নিজস্ব প্রতিবেদক : পাড়া-মহল্লা থেকে কেনা চামড়া আড়তদারদের কাছে বিক্রি করতে গিয়ে মাথায় হাত পড়েছে মৌসুমি বিক্রেতাদের। বুধবার ঈদের দিন দুপুরের পর থেকে আড়তে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম কমতে থাকায় অনেক মৌসুমি বিক্রেতা হাজার হাজার টাকা লোকসান গুনেছেন বলে দাবি করেছেন। সরকার ট্যানারি মালিকদের জন্য চামড়ার দর নির্ধারণ করে দিলেও মৌসুমি বিক্রেতারা সেটি মাথায় রেখে বেশি দাম দিয়ে চামড়ায় কিনেই লোকসানে পড়েছেন বলে মনে করেন আড়তদাররা। বৃহস্পতিবার অনেকে পশু কোরবানি দিলেও আরও লোকসানের শঙ্কায় মৌসুমি বিক্রেতা আর চামড়া কিনতে সাহস করেননি।
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় চামড়ার মৌসুমি বিক্রেতা জহির উদ্দিন বৃহস্পতিবার রাতে সাংবাদিকদের বলেন, ঈদের দিন তিনি দেড়শ চামড়া কিনেই বড় অঙ্কের লোকসান গুনেছিলেন। তাই বৃহস্পতিবার আর চামড়া কিনতে পারেননি। “৬০০ থেকে ৯০০ টাকা দরে দেড়-দুই লাখ টাকার গরুর চামড়া কিনেছিলাম। অথচ অধিকাংশ চামড়াই বিক্রি করেতে হয়েছে ৪০০ টাকায়।” কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, “বুধবার রাত ৯টা নাগাদ কোনো আড়তদার আমার কাছে চামড়া কিনতে আসেনি। পরে রাত ১০টায় মানসী সিনেমা হল এলাকায় নিয়ে লোকসানে চামড়া বিক্রি করেছি।” এ বছর সরকার ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৪৫ টাকা থেকে ৫০ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। গত বছর লবণযুক্ত চামড়ার দাম ধরা হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ৫০ টাকা থেকে ৫৫ টাকা।
অন্যবছর রাজধানীর হাজারীবাগ ছিল কাঁচা চামড়া সংগ্রহের প্রধান ক্ষেত্র। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সাভারের হেমায়েতপুরে সরে যাওয়ায় এবার রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি, লালবাগের পোস্তা, নবাবপুরের মানসী সিনেমা হল, পুরান ঢাকার রায় সাহেব বাজার এলাকায় বসেছে চামড়ার অস্থায়ী পাইকারি বাজার। মৌসুমি বিক্রেতারা পাড়া-মহল্লা থেকে বেশি দামে চামড়া কেনাতেই বিপত্তি হয়েছে বলে মনে করেন লালবাগের পোস্তা এলাকার আড়ত প্রগতী লেদার কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, “এবছর চামড়ার সর্বোচ্চ মূল্য ৪৫ টাকা থেকে ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই হিসাবে প্রতি বর্গফুট চামড়া ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে। কারণ এর সঙ্গে লবণ দেওয়ার খরচ যোগ হবে। আবার এই চামড়া নিয়ে যেতে হবে সাভারের হেমায়েতপুরে। আগে আমরা হাজারীবাগে পৌঁছে দিলেই চলত। “অনেকে মহল্লা থেকে বেশি দামে চামড়া কিনে ফেলেছে। তারা আমাদের কাছে নিয়ে আসার পর সেই দাম আমরা দিতে পারিনি। এভাবেই চামড়া নিয়ে এবার একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে।” আরেক আড়তদার লাল মিয়া বলেন, “ঈদের দিন সকালের দিকে অনেকে চামড়ার বেশি দাম দিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু আমরা সেই দামটা দিতে পারিনি। বৃহস্পতিবার যারা চামড়া নিয়ে আসছেন তারা কিছুটা লাভবান হচ্ছেন।” একই ভাষ্য বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি আফতাব উদ্দিনের।
তিনি বলেন, “এবছর আন্তর্জাতিকভাবে চামড়ার দাম কম থাকায় দেশের বাজারেও সরকার দাম কিছুটা কমিয়েছে। কিন্তু অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী বিষয়টি ধরতে পারেননি। তারা ভেবেছিলেন এলাকা থেকে চামড়া সংগ্রহ করার পর তা প্রতি বর্গফুট ৪৫ টাকা থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি করতে পারবেন। কিন্তু এই দামটা আড়তদারদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, যারা লবণযুক্ত চামড়া ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রি করবেন। “অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী না বুঝতে পেরে এবার বেশি দামে চামড়া কিনে ফেলেছেন। তারা আংশিকভাবে একটু লোকসানের শিকার হয়েছেন।” এবছর ঢাকার দুই সিটিতে প্রায় পাঁচ লাখ পশু কোরবানি হয়েছে বলে নগর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এর সঙ্গে আশপাশের জেলা মিলিয়ে এবার ১০ লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য ধরেছে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন। তবে সংগঠনের সভাপতি হাজি দেলোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, দুই দিনে চার লাখ চামড়া সংগ্রহ হয়েছে। ট্যানারি মালিকরা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে বাকি চামড়া কিনে নিয়েছেন।


