পাথেয় রিপোর্ট : বরাবরের মতো এবারও লেজুরবৃত্তিতেই আগ্রহ ইসলামী দলগুলোর। এখনও পর্যন্ত একমাত্র ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ চরমোনাই পীর পরিচালিত এ দলটি লেজুরবৃত্তিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এর বাইরে প্রত্যেকটি দলই লেজুর বৃত্তির মাধ্যমেই ক্ষমতায় যেতে চান বলে আলাপচারিতায় ওঠে আসে। লেজুরবৃত্তি করতে গিয়ে দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা নিজের ব্যক্তিগত লোভে দলের রাজনীতির দর্শনকেও ভুল ব্যাখ্যা করেছেন। বড় দল হিসেবে জামায়াতও লেজুরবৃত্তিকেই ভরসা মানছে। গত বেশ কটি নির্বাচনে তারা সেটি দেখিয়ে এসেছে। বড় ইসলামী দলগুলো ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পড়ে ভাগ হয়েছে কয়েক টুকরো। টুকরো দলগুলোই আবার বড় দুই জোটে থেকে বাড়িয়েছে দলের বহরও। দুই জোটের বাইরে থাকা দলগুলোও নিজেদের একক সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি প্রায় সময়ই। দলগতভাবে ইসলামী ঘরানার দলগুলো ২০ শতাংশ ভোটের মালিক দাবি করলেও এককভাবে তা কখনোই ফল ঘরে আনার মতো হয় না। তাই বাধ্য হয়েই জোট রাজনীতিই তাদের একমাত্র অবলম্বন হয়ে পড়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নিবন্ধিত ইসলামী দলের সংখ্যা ১৩টি। যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতের নিবন্ধন উচ্চআদালত স্থগিত করে রাখায় আপাতত নির্বাচন করতে পারছে না দলটি। নিবন্ধনের বাইরেও রয়েছে একাধিক ধর্মভিত্তিক দল। নিবন্ধন না থাকলেও ব্যক্তি ইমেজে তারাও প্রভাব বিস্তার করতে চান নির্বাচন এলে। তাই নির্বাচনী রাজনীতিতে কমিশন সনদবিহীন এসব দল মেতে উঠে জোটের ভোটে যোগ দিতে। আসন্ন একাদশ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক জোটগুলোর সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে নানা ধরনের ইস্যু নিয়ে মাঠে কাজ করে যাচ্ছে ইসলামভিত্তিক দলগুলো। রাজনীতির মাঠে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার পাশাপাশি বিভিন্ন জোটে শক্তিশালী অবস্থান তৈরিতে সক্রিয় তারা।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে নবগঠিত সম্মিলিত জাতীয় জোটে যুক্ত হয়েছে বেশ কয়েকটি ইসলামী দল। যদিও সেই ঘোষণার কয়েক মাসের মাথায় এর বাস্তব সফলতা নিয়ে সন্দিহান দলগুলো। এছাড়া আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে যুক্ত হওয়ার জন্য বেশকিছু ইসলামী দল দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে। এগুলোর মধ্যে নিবন্ধনকৃত ইসলামী দল বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্য আন্দোলন ও ফরায়েজী আন্দোলন। এছাড়া নেজামে ইসলামের এক অংশের সভাপতি মুফতি ইজহার ২০ দলে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেও পারেননি। তার বিরুদ্ধে জঙ্গি মদদ দানের অভিযোগ থাকায় বিএনপি তাকে জোটে নেয়নি। এর বাইরে ইসলামী ঐক্যজোটের একটি অংশের নেতারা সরকারের জোটে যোগ দিতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন বলে শোনা য়ায়। ২০ দল থেকে বের হয়ে আবদুল লতিফ নেজামী ও মুফতি ফয়যুল্লাহর ইসলামী ঐক্য জোটের খণ্ডিত অংশ বর্তমানে সরকারের ছত্র ছায়ায় থাকলেও এখনো ১৪ দলীয় জোটে যোগ দেয়নি। তবে শেষ পর্যন্ত তাদের এ অংশটিকে জোটে নেওয়া হবে কিনা এ নিয়েও সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না ১৪ দল।
আওয়ামীলীগের একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, একসময়ে বিশ দলের ছায়াতলে আশ্রিত মাওলানা আবদুল লতীফ নিজামী এবং মুফতি ফয়জুল্লাহর ইসলামী ঐক্যজোটে আস্থাসঙ্কট কাটিয়ে উঠতে পারছে না আওয়ামীলীগ। ভোটের রাজনীতিতে ঐক্যজোটের ভালো অবস্থান নেই সেটাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজনীতি করা ইসলামপন্থী দলগুলোর নেতারা দাবি করেন, সারা দেশে তাদের ২০ শতাংশ ভোট আছে। তবে কোনো নির্বাচনেই দলগুলোর প্রাপ্ত সম্মিলিত ভোট ১৪ শতাংশের বেশি ছিল না। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তাদের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৬ দশমিক ১৫ শতাংশ বা প্রায় ৪৪ লাখ। তাই বড় দুই জোটে থাকা দলগুলো আসন ভাগাভাগির হিসাব কষছে। এর বাইরে থাকা কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দল পৃথক মোর্চা গঠনের চেষ্টা করছে। ক্ষমতাসীন জোটের সঙ্গে সমঝোতা করতে চায় মোর্চার উদ্যোক্তা ছাড়াও আরো অন্তত তিনটি দল। তাদের সবার লক্ষ্য, আগামী নির্বাচনে জোটের মনোনয়ন। অনিবন্ধিত জামায়াত ছাড়াও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলে রয়েছে কওমি মাদরাসা ঘরানার জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও খেলাফত মজলিস। মুসলিম লীগের একাংশও রয়েছে ২০ দলে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটে রয়েছে সুফি ঘরানার তরীকত ফেডারেশন। জাপা জোটের শরিক ইসলামী ফ্রন্ট। জামায়াতের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মভিত্তিক দল হিসেবে পরিচিত চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন কোনো জোটে নেই। হেফাজতসংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও খেলাফত আন্দোলনও জোটবিহীন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ছাড়ার পর তাদের নিয়ে পৃথক মোর্চা গঠনের চেষ্টা করছে ইসলামী ঐক্যজোট। আরো তিন ইসলামপন্থী দল জাকের পার্টি, ইসলামিক ফ্রন্ট ও মুসলিম লীগের অপরাংশও কোনো জোটে নেই। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ৪৩ আসনে প্রার্থিতা চূড়ান্ত করেছিল জামায়াত। এবার তাদের চাওয়া অন্তত ৫০ আসন। এরই মধ্যে দলটি ভোটের প্রস্তুতি শুরু করেছে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে না থাকলেও ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করেছিল ইসলামী আন্দোলন। দলটি এবার এককভাবে ভোটে অংশ নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সারা দেশে প্রায় ১ শতাংশ ভোট পাওয়া দলটির মহাসচিব অধ্যক্ষ ইউনুস আহমাদ জানিয়েছেন, তারা কোনো জোটে যাবেন না। সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হলে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস আগামী নির্বাচনে ২০০ আসনে প্রার্থী দেবে। দলের নির্বাহী কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। জানতে চাইলে সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, অন্য দলগুলোর নীতির সঙ্গে আমাদের নীতির মিল না হওয়ায় জোট গঠন হয়নি। ইসলামী ঐক্যজোট আগামীতে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে বলে জানায়। দলটির সহকারী মহাসচিব মাওলানা আলতাফ হোসাইন বলেন, ইসলামী ঐক্যজোট নিজস্ব প্রতীকে এককভাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরই মধ্যে ২৭২টি আসনের প্রার্থী বাছাই সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেন, বৃহত্তর স্বার্থে জাতীয় নির্বাচনের আগে দলগুলো চাইলে জোট হতেও পারে।
গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তরীকতকে দুইটি আসন ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ। দুইটি আসনে জয়ী এ দলটির সাবেক মহাসচিব এম এ আউয়াল এমপি জানিয়েছেন, এবার তাদের লক্ষ্য ১০টি আসনে নির্বাচন। এগুলোতে তারা মহাজোটের মনোনয়ন চান। মাওলানা মুহম্মদ ইসহাকের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিস বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট থেকেই অংশ নেবে। খেলাফত মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের জানিয়েছেন, তারা তালিকা দেবেন বিএনপিকে। অন্তত পাঁচটি আসনে জয়ী হওয়া তাদের লক্ষ্য।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সম্প্রতি ভেঙে গেছে। দুই অংশই বিএনপির শরিক। শায়খ আবদুল মোবিনের নেতৃত্বাধীন অংশ জোটের কাছে অন্তত পাঁচটি আসন চায়। এর বাইরে বিএনপি জোটের সঙ্গে থাকা ইসলামী ঐক্যজোট অন্তত ২০টি আসনে নির্বাচন করতে চায়। এর মধ্যে দলের চেয়ারম্যান সিলেট-৬, মহাসচিব ভোলা-২ এবং সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচন করতে চান সুনামগঞ্জ-৩ থেকে। এর বাইরে মুসলিম লীগ এক অংশের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান কিশোরগঞ্জ-৫ আসন থেকে নির্বাচন করতে চান। তবে এ আসন থেকে তিনি আগে একবার এমপি হলেও এবার মনোনয়ন না পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ বিএনপির তরুণ ব্যবসায়ী ও তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ নেতা সফিকুল আলম রাজনের মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত এ আসনে। যদিও তিনি বলেন, জোটের কারণেই এ আসনে নির্বাচন করতে চান।
– pathe0/106/sb


