তব্যে কানশুক হবে। জাতীয় নির্বাচনে তাতে কোনো সুফল আসবে না। নব্বই কোটি ভোটারের দেশ ভারত। এটা বাংলাদেশ বা পাকিস্তান না যে, উগ্র মুসলিম জাতিয়তাবাদ প্রচার করে হুজুগে মানুষের ম্যান্ডেট নিয়ে ইচ্ছামত স্বার্থপর নেতৃবৃন্দ মাস্তি করে বেড়াবেন। অবশ্যই নতুন কোনো প্লাটফর্ম গড়ে তুলতে হবে ভারতীয় মুসলিমদের। তবে অ্যাবসুলটলি তা সেকুলার ভাবধারার আলোকে। অর্থাৎ সকল সংখ্যালঘু ও দলিত এবং তফসিলি হিন্দুদের নিয়ে একটি জাতিয় দল গড়ে তুলতে হবে। অবশ্যই হিন্দুত্ববাদ বিরোধি শ্লোগান নয়; ইতিবাচক মনোভঙ্গির একটি আদর্শবাদি গণতান্ত্রিক কাঠামো। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস, মায়াবতি, আম আদমি, মোনায়েম সিং যাদব বা মমতা দিদির তৃণমূল কংগ্রেসও নয়। আমার যতদূর জানাশোনা- সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছেন সেখানের মুসলিম নেতৃবৃন্দ। সংখ্যা লঘু হয়েও সঠিক রাজনৈতিক প্রজ্ঞা থাকলে নেতৃত্বের আসনে যাওয়া একেবারে অসম্ভব নয়।
বাংলাদেশের মুসলিম স্কলাররা পড়েছেন দোটানায়। মুসলিমলীগি মানসিকতার কারণে কংগ্রেসকে সমর্থন করতে পারেন না, আবার বিজেপি তো চরম হিন্দুত্ববাদি দল, যাদের অবস্থা কংগ্রেসের চেয়েও খারাপ। এজন্য তাদেরকে এ বিষয়ে একদম নীরব দেখা যাচ্ছে। হয়ত দৃষ্টিভঙ্গি কি হওয়া উচিত তা ভেবে পাচ্ছেন না। তবু মনে হয় অধিকাংশই চাচ্ছিলেন মোদির বিজয়। আমার ধারণা ভুলও হতে পারে। ভুল হোক ঠিক হোক এখন মোদিজির বিরোধিতা করে খুব একটা লাভ কারোরই নাই। শুনছি আওয়ামি বিরোধি শিবির মোদিকে সাপোর্ট করছে। তাদের মুখে হাসি ফুটেছে। তাদের আনন্দেরও কোনো কারণ দেখছি না। মোদি সরকার জামাত বা বিএনপির জন্য কিছু করবে বলেও মনে হয় না। যাক যার যার মনোভঙ্গি নিয়ে সাময়িক আনন্দ পেলে আমাদের তো কোনো ক্ষতি নেই। কাজেই সবাই মানসিক স্বস্তিতে থাকুক।
দারুল উলুম দেওবন্দের একজন উস্তাদ মুফতি মাহমুদ বুলন্দশহরি শুনতে পেলাম বিজেপি যেন জিততে না পারে সেজন্য দুআ করেছেন। এছাড়া দেখেছি উস্তাদে মুহতারাম মাওলানা আরশাদ মাদানী মোদি বিরোধিতায় সর্বশক্তি ব্যয় করছেন। সে দেশের পরিবেশ পরিস্থিতি সেখানের লোকেরাই ভাল বুঝবেন। আমরা বাইরে থেকে তবু বলব, নেতৃবৃন্দের আরও সংযমী আচরণই অধিক সম্মানজনক হবে। সাধারণ মুসলমানের ভেতর কিন্তু তেমন কোনো অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে না। হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা কংগ্রেসের সময় যেমন ছিল তার চেয়ে খুব একটা বাড়েনি। উত্তর প্রদেশে অবশ্য বিজেপি আগের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে। দারুল উলুম দেওবন্দেরও তাতে ভূমিকা রয়েছে। সরাসরি রাজনীতিতে দারুল উলুম দেওবন্দের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক হস্তক্ষেপ নাই। দেওবন্দের রাজনৈতিক ভূমিকা কাম্যবস্তুও নয়। পরিশেষে বলব, খাজা মাইনুদ্দিন চিশতি গেরুয়া রঙের পাগড়ি পরতেন। হিন্দুদের গেরুয়া রঙে ভক্তির কারণেই। দাওয়াতের ধর্ম ইসলামের অনুসারিদেরকে নমনীয় হতে হবে ইসলামের স্বার্থে। শান্তির স্বার্থে। ঐক্য ও সামাজিক সম্প্রীতির লক্ষ্যে। অসংখ্য ওলি আওলিয়ার দেশের মুসলিম জনগণ সুখে থাকুক; শান্তিতে থাকুক। ভারতের সব মানুষের জন্যই আমাদের শুভ কামনা সব সময়। কারণ তারা ভাল থাকলে প্রতিবেশি হিসেবে আমরাও ভাল থাকব। যে কোনো দল দিল্লির মসনদে উঠুক আমাদের সাথে সম্পর্ক যাতে ভাল থাকে সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।


