আকায়ে নামদার, ফখরে মুজুদাত, তাজেদারে মদীনা, হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর রওজা পাকের সামনে দাঁড়ানো, রওজা যিয়ারত করা প্রত্যেক মুমিনের মনবসনা, মুমিনের মূলধন ও নিজ অবস্থা উন্নতি সবচেয়ে বড় মাধ্যম। এ জন্য নবীর প্রেমে সবসময় অন্তরে আশা জাগে মদীনা তাইয়্যেবার কাছে যাবে। এতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর রওজার যিয়ারত নসীব হবে, তার মুহাব্বাতের দৌলত হাসিল হবে। তাই কবির ভাষায় বলা হয়—
সে দিন খোদা তাআলা এনে দিন, যে দিন আমি যাব মদীনায়,
রাসূলের দেশের মাটি আমি লাগাবো মুখে মাথায়
হাজারবার আমি তোমার মদীনার প্রেমে পাগল হই,
আমার চলমান এই প্রেম মরলেও তোমার থেকে আলাদা হবার নয়,
আমার ইচ্ছে তো লক্ষ লক্ষ, কিন্তু সবচেয়ে বেশী ইচ্ছে যে,
মদীনার অধিবাসীদের মধ্যে আমাকে গণনা করা হোক।
জীবিত থাকব তো হেরেম শরীফের অধিবাসীদের মত ঘুরব ফিরব,
মরলে তবে মদীনার মাটি আমাকে খেয়ে নিবে
আমাকে হুজুরের রওজার আশে পাশে নিয়ে রাখবে।
(মাওলানা কাসেম নানুতুবী রহ.)
আল্লাহ তাআলা ও তার পেয়ারে হাবীব রাসূল সা. এর রওজা যিয়ারতের উৎসাহ দিয়েছেন। রাসূল সা. যিয়ারত করা আবশ্যক যাদের যিয়ারত করার শক্তি সামর্থ আছে। শক্তি সামর্থ থাকার পরও যদি কোন ব্যক্তি যিয়ারত না করে, তাকে অমানবিক জালেম বলা হয়েছে। নমুনা হিসেবে কয়েকটি হাদীস নিম্নরূপ-
১. রাসূল সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার কবর যিয়ারত করল, তার জন্য আমার সুপারিশ করা ওয়াজিব। (মেশকাত)
২. রাসূল সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার যিয়ারতে আসে এবং আমার যিয়ারত ব্যতীত তার কোন উদ্দেশ্য থাকেনা। তার জন্য আমি শাফায়াত করব। (মেশকাত)
৩. রাসূল সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি হজ করল। তারপর আমার রওজা যিয়ারত করল। সে ঐ ব্যক্তিদের মত যারা আমার জীবিতবস্থায় দেখেছে। (মেশকাত)
৪. রাসুল সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার যিয়ারতে এসেছে। সে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন আমার প্রতিবেশী হবে। (মেশকাত)
৫. হুজুর সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি বায়তুল্লার হজ করে। কিন্তু আমার রওযা যিয়ারত করল না। তবে সে আমার উপর যুলুম করল। (মেশকাত)
এই ধরনের নির্ভরযোগ্য বর্ণনা দেখে অধিকাংশ ফুকাহায়ে কেরামগণ রাসূল সা. পবিত্র রওজা যিয়ারত করাকে সুন্নাত বলে আখ্যায়িত করেছেন।
ফাতহুল কাদীরের লেখক আল্লামা কামাল ইবনে হাম্মাম রহ. শক্তি ও সামর্থবানদের জন্যে রাসূল সা. এর রওজা যিয়ারত করা ওয়াজিব লিখেছেন। এই জন্য প্রত্যেক মুসলমানকে (যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা শক্তি ও সামর্থ দিয়েছেন) রাসূল সা. এর রওজা যিয়ারত করার সৌভাগ্য হাসিল করার জন্য পুরাপুরি চেষ্টা করা উচিৎ। রওজা যিয়ারতের সাথে মসজিদে নববীতে উপস্থিত হওয়া। মসজিদে নববীতে নামায পড়া, খুতবা দেওয়া, দুআ করা, এতেকাফ করা। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস মোতাবিক, মসজিদে হারামের এক নামায অন্য মসজিদের এক হাজার নামাযের চেয়ে উত্তম। সৌভাগ্যবান তো তারাই যারাদের কপালে রাসূল সা. এর রওজা যিয়ারত ও মসজিদে নববীতে উপস্থিতি হওয়া নসীব হয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সৌভাগ্যবানদের সাথে রাখুন। আমীন।
যে সব মুসলমানরা এই সৌভাগ্য হাসিল করবে, তারা নিম্নুক্ত আদবসমূহের প্রতি লক্ষ্য রাখবে। তবেই অনেক ফায়দা হবে।
১, যখন মদীনামুনাওয়ারায় সফর শুরু হবে তখন এই নিয়ত করবে যে, আমি মসজিদে নববীতে উপস্থিতি এবং রওজা শরীফের যিয়ারতের জন্য সফর করছি।
২, মক্কা মুয়াযযামায় অথবা জেদ্দা থেকে রওয়ানা করার আগেই উত্তম ভাবে মদীনায় উপস্থিতির নিয়তে গোসল করে পরিস্কার পোশাক পরিধান করবে এবং খুশবু লাগাবে।
৩, মদীনা মুনাওয়ারার সফরের মধ্যে খুব বেশী করে আদব, এহতেরাম, আবেগ প্রকাশ করবে। যদি কবিতার অভ্যাস থাকে, তবে নবীর ভালবাসা এবং এশকে মোস্তফা প্রকাশ করার জন্য কবিতা পড়বে। এশক ও মুহাব্বাতের মাঝে মগ্ন হয়ে দরূদ শরীফ পড়তে থাকবে। যখন মদীনা মুনাওয়ারার নিকটবর্তী হবে, তখন দরূদ সালাম পড়তে থাকবে। কেননা, একজন মুমিনের জন্য দরূদ শরীফের থেকে উত্তম রাসূল সা. এর নিকট আর কিছুই হতে পারে না।
৪, যখন মদীনা মুনাওয়ারা চোখে দেখবে তখন আল্লাহ তাআলার কাছে এই দোয়া করবে। হে আল্লাহ, এটা তোমার পেয়ারে হাবীব এর মুহাব্বাতের শহর। তোমার হাবীব সা. এটাকে হেরেম বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এটার মধ্যে আমার প্রবেশ এবং আমার উপস্থিতিকে সবরকম আযাব থেকে হেফাজতের মাধ্যম বানিয়ে দাও।
আর যখন মদীনা মুনাওয়ারাতে প্রবেশ করবে। তখন সম্পূর্ণ নম্রতার সাথে কথা বলবে। আর এই দোয়া করবে- হে আল্লাহ, আপনি যে রহমের সাথে আমাকে এই মোবারক দিন দেখিয়েছেন যে, আমি তোমার হাবীবের শহরে প্রবেশ করেছি। এই রহমের সাথে তুমি আমাকে এখানে খাস বরকত দান করুন। আমাকে সব দোষত্রুটি থেকে আমাকে হেফাজত করুন।
৫, যিয়ারতের স্থানে যখন পৌঁছবে তখন যদি প্রথমেই গোসল না করে তবে গোসল করে, খুশবু লাগিয়ে উত্তম পোশাক পরিধান করবে। অতঃপর পরিপূর্ণ আদব ও বিনয়ের সাথে হুজুর (সাঃ) এর রওজা যিয়ারত করবে।
৬, তারপর অত্যন্ত নম্র ও বিনয়ের সাথে রওজার দিকে আসতে আসতে এই দুআ করবে- “হে আল্লাহ, এই স্থানের উপযুক্ত আদব ও সম্মান করার তওফিক দাও। আমার অন্তর ও আমার সব অঙ্গপতঙ্গকে আদবের খেলাফ থেকে হেফাজত করুন।” এই চিন্তা ও খেয়াল করা যে, আমি সবচেয়ে উত্তম স্থানে উপস্থিত হয়েছি, রাসূল সা. আমার কথা, আমার আবেদন শুনছেন। সম্পূর্ণ আদবের সাথে হালকা আওয়াজে দরূদ, সালাম ও হাদিয়া দেয়ার পর শাফায়াতের জন্য দরখাস্ত করবে। দরূদ, সালাম ছোট হতে পারে, লম্বা ও হতে পারে। সাধারণ লোকদের জন্য সংক্ষিপ্ত করা উত্তম। সালাম হবে এমন
الصلوة والسلام عليك يا رسول الله
الصلوة والسلام عليك يا حبيب الله
الصلوة والسلام عليك يا خير خلق الله
السلام عليك ايها النبي و رحمة الله
যদি লম্বা দরূদ সালাম পড়তে চাও, তবে হজ ও যিয়ারতের উপর লিখিত কিতাবসমূহের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। তারপর মুরুব্বী, বন্ধু, প্রিয়দের জন্য সালাম ও শাফায়াতের দরখাস্ত পৌঁছান। যারা আপনাকে সালাম দরূদ পৌঁছানোর অনুরোধ করেছে। হুজুর (সাঃ) এর খেদমতে দরূদ সালাম পেশ করে, দুই কদম ডান দিকে এগিয়ে হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর রওজার সামনে সালাম দিবে ।
السلام عليك يا خليفة رسول الله، السلام عليك يا وزير رسول الله، السلام عليك يا صاحب رسول الله في الغار ورحمة الله وبركاته
অতঃপর দুই কদম বাম দিকে এগিয়ে হযরত ওমর ফারুক রা. এর খেদমতে সালাম পেশ করবে।
السلام عليك يا امير المؤمنين السلام عليك يا عز الاسلام والمسلمين ورحمة الله وبركاته
তারপর কিবলামুখী হয়ে রাসূল সা. এর উসিলায় নিজে জন্যে, নিজের পরিবারের জন্যে সকল মুসলমানদের উন্নতির জন্যে মনোযোগের সাথে দোয়া করবে।
মদীনা মুনাওয়ারার মধ্যে অবস্থানের একেকটি মুহূর্তকে গণিমত মনে করবে। যে পরিমাণ সম্ভব হয় ইবাদতের মাঝে মশগুল থাকবে। প্রত্যেক নামাজ মসজিদে নববীতে আদায় করা এবং চেষ্টা করবে রিয়াযুল জান্নাতে অথবা তার এক অংশে নামাজ পড়া, যা হুজুর সা. এর জামানায় মসজিদ ছিল। দরূদ শরীফ সব সময় পড়তে থাকবে। অধিকাংশ সময় হুজুর সা. এর রওজায় উপস্থিত হওয়া এবং সালাম দেয়া, কেননা এই মহান দৌলত আর কোথায় মিলবে? বেশী সময় মসজিদে অবস্থান করবে।
শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী নাওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু নিজের এক লিখার মাঝে বর্ণনা করেন রওজা মোবারকে উপস্থিতির সময় রাসূল সা. এর রূহের উপর হাদিয়া পাঠাবে এবং এই কথা অন্তরের মধ্যে রাখবে যে, তিনি সব কিছু শুনছেন এবং আমি দুনিয়ার বাদশাহের দরবারে দাঁড়িয়ে আছি। অত্যন্ত আদবের সাথে থাকা। অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা ও অপ্রয়োজনীয় মজলিস থেকে বেঁচে থাকা। সম্পূর্ণ সময় দরূদ শরীফ, যিকির, মুরাকাবা, কুরআন তেলাওয়াত এবং নফল নামাজে মশগুল থাকা।
অতিরিক্ত মানুষ হওয়ার কারণে ইবাদতের স্থানে পৌঁছে নিরবে ধ্যানে মগ্ন হয়ে নামাজ, দোয়া দরূদ পড়ার সুযোগ পাওয়া যায়না; অভিজ্ঞতার আলোকে তিনটি সময়ে সুযোগ পাওয়া যায় ১. এশার নামাজের প্রায় এক ঘণ্টা পর। ২. ফজরের নামাজের দেড় ঘণ্টা পর। ৩. জোহরের নামাজের এক ঘণ্টা পর। যদি ইবাদত করার স্থানে নীরবতার সাথে নামাজ, তাসবীহ-তাহলীল করার সুযোগ না মিলে তবে, মসজিদে নববীতে যে জায়গায় নীরবতার সাথে আমল করা যায় সেখানেই আমল করবে।
মদীনা মুনাওয়ারায় অবস্থানের সময় প্রত্যেক নামাজের পর চেষ্টা করবে হাদীস শরীফ থেকে হাদীস এবং দরূদ সালাম চল্লিশ বার পড়ার। এর দ্বারা অনেক ফায়দা অনুভব হবে ইনশাআল্লাহ।
লেখক : উস্তাদুল হাদীস : দারুল উলুম দেওবন্দ, ভারত।
সূত্র : নেদায়ে শাহী : জুলাই ২০১৮
অনুবাদ : আহমাদ মুস্তাকিম আল হুসাইন শাকির


