নিজস্ব প্রতিবেদক : নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজধানীতে টানা ষষ্ঠ দিনের মতো আন্দোলন করেছে শিক্ষার্থীরা। সড়কে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে গাড়ি পরিচালনার জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করছে দেশের স্কুল-কলেজের ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা। গাড়ির কাগজপত্র না বুঝলেও লাইসেন্স আছে কিনা তা জানতে চাওয়া হচ্ছে চালকদের কাছে। এদিনও লাইসেন্সবিহীন চালকদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ট্রাফিক পুলিশের কাছে। অনেক চালকই মামলা নিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে স্থান ত্যাগ করেছেন। চালকরা প্রকাশ্যে নিজেদের ভুলের কথা স্বীকারও করেন।
শুক্রবার দিনভর রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর থেকে ভাষাণটেক পর্যন্ত সড়কের যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে শিক্ষার্থীরা। বিকাল ৩টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর গোল চত্বরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি জিপ আটক করে তারা। গাড়িটিতে তিনজন নারী, তিন শিশু ও এক যুবক ছিলেন। শিক্ষার্থীরা যখন গাড়িটি আটক করে, তখন তার সামনে সাদা কাগজে কম্পোজ করা ‘স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ব্যবহারের জন্য’ লেখা ছিল। ওই গাড়ির চালক লিটনের কাছে কোনও কাগজপত্র ছিল না। এমনকি তার ড্রাইভিং লাইসেন্সের মেয়াদও পার হয়ে গেছে। শিক্ষার্থীরা তাকে গোলচত্বরে হারুন মোল্লা পুলিশ বক্সে নিয়ে যায়। পুলিশ তাকে ২০০ টাকার মামলা দিয়ে ছেড়ে দেয়। বিষয়টি জানতে চাইলে চালক লিটন বলেন, লাইসেন্স নাই, এটা আমার লজ্জা। এ নিয়ে আমি আর কথা বলতে চাই না।
শিক্ষার্থীরা মিরপুরে একই রকমভাবে সিএনজি চালিত অটোরিকশা, প্রাইভেটকার, পিকআপ ভ্যান, ট্রাক ও মোটরসাইকেল চালকদের কাছেও লাইসেন্স দেখতে চেয়েছে। অনেকেই লাইসেন্স ও কাগজপত্র গাড়ির সামনে রেখে দিয়েছে। বারবার বের করার বিড়ম্বনা এড়াতেই তারা লাইসেন্স গাড়ির সামনে রেখে দেন। তবে কিছু দূর পর পর লাইসেন্স দেখতে চাওয়ায় অনেকেই বিরক্ত প্রকাশ করেন। মিরপুর বিআরটিএ’র সামনে ফরিদুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখতে চায় শিক্ষার্থীরা। এরপর তার লাইসেন্সটি আর ফেরত দেয়নি। লাইসেন্সটি কার কাছে তাও বলতে পারেনি শিক্ষার্থীরা। তিনি মিরপুর ১০ নম্বরের গোলচত্বরে হারুন মোল্লা পুলিশ বক্সে তার লাইসেন্স খুঁজতে যান। কিন্তু সেখানেও লাইসেন্সটি কেউ জমা দেয়নি। ফরিদুল আলম বলেন, আমি আমার ছেলেকে কোচিং থেকে নিয়ে আসতে গিয়েছিলাম। তখন আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে নেয় শিক্ষার্থীরা। তবে ফেরত দেয়নি। পুলিশের কাছে একজন জমা দেয়ার কথা বলল, তবে দেয়নি। তবে শিক্ষার্থীদের অনুরোধ অনুযায়ী প্রায় সব চালকই সারিবদ্ধ হয়ে গাড়ি চালিয়েছে। যারা ব্যতিক্রম করেছে তাদেরই মামলা দেয়ার জন্য পুলিশের কাছে নিয়ে গেছে শিক্ষার্থীরা। মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা ৬০ ফিট রাস্তার ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করেছে। শিক্ষার্থী সাদ্দাম বলেন, আমরা সড়কে শৃঙ্খলা চাই। সবাই ট্রাফিক আইন মেনে চলুক আমরা তাই চাই। আমরা সবার সহযোগিতা চাচ্ছি। শুক্রবার সকালে আসাদ গেট এলাকায় ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এলাকায় মানববন্ধনও করেছে শিক্ষার্থীরা। একই সময় তারা ট্রাফিক আইন মেনে চলার জন্য চালকদের অনুরোধ করেছে। পথচারীদের ধরে ধরে ফুটপাত ব্যবহারের জন্যও উৎসাহিত করেছে তারা। তবে শিক্ষার্থীরা সড়কে যেভাবে ট্রাফিক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করছে, তা ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মীর রেজাউল আলম। তিনি বলেন, কাজটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ছোটছোট শিশুরা সেটা করছে। আমরা তাদের সহযোগিতা করছি। কারণ তারা এখন আবেগী হয়ে আছে। তাদের সহপাঠি মারা গেছে, তারা সেন্টিমেন্টাল হয়ে আছে। আমরা তাদের সেন্টিমেন্টের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তারা ত্রুটিপূর্ণ কাগজপত্রসহ গাড়ি নিয়ে আসলে আমরা সেগুলোকে মামলা দিচ্ছি। গত কয়েকদিনে মামলার পরিমাণ আগের চেয়ে কমে গেছে বলেও জানান তিনি। পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, আগের চেয়ে অনেক কম মামলা হচ্ছে। কারণ সড়কে গণপরিবহন নেই। এদিকে দিনভর শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন গুজবও ছড়িয়েছে। শিক্ষার্থীরা কেউ কেউ বলছে, তাদের স্কুল তাদের টিসি দিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। তবে এরকম কোন তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি গ্রুপ ম্যাসেঞ্জারে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বিভিন্ন উস্কানি ম্যাসেজ ছড়াচ্ছে। যাতে হামলা ও প্রতিরোধের কথা বলা হয়েছে। এনিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্কও রয়েছে। মিরপুর ১০ নম্বরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একজন রিজন জানান, তাকে অন্য কলেজের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে যেকোনও সময় হামলা হতে পারে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে সরানোর জন্য ওই হামলা হবে বলেও তিনি জানান। টানা ষষ্ঠ দিনের পরও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কখন প্রত্যাহার করা হবে সে বিষয়ে কোনও দিক নির্দেশনা নেই কারো কাছে। শনিবারও তারা রাজধানীর সড়কপথ দখলের কথা জানিয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নিজেদের ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারের গ্রুপে আলোচনা করে স্থান ও সময় নির্ধারণ করে নামবে বলে জানিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি মেনে নেয়ার পরও আন্দোলন চালিয়ে যাবার ব্যাখ্যায় শিক্ষার্থীরা শুক্রবার সারাদিন নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছে। মিরপুরের সরকারি বাঙলা কলেজের শিক্ষার্থী কাওসার আলম বলেন,নিরাপদ সড়কের শতভাগ নিশ্চয়তা চাই। যেহেতু আমাদের হুমকি দমকি দেওয়া হচ্ছে, তাই ধারণা করছি, আন্দোলন থেকে সরে গেলে আমাদের দাবি পূরণ হবে না।


