যাকাতের ফিলোসফি | ফয়জুল্লাহ আমান

যাকাতের ফিলোসফি | ফয়জুল্লাহ আমান

যাকাতের ফিলোসফি

ফয়জুল্লাহ আমান ❑ ইসলামের চার স্তম্ভের অন্যতম হচ্ছে যাকাত। শাহাদার পর নামাজ রোজা হজ ও যাকাত এই চারটি হচ্ছে ইসলামের রোকন। নামাজ রোজা লিখলাম। কারণ এটাই আমাদের অভ্যাস। তা না হলে পবিত্র কোরআনে সবসময় নামাজের সাথে যাকাতের কথা আলোচনা করা হয়ে থাকে। নামাজ পড় যাকাত দাও। এভাবে পবিত্র কোরআনে বহুবার উল্লেখ করা হয়েছে।

যাকাতকে এত বেশি গুরুত্ব কেন দেওয়া হয়েছে? এ বিষয়টি বুঝতে হবে। নামাজ রোজা হজ তিনটিই হচ্ছে শারিরিক ইবাদত। অর্থাৎ যে ইবাদত করতে কোনো অর্থ ব্যয় হয় না। কেবল শারিরিক কসরত করতে হয়। হজ করতে দূরের মানুষের যাতায়াত খরচ বাবদ কিছু ব্যয় হয় কিন্তু বাইতুল্লাহর কাছের আরবের মানুষের সে খরচেরও প্রয়োজন পড়ে না। দেখা যাচ্ছে একমাত্র যাকাত হচ্ছে অর্থ সম্পদ ও মালের ইবাদত। জান মাল উভয়টির সাথে সম্পৃক্ত ইবাদত আদায় করলেই সত্যিকার মুসলিম হওয়া যায়। যাকাত দেওয়ার মাধ্যমে এ পূর্ণতা লাভ সম্ভব হয়।

মানুষের স্বভাবের ভেতর বখিলি ও কার্পণ্য আছে। এই কার্পণ্য হচ্ছে একটি চারিত্রিক দুর্বলতা। কার্পণ্যের বদ স্বভাব বাড়তে বাড়তে এমন হয় যে, পার্থিব বিষয়-আশয়ের প্রতি চরম পর্যায়ের মোহ তাকে পেয়ে বসে। মৃত্যুর সময় যখন সব সম্পদ ছেড়ে যেতে হবে তখন তার ভীষণ কষ্ট হওয়া স্বাভাবিকভাবেই বুঝতে পারা যায়। দুনিয়ায় বখিলির মন্দত্ব তাকে যেমন বিপদে ফেলে তার চেয়ে বেশি বিপদে পড়ে পরকালের জীবনে। যাকাত এ আপদ থেকে রক্ষায় সহায়কের ভূমিকা পালন করে। ধীরে ধীরে মানুষের স্বভাবের সংশোধন সম্ভব হয় যাকাত ও সদকার মাধ্যমে। নিয়মিত দানের মাধ্যমে দানশীলতা ও বদান্যতার গুণ স্বভাবে স্থিতি লাভ করে।

যাকাত অনেকেই আদায় করেন আবার অনেক মানুষের উপর হয়ত সারা জীবনে যাকাত ফরজই হয় না। কিন্তু আমাদের সবারই এর ফিলোসফিটা ভালো করে বুঝে নিতে হবে। উপলব্ধি করতে হবে ইসলামি শরিয়াতের বিধানসমূহের তাত্তিক দিক।

অনেক সময় আর কিছু না থাকায় নিজের গায়ের চাদরও দান করে দিয়েছেন এমন নজীরও আছে।

এখানে একটি বিষয় শুরুতেই বলে রাখি, আমাদের প্রিয় নবী সা.-এর উপর সারা জীবনে কখনওই যাকাত ফরজ হয়নি। যাকাত ফরজ হবার জন্য যেসব শর্ত রয়েছে তা রাসূল সা.-এর ক্ষেত্রে কখনও পাওয়া যায়নি। কারণ রাসূল সা. নিজের কাছে কিছুই জমিয়ে রাখতেন না। যা কিছু তাঁর প্রয়োজনাতিরিক্ত থাকত গরিব দুখির মাঝে বিলি বণ্টন করে দিতেন। সাড়ে বাহান্ন ভরি রৌপ্য বা তার সমমূল্য একবছর নবীজীর ঘরে পড়ে থাকা ছিল অসম্ভব। অনেক সময় আর কিছু না থাকায় নিজের গায়ের চাদরও দান করে দিয়েছেন এমন নজীরও আছে।

যাকাত বলতে আমরা কী বুঝি? এক বছর নেসাব পরিমাণ সম্পদ কারো কাছে জমা থাকলে চল্লিশ ভাগের একভাগ সম্পদ আল্লাহর জন্য গরিব দুখিদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া। আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশি ও মাদরাসা বা ইয়াতিমখানায় চল্লিশ ভাগের একভাগ সম্পদ দিয়ে দেওয়া। এটা পারিভাষিক অর্থ। শাব্দিক অর্থ হচ্ছে পবিত্রতা। দান করার মাধ্যমে নিজের আত্মাকে কলুষমুক্ত করা হচ্ছে যাকাতের প্রধান লক্ষ্য। আত্মাকে পরিশোধনের ক্ষেত্রে যাকাতের বড় ভূমিকা রয়েছে।

বর্তমানে যাকাত এ অর্থেই ব্যবহৃত হচ্ছে। চল্লিশ ভাগের এক ভাগ দান করাকেই যাকাত বলা হয় পরিভাষায়। কিন্তু ইসলামের শুরুর সময়ে যে কোনো দানকেই যাকাত বলা হতো। মূলত এখনও যে কোনো দানের ভেতর যাকাতের শাব্দিক অর্থ বহাল রয়েছে। পবিত্রতা। আত্মাকে পবিত্র করে দান সদকা। আত্মার পরিশোধনের ক্ষেত্রে যে কোনো দানেরই গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

মানুষ কোনো পশু নয়। একাকী বেঁচে থাকতে পারে না মানুষ। সামাজিক জীব হিসেবে তাকে অন্য সবাইকে নিয়ে বাঁচতে হবে। ধনী যেমন বাঁচবে, গরিবকেও বাঁচাতে হবে। আল্লাহ যাদের অর্থ সম্পদ দিয়েছেন তাদের অবশ্যই আশপাশের মানুষের খোঁজ খবর নিতে হবে। রাসূল সা. ইরশাদ করেন, ঐ ব্যক্তি মুমিন হতে পারবে না যে নিজের উদর পূর্তি করে অথচ তার প্রতিবেশী থাকে অভুক্ত। [তাবারানি]

যাকাত দেওয়া হয়ে গেল তো আর কোনো দায়িত্ব থাকল না। এমন ধারণা মোটেও শুদ্ধ নয়।

কেবল যাকাত আদায় করলেই কি দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে? আমাদের অনেকেরই ধারণা এমন। যাকাত দেওয়া হয়ে গেল তো আর কোনো দায়িত্ব থাকল না। এমন ধারণা মোটেও শুদ্ধ নয়। মূলত এরা যাকাতের মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারেনি। ইসলামের বিধানাবলির গভীরে প্রবেশ করতে হবে আমাদের। যাকাতের বিধান শরিয়তে আবশ্যকিয় করে দেওয়া হয়েছে। চল্লিশভাগের একভাগ আদায় না করলে পূর্ণ সম্পত্তি অপবিত্র থাকবে। কিন্তু এরপর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। যাকাত আবশ্যকিয় করা হয়েছে অভ্যাস করানোর জন্য। একবার অভ্যাস হয়ে গেলে সমাজের ও জাতিয় প্রয়োজনে যেন অভাবী দুস্থ মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসতে পারে। রাসূল সা. স্পষ্ট করে বলেছেন, জেনে রেখ, সম্পদে যাকাত ছাড়াও আরও হক রয়েছে। [তিরমিযি]

এখন করোনা ভাইরাসের কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মানুষ চরম অবস্থার ভেতর রয়েছে। এসময় যারা বিত্তশালী আছেন যাকাত আদায় করলেই তাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। যতদিন দেশে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে না আসে ততদিন সাধ্যমত সবাইকেই চেষ্টা করতে হবে দুর্যোগ মুকাবেলা করার। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, লোকেরা আপনার নিকট জিজ্ঞেস করে তারা কী খরচ করবে? আপনি বলুন, প্রয়োজন অতিরিক্ত সব কিছুই ব্যয় করো। [সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৯]

এটাই ইসলামের শিক্ষা। কেবল যাকাত নয়। নিজের সাধ্যের সবটুকু দিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। সদকার মর্মার্থ কেবল চল্লিশভাগের একভাগ নয়। চল্লিশ ভাগের একভাগ দিয়েই সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। মূল কথা হচ্ছে হামদর্দি ও সহানুভূতি। মানবিক বোধ ও সহমর্মিতার গুণ। সমাজের অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকট থেকে উত্তরণে আন্তরিক প্রয়াস প্রতিটি মুমিনের কর্তব্য। যাদের উপর যাকাত ফরজ নয় তাদেরও একথা বুঝে নিতে হবে। হাত গুটিয়ে না থেকে আমাদের ভেতর তৈরি করতে হবে বদান্যতা ও দানশীলতার গুণ। দানশীল ব্যক্তি আল্লাহর নিকটবর্তী, মানুষের নিকটবর্তী, জান্নাতের নিকটবর্তী, জাহান্নাম থেকে দূরে। বখিল আল্লাহ থেকে দূরে, মানুষ থেকে দূরে, জান্নাত থেকে দূরে, জাহান্নামের নিকটবর্তী। [তিরমিযি]

আসুন এ পবিত্র মাহে রমজানে বেশি বেশি দান সদকা করি। ছিন্নমূল দুস্থ নিরন্ন ও সব অসহায়ের কষ্টগুলো উপলব্ধির চেষ্টা করি। অভাবী অনাহারী মানুষের পাশে দাঁড়াই। এবং দানের হাতকে প্রসারিত করি। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন। আমীন।

লেখক: শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও সমাজ বিশ্লেষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *