লালমনিরহাটে তিস্তাসহ মৃতপ্রায় ১৩ নদী

লালমনিরহাটে তিস্তাসহ মৃতপ্রায় ১৩ নদী

নিজস্ব প্রতিবেদক ● নদী শাসন আর দখলে আজ তিস্তাও পানিশূন্য। প্রমত্তা তিস্তার সেই ভরা যৌবন আর নেই। যৌবনহারা তিস্তার বুকে পড়েছে বড় বড় চর। যতদূর চোখ যায়, ধু-ধু বালুচর। তিস্তার এই অবস্থায় সহজেই অনুমেয় দেশের অন্য নদ-নদী-খালগুলোর অবস্থা। ফারাক্কা বাঁধ, তিস্তা চুক্তি না হওয়া, তিস্তা নদীতে ভারতের গজলডোবা ব্যারেজ এবং নদী শাসন আর দখলের কারণে বাংলাদেশে অধিকাংশ নদ-নদী-খালগুলো আজ পানিশূন্য।

নদ-নদী-খালগুলোর বর্তমান এ অবস্থার কারণে প্রকৃতিতে, মানুষের জীবনযাত্রায় এবং চাষাবাদ কী বিরুপ প্রভাব পড়েছে তার চিত্রও ফুটে উঠেছে প্রতিবেদনে। পানির অভাবে উত্তরাঞ্চলের জেলা লালমনিরহাটের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তাসহ ছোট-বড় ১৩ নদী শুকিয়ে এখন মৃতপ্রায়। এক সময়ের খর¯্রােতা নদীগুলো পানিপ্রবাহ হারিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। নদীগুলো হলো তিস্তা, ধরলা, রতনাই, স্বর্ণামতি, সানিয়াজান, সাঁকোয়া, মালদহ, ত্রিমোহিনী, সতী, গিরিধারী, ছিনাকাটা, ধলাই ও ভেটেশ্বর। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)-এর তথ্যানুযায়ী এসব নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে ৩শ’ কি.মি.।

পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় নদীগুলো তার স্বকীয়তা হারিয়েছে। কোনো কোনো জায়গা দেখে বোঝার উপায়ও নেই এখানে একসময় নদী ছিল। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রভাবশালীরা নদীর তীর দখল করে বিভিন্ন ফসল চাষ করছে। দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজ থেকে তিস্তা রেল ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় ১৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীর বুক জুড়ে এখন শুধু ধু-ধু বালু চর। গত দেড় মাস থেকে এ নদীতে নৌ চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়।

এতে নদী চরাঞ্চলের হাজারো জেলের ভাগ্যে নেমে এসেছে চরম দুর্দিন। তিস্তা নদী শুকিয়ে যাওয়ায় এখানকার জেলেদের রুজি-রুটির পথটিও বন্ধ হয়ে গেছে। আদিতমারী উপজেলার মহিষখোঁচা চরের জেলে আকরাম আলী (৬০) জানান, মাছ শিকার করতে না পারায় অনাহারে-অর্ধাহারে তার পরিবারের দিন কাটছে। সংসার চালাতে না পারায় বাধ্য হয়ে বাপ-দাদার পেশা বদল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর বন্যা মৌসুমে অধিক পরিমাণ বালু ও পলি জমায় এবং নদীগুলো খননের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ না করাসহ উজান থেকে পানি না আসায় শুকিয়ে যাচ্ছে এসব নদী। যার প্রভাব পড়েছে এ অঞ্চলের পরিবেশ ও গোটা কৃষি সেক্টরের ওপর।

তিস্তা মরা খালে পরিণত হওয়ায় দীর্ঘ দিন ধরে ইরি-বোরো ধান চাষের সময় সেচ কাজে মারাত্মকভাবে বিঘœ ঘটছে বলে জানালেন এই চরাঞ্চলের কৃষকরা। জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা ব্যারেজ সংলগ্ন এলাকার কৃষক বাবুল মিয়া, আফাজ উদ্দিন, নূরনবীসহ আরো অনেকেই বলেন, ভারতের বিমাতাসূলভ আচরণ ও তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ার কারণে শুষ্ক মৌসুমে ইরি-বোরো চাষ করতে পরে না তারা। স্থানীয় প্রবীণ কৃষকদের অভিযোগ, মূলত ভারত পানি বণ্টন চুক্তি লঙ্ঘন করায় এ জেলার পাঁচ উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদীতে চলতি কৃষি মৌসুমে পানি শুকিয়ে এমন বালু চরে পরিণত হয়েছে। এতে দেশের বৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজ আর কোনো কাজেই আসছে না।

প্রসঙ্গত, ১৯৭৯ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রায় ১৫শ কোটি টাকা ব্যয়ে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার দোয়ানী নামক স্থানে তিস্তা নদীর ওপর নির্মাণ করা হয় দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজ।

সদর উপজেলার রাজপুর এলাকার তিস্তাপাড়ের কৃষক আকবার আলী (৫৫) বলেন, আগে তিস্তা নদীর এমন দৃশ্য দেখেন নাই তিনি। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানি চুক্তিসহ জরুরি ভিত্তিতে পলি অপসারণের দাবিও জানালেন বৃদ্ধপ্রায় এই কৃষক।

নদীগুলোর বিভিন্ন পয়েন্টে গিয়ে স্থানীয় ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব নদীগুলোতে দু’যুগ আগেও ছিল থৈ-থৈ পানি। নদীতে চলাচল করতো পাল তোলা নৌকা। এ এলাকায় ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালিত হতো এই নদীগুলোকে কেন্দ্র করেই। মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত অঞ্চলের হাজার হাজার জেলে। কিন্তু বর্তমানে স্থান ভেদে কোনো কোনো নদীর সমতল ভূমি থেকে গভীরতা মাত্র তিন থেকে চার ফুট।

অবশ্য তিস্তা ব্যারেজ রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ জানিয়েছে, ব্যারেজের ভাটি এলাকায় পানি উজানে (ব্যারাজ সংলগ্ন এলাকায়) ৩শ কিউসেক পানি রয়েছে।

এদিকে স্থানীয় পরিবেশবিদরা আশঙ্কা করছেন, নদীগুলোকে বাঁচাতে শিগগির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে আগামী ২০২৫ সালের আগেই জেলার অধিকাংশ নদী প্রায় সমতল ভূমিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে কথা বললে লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বিভাগীয় কর্মকর্তা (এসডি) প্রকৌশলী আব্দুল আল মামুন জানান, নদীগুলো খনন করা প্রয়োজন। ছোট ছোট শাখা নদীগুলো খননে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে।

অপরদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ড এর তিস্তা ব্যারেজ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ভারতের গজলডোবা ব্যারেজের কারণে তিস্তা নদীর এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ভাটিতে পানি শূন্য হয়ে ধূ-ধূ বালু চর দেখা দিলেও তিস্তার উজানে (ব্যারাজ সংলগ্ন এলাকায়) ৩শ কিউসেক পানি রয়েছে।

এর বেশি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এই প্রকৌশলী।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *