লালবাগীয় রাজনীতির কি অবসান হচ্ছে?

লালবাগীয় রাজনীতির কি অবসান হচ্ছে?

লালবাগীয় রাজনীতির কি অবসান হচ্ছে?

আমিনুল ইসলাম কাসেমী

বেশ কয়েকদিন ধরে একটা বিষয় অনেকের মধ্যে জেগে উঠছে বারবার। ঢাকা লালবাগ মাদ্রাসা কেন্দ্রীক ইসলামী রাজনীতির কি অবসান হচ্ছে? নাকি আবার জেগে উঠছে? কেননা, এই লালবাগ মাদ্রাসা থেকে প্রায় অর্ধ শতাব্দীরও বেশী সময় এদেশের ইসলামী রাজনীতির নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছে।। সেই ১৯৫০ সনে লালবাগ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে নিয়ে, এদেশে ইসলামী রাজনীতি মুল চাবিকাঠি কিন্তু এখানেই ছিল। এই দ্বীনি ইদারার বড় বড় মনীষীগণ বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দেশ ও আন্তর্জাতিক যে কোন ইসলামবিরোধী কার্যকলাপের মোকাবেলায় তাঁদের অগ্রণী ভূমিকা ছিল।

মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. যিনি স্বৈরাচার আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। আইয়ুব খানের ইসলামবিরোধী সকল কার্যকলাপের বিরুদ্ধে তিনি গর্জে উঠতেন। বহু সংগ্রাম করেছিলেন মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী।

স্বাধীনতার পর এই লালবাগ থেকে হাফেজ্জী হুজুর রহ. তওবার ডাক দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের আনাচে- কানাচে তাঁর ডাক পৌঁছে গিয়ে ছিল। ৮১ সনে তিনি প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করে হৈচৈ ফেলে দিয়ে ছিলেন। একটা মাদ্রাসার গন্ডি থেকে প্রেসিডেন্ট পদে ইলেকশন করা সাধারণ কোন বিষয় নয়। কিন্তু সেটা সেই মহান বুজুর্গের কারিশমা ছিল। আর তাঁর সেই নির্বাচনী হাওয়া বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

হযরত হাফেজ্জীর সাথে এই লালবাগ জামেয়া থেকে আন্দোলন সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছেন শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ.। যিনি শামসুল হক ফরিদপুরী রহঃ এবং হাফেজ্জী হুজুরের খাছ শাগরেদ ছিলেন। তাঁদের সংস্পর্শে শায়খুল হাদীস সাহেবও বিশ্ব বরেণ্য হয়ে যান।

শায়খুল হাদীসের পরে লালবাগ জামেয়া থেকে হুঙ্কার দিতেন মুফতী ফজলুল হক আমিনী রহ.। যিনি আগের সকল মহান মনীষীদের সোহবতপ্রাপ্ত ছিলেন। তাদের বিশেষ দুআ ও নেগরানীতে মুফতী আমিনী সাহেবও এক মহীরুহে আভির্ভূত হন। যার নেতৃত্বে বাংলাদেশে বহু আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে। বাতিলের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। একজন লড়াকু সৈনিক ছিলেন মুফতী আমিনী।
মোটকথা লালবাগ জামেয়া বহু বুজুূর্গ এবং মর্দে মুজাহিদ ব্যক্তিদের স্মৃতি বিজড়িত জায়গা। একটা মিলনমেলা ছিল বুজুর্গ আলেমদের। আল্লাহর খাছ বান্দাদের সমাবেশ ঘটেছে সেখানে। এমনিভাবে মর্দে মুজাহিদ আলেমদের পদচারণা ঘটেছে এখানে।

সেই লালবাগ জামেয়াকে মাইনাস করা কতদূর সমিচীন সেটা কিন্তু ভাবার বিষয়। বিশেষ করে মুফতী আমিনী সাহেবের মত ব্যক্তিদের সোহবত প্রাপ্ত লোকদের দূরে ঠেলে দেওয়া ইসলামী রাজনীতির জন্য কতদূর কল্যাণকর সেটাও চিন্তা করতে হবে আমাদের।

মুফতী ফয়জুল্লাহ, আবুল হাসানাত আমিনী, তাদের অন্যায় বহু, সেটা আমি জানি, কিন্তু অন্য কারো কি ঐ রকম অপরাধ নেই? সমান অপরাধ করার পরেও একজনকে হেফাজতের ঢাকা মহানগরীর সভাপতি পদে বসানো হল, আবার তিনি কেন্দ্রীয় যুগ্ন মহাসচিব বটে। কিন্তু এই দুজনকে বাদ দেওয়া হল কেন এটা কারো বোধগম্য নয়।

কওমী অঙ্গনে বহু রাজনৈতিক যোদ্ধা রয়েছে। কওমীর গর্ব বলা যায় তাদেরকে। কিন্তু তারপরেও তাঁদের দূরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বারবার। কওমী অঙ্গনে ঐসব আলেমদের অনেক অবদান রয়েছে।

দেখুন! আমরা কত হুজুগি, শাহরিয়ার কবিরকে একবার একটু কথায় পরাজিত করার কারণে এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী সাহেবকে নিয়ে আমরা নাচানাচি শুরু করে দিলাম। একদম সে যেন আমাদের খালাত ভাই বনে গেল। কিন্তু আরো কতজন কওমীর বাকপটু ব্যক্তি বহুবার টকশোতে বসে ইসলামবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেছেন। আমরা তাদের কিন্তু ঐ রকম খালাত ভাই বানাতে পারিনি।

আল্লামা আহমাদ শফি রহ,-এর ছোট সাহেবজাদা আনাস মাদানী কিন্তু আমাদেরই লোক। তিনি আমাদেরই শায়েখের ছেলে। তার কিছু ভুল- ত্রুটির কারণে তাকেও ছুড়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু এর থেকে বহু অন্যায়কারীদের হেফাজতে জায়গা হচ্ছে। তবে আনাস মাদানীকে সহ্য করা হচ্ছে না।

আমার বুঝে আসে না, এসব তুখোড়- বাগ্মী ব্যক্তিদের বাদ রেখে, কওমী অঙ্গনের প্রথিতযশা বহু আলেমকে কোনঠাসা করে হেফাজত কতদুর যাবে,কতদুর সফল হবে সেটা চিন্তার বিষয়। এছাড়া ঐ সব লোকদের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দূরে ঠেলে দিয়ে হেফাজত এবং আলেমদের আন্দোলন কতদূর সফল হবে? সেটাও ভাবতে হবে।

আমি আগেও একবার কলাম লিখে ছিলাম, বাদ পড়া প্রতিভাবান নেতাদের হেফাজতে নিয়ে আসা হোক। তাদেরকে যথাযথ সন্মান প্রদর্শন করা হোক। তাহলে আমাদের বাঁধা কমে যাবে। নিজেদের মাঝে ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটবে। কিন্তু তাদের কোন জায়গায় রাখা হয়নি। কিন্তু এখন যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে, তাতে কতটুকু উপকার হবে এজাতির,সেটা চিন্তার বিষয়।

এখন যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে, তাতে আমরা নিজেরা নিজেরা লড়াই করতে যাচ্ছি। আরেকজনকে নাঙা করতে হচ্ছে। একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে আদাজল খেয়ে লেগে যাবে। কেউ কারো সন্মান রাখবে বলে মনে হয়না। অথচ ঘরের ছেলে ঘরে নিয়ে আসলে এই সমস্যা হয় না।

এজন্য আগেই গভীর চিন্তা করা প্রয়োজন। নিজেরা মীসাংসা করা প্রয়োজন। লালবাগ কেন্দ্রীক রাজনীতির অবসান নয়। বরং লালবাগ এর একটা আছর আছে অবশ্যই। এখান থেকে অর্ধ শতাব্দীর রাজনীতি সাপ্লাই হয়েছে। ঘটা করে সেটাকে বাদ দিলে বুমেরাং হতে পারে।

মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী, হাফেজ্জী হুজুর, শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক, মুফতী আমিনী, এরকম শত বুজুর্গ এর চারণ ভূমিকে অবহেলা করা বোকামী ছাড়া আর কিছু নয়। বরং তাদের ইজ্জত- সম্মান বজায় রাখার নিমিত্তে মিলে মিশে কাজ করা উচিত। আল্লাহ আমাদের উপর রহম করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *