রাজার বিসর্জন!

রাজার বিসর্জন!

ক্রীড়া ডেস্ক : ব্রুনা মার্কেজিন রিওতে অভিনয়ের মঞ্চে সমস্ত মন-প্রাণ ঢেলে সত্যিকারের প্রার্থনা করেছিলেন তাঁর রাজা রক্ষা পান। কিন্তু রাজা রক্ষা পেলেন না। ব্রাজিলের হলো বিসর্জন।  শেষ মহারাজা নেইমারের হলো ছুটি। কাজান থেকে বেলজিয়ামের ক্যারাভান ছুটছে এখন সেন্ট পিটার্সবার্গে। যেখানে তাদের জন্য কয়েক ঘণ্টা আগেই অপেক্ষার সেমিফাইনালের মঞ্চ সাজিয়ে বসে আছে প্রতিবেশী ফ্রান্স।

নিজেরা কেঁদেছেন। নেইমাররা সমর্থকদেরও কাঁদিয়েছেন। ছবি: রয়টার্সনিজেরা কেঁদেছেন। নেইমাররা সমর্থকদেরও কাঁদিয়েছেন। ছবি: রয়টার্সসময় তো আর অনন্ত দীর্ঘ ফিতে নয় যে টান দিলেই আরও বেরিয়ে আসবে। পাঁচ মিনিট, তিন মিনিট, দুই মিনিট…এক মিনিট করে সময় আসছিল ফুরিয়ে। একটা বল নিয়ে নেইমাররা বেলজিয়াম বক্সে গেলে হলুদ সাগরে গর্জন উঠছিল, ব্রাজিল, ব্রাজিল…। তার মানে সমর্থকেরা শেষ পর্যন্ত আশা ছাড়েনি। সেই আশা শেষ পর্যন্ত মরীচিকা হয়ে মিলিয়ে গেল। আর একটা গোল করতে পারলে ম্যাচটা আরও ৩০ মিনিট আয়ু পায়, কিন্তু সেই গোলই যে আর করতে পারল না ব্রাজিলের কেউ। বিরতির আগে ২-০ গোলে এগিয়ে যাওয়া বেলজিয়ামের সঙ্গে ব্যবধান কমিয়ে এনেছিলেন রেনাতো অগুস্তো। সমতাও তিনি ফেরাতে পারতেন চার মিনিটের মধ্যে। কিন্তু ওই যে ব্রাজিলের পা থেকে আজ কোনো বলই যেতে চাইছিল না বেলজিয়ামের জালে। পাওলিনহোর বদলি নামা অগুস্তো অবিশ্বাস্যভাবে মিস করে সেটাই প্রমাণ করলেন।

দক্ষিণ দিকের গ্যালারির ড্রামগুলো বাজতে বাজতে থেমে গেল। ক্যামেরা সরে গিয়ে এক তরুণীর মুখে ধরল। চোখ ভেজা। ডাগআউটে শূন্য দৃষ্টি মেলে মাঠের দিকে মুখ দ্বিতীয়ার্ধে আর না নামা উইলিয়ান। হলুদ স্রোত নীল বেদনা বুকে নিয়ে ক্ষীণ ধারায় বেরিয়ে গেল। জার্মানি, আর্জেন্টিনার পর কাজান আবারো হন্তারক। তার সবুজ বুকে খুন হলো ব্রাজিলের স্বপ্ন। তবে ভরা গ্যালারির সামনে খুন মানেই তো উল্টো দিকে বিজয়ের উল্লাস। সেই উল্লাসটা করল বেলজিয়াম।

১৩ ওল্টালে ৩১। ১৩ মিনিটে নিজেদের জালে নিজেদের গোল। আর ৩১ মিনিটে কোচিং ম্যানুয়ালের মতো পাল্টা আক্রমণ থেকে বেলজিয়ামের গোল। এতেই উল্টে গেল ম্যাচের ভাগ্য।
১২ মিনিটের মধ্যে গোটা চারেক আক্রমণ থেকে গোটা দুই গোলের সুযোগ বের করে প্রথম গোল খায় ব্রাজিলই। মারুয়ানে ফেলাইনির শট থিয়াগো সিলভা ফিরিয়েছিলেন কর্নার করে। নাসের চাদলির কর্নার ক্লিয়ার করতে গিয়ে ফার্নান্দিনহো বল জড়িয়ে দেন নিজেদের জালে। নেইমারের কর্নার খুব সহজেই ক্লিয়ার করে বল বাড়িয়ে দেন রোমেলু লুকাকুকে। তারপর সেকি দৌড়, মাঝমাঠ চিরে বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে লুকাকু ডানে বল দেন কেভিন ডি ব্রুইনাকে। ম্যানচেস্টার সিটির প্লেমেকার ডান পায়ের তীব্র শটে বল জড়িয়ে দিয়েছেন দূরের পোস্টে। ব্রাজিল গোলকিপার অ্যালিসনের কিছু করার ছিল না। খেলার তখন ৩১ মিনিট।

ব্রাজিল গোল ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু তেকাঠির মধ্যে বলটা রাখবেন কে? অন্যদিন প্রতিপক্ষের বক্সে ঝড় তুলে রক্ষণ ভেঙে ফেলতে পেরেছেন, নম্বর নাইন গ্যাব্রিয়েল জেসুস কাল ফাঁকা কামানই দেগে গেছেন। ৩৫ মিনিটে নেইমারের ক্রসে হেড করে পাঠিয়েছেন ক্রসবারের ওপর। দুই মিনিট পর কুতিনহোর শট কোনোক্রমে কর্নার করে বাঁচিয়েছেন থিবো কুর্তোয়া।
নেইমার-জেসুসদের সমস্যাটা হলো, বেলজিয়ান খেলোয়াড়দের পায়ের জঙ্গলের মধ্যে লক্ষ্যভেদী শট করতে পারছিলেন না তাঁরা। রক্ষণে তিনজনের জায়গায় কী দ্রুত ছয়জন হয়ে যাচ্ছিল বেলজিয়াম। আবার আক্রমণে যখন যাচ্ছে, সেখানেও বাড়তি একজন লোক। তিনের জায়গায় চার। ডি ব্রুইনা আগের চার ম্যাচে হারিয়েছিলেন কোন কাননে। আসল ম্যাচেই দুষ্প্রাপ্য অর্কিড হয়ে বেরিয়ে এলেন। মাঝমাঠে ফেলাইনির সঙ্গে দুর্দান্ত সমন্বয় গড়েছেন, ভয়ংকর গতিতে পাল্টা আক্রমণ হেনেছেন লুকাকু আর এডেন হ্যাজার্ডের সঙ্গে বোঝাপড়া করে।
আর ব্রাজিল? গত দুটি ম্যাচে গতির সঙ্গে নৈপুণ্য মিশিয়ে যেভাবে ব্রাজিলের মধ্যে ফিরে অসার ইঙ্গিত দিয়েছিল, তাতে তাদেরই এই ম্যাচে ধরা হয়েছিল ফেবারিট। কিন্তু কাল দেখা গেল বেলজিয়ামের গতির কাছে তারা ধুসর। এই গতিই গড়ে দিল ব্যবধান।

নিজেরা কেঁদেছেন। নেইমাররা সমর্থকদেরও কাঁদিয়েছেন। ছবি: রয়টার্সনিজেরা কেঁদেছেন। নেইমাররা সমর্থকদেরও কাঁদিয়েছেন। ছবি: রয়টার্সব্রাজিলের অভাব আরেকটি ছিল। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার কাসেমিরো। ফার্নান্দিনহোকে নিয়ে ব্রাজিল পুরোপুরি নিশ্চিত না থাকলেও অস্বস্তিতে ছিল না। কিন্তু কার্যত ফার্নান্দিনহো কাসেমিরোর বিকল্প হতে পারেননি, পারেন না। তাঁর ভুলে একটা গোল হয়েছে, আবার কাসেমিরো যেমন আক্রমণেও সাহায্য করেন সেটি তিনি পারেননি।

গত ৯ বছরের মধ্যে তিতের দল সর্বোচ্চ ১৫ ম্যাচ অপরাজিত। যে অপরাজিত ধারাটা চলছে ২০১৭ থেকে। কাল সেটি ভেঙে দিল বেলজিয়াম। সবকিছুরই একটা শেষ আছে।
তবে এই শেষটা ব্রাজিলের জন্য মর্মান্তিক। গতবার দেশের মাটিতে স্বপ্ন খুন হয়েছিল সেমিফাইনালে। এবারও ফেবারিটের তকমা গায়ে দিয়ে শেষ আটের ওপরে যাওয়া গেল না। সেই ২০০২ বিশ্বকাপ জয়ের পর আর ফাইনালের মঞ্চে যাওয়া হচ্ছে না। শিরোপার অপেক্ষা ২০ বছরে গড়াল। কবে আসবে শিরোপা ষষ্ঠক?

এই লেখা যখন শেষ করছি, বেলজিয়ামের বেঞ্চের খেলোয়াড়েরা দৌড়াচ্ছে। দ্রুত গতিতে। সেমিফাইনালের জন্য প্রস্তুতি। পাশে থিয়েরি অঁরির মুখ উঁকি দিল না! হ্যাঁ, ওই তো অঁরি, ফ্রান্সের ২০০২ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক এখন বেলজিয়াম দলের সহকারী কোচ। তিনি জানেন শেষ আটে কীভাবে ব্রাজিলের স্বপ্ন খুন করতে হয়। ২০০৬ বিশ্বকাপে অঁরির গোলেই যে জার্মানি থেকে ছুটি হয়ে গিয়েছিল ব্রাজিলের।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *