পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : সরকার নগরায়ন ও স্থানীয় উন্নয়ন ব্যবস্থাকে আরো সুশৃঙ্খল ও টেকসই করার জন্য কৌশলগত পরিকল্পনা ও বিস্তারিত এলাকা পরিকল্পনা বা ড্যাপ প্রণয়ন ও কার্যকর করতে যাচ্ছে। রাজউকের সংস্কারের অংশ হিসেবে তৈরি নতুন আইনের ধারা ৪৫-৫২ অনুযায়ী এসব পরিকল্পনা শহরের স্থায়ী উন্নয়ন, জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করবে। ১৯৫৩ সালের রাজউক আইন প্রতিস্থাপন করতে নতুন আইনের খসড়া চূড়ান্ত করে আনা হয়েছে। গত শুক্রবার খসড়া চূড়ান্ত করতে উচ্চ পর্যায়ের এক সভা অনুষ্ঠানের পর আগামী শুক্রবার পরবর্তী সভা অনুষ্ঠানের সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ দিকে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ এক সূত্র থেকে জানা গেছে, নতুন রাজউক অধ্যাদেশ কার্যকর করার জন্য ড্যাপের যে সংশোধনের প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে তার বাস্তবায়ন আটকে রাখা হবে না। রাজউক অধ্যাদেশ উপদেষ্টা পরিষদে চূড়ান্ত অনুমোাদন পেতে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লেগে গেলেও ড্যাপের সংশোধন প্রস্তাব আক্টোবরের প্রথমইে চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই সংশোধন প্রস্তাবে এলাকা ভেদে ভবন নির্মাণের সুবিধাকে যুক্তিসঙ্গতকরণের কথা বলা হয়েছে।
জানা গেছে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ব্যাপক পরিবর্তন এনে আইনটি শুধু বাংলায় তৈরি করা হচ্ছে না, একই সাথে এতে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু বিষয়ে নতুন সংযোজন ও পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন আইনে কৌশলগত পরিকল্পনার মূল দিকের মধ্যে রয়েছে- নগর ও এলাকার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নীতিনির্ধারণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধির পূর্বাভাস, আবাসন ব্যবস্থাপনা এবং সংরক্ষিত ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ। এর মধ্যে আরো রয়েছে- জলাশয়, নদী ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, যোগাযোগ অবকাঠামো, পরিবেশ ও জলবায়ু রক্ষা এবং আধুনিক, স্মার্ট ও টেকসই নগরী নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য দিক।
রাজউক সূত্র মতে, রাজউক পরিচালিত এলাকার নগরায়ন ও ইমারত নির্মাণে দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা, দুর্বল তদারকি ও সমন্বয়ের ঘাটতি কাটাতে সরকার ‘রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, ২০২৫’ প্রণয়ন করেছে। আইনটি কেবল রাজউকের ক্ষমতা বাড়ায়নি, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কৌশলগত পরিকল্পনা, বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা, ভূমি পুনর্বিন্যাস, উন্নয়নস্বত্ব বিনিময় (টিডিআর) ও জলাধার সংরক্ষণে কড়াকড়িও প্রবর্তন করছে।
প্রস্তাবিত আইনের নতুন ধারায় কৌশলগত পরিকল্পনা (ধারা ৪৫) বিস্তৃতভাবে থাকছে। এতে ভূমি ব্যবহার, আবাসিক-বাণিজ্যিক অঞ্চল, জলাশয়, পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষা, দুর্যোগ ঝুঁকি, ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা প্রক্ষেপণ, স্মার্ট সিটি- সব বিষয় নিয়ে ২০-২৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকবে। গেজেটে প্রাকপ্রকাশ, গণশুনানি ও ৬০ দিনের মধ্যে আপত্তি জানানোর সুযোগ থাকবে।
অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রিত এলাকা (ধারা ৪৬-৪৭) প্রশ্নে অনুমোদিত পরিকল্পনা প্রকাশের পর সরকারি-বেসরকারি সব প্রকল্পকে পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতে হবে। প্রয়োজনে কোনো এলাকা ‘নিয়ন্ত্রিত এলাকা’ ঘোষণা করে অনুমতি ছাড়া ইমারত নির্মাণ বা সংস্কারে বিধিনিষেধ আরোপ করা যাবে; অপরিকল্পিত স্থাপনা অপসারণের ক্ষমতাও থাকবে।
পরিকল্পনার সংশোধন (ধারা ৪৮-৪৯) প্রশ্নে প্রযুক্তিগত যাচাই, জনমত গ্রহণ ও সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে পরিকল্পনার আংশিক বা পূর্ণ সংশোধন সম্ভব হবে। সংরক্ষিত এলাকা ও উন্নয়নস্বত্ব বিনিময় (ধারা ৫০-৫১) ক্ষেত্রে প্রস্তাব অনুসারে ভবিষ্যৎ প্রকল্পের জন্য জমি সরাসরি অধিগ্রহণ না করে নোটিশ ও শুনানি শেষে সংরক্ষিত ঘোষণা করা যাবে। জমির মালিক ক্ষতিপূরণের পরিবর্তে উন্নয়নস্বত্ব (পিডিআর) নিতে পারবেন, যা অন্য এলাকায় হস্তান্তরযোগ্য।
বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান-ধারা ৫২) প্রসঙ্গে কৌশলগত পরিকল্পনার ভিত্তিতে মৌজা-ভিত্তিক বিস্তারিত ভূমি ও ব্যবহার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। জনঘনত্ব, ইমারতের উচ্চতা, ঐতিহাসিক স্থাপনা, সবুজ এলাকা সংরক্ষণ ইত্যাদি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ হবে।
ভূমি পুনর্বিন্যাস (ধারা ৫৩) প্রশ্নে ন্যূনতম ৬০% জমির মালিকের সম্মতিতে পুনর্বিন্যাস প্রকল্প নেয়া যাবে, যেখানে রাস্তা, পার্ক, স্কুল ইত্যাদির জন্য নির্দিষ্ট অংশ রেখে বাকি জমি নতুন প্লটে ভাগ করে দেয়া হবে। জলাধার ও ইমারত নির্মাণে কড়াকড়ির (ধারা ৫৪) বিধানে বলা হয়েছে- অনুমোদন ছাড়া কোনো নির্মাণ, খনন, পুনঃ খনন বা নিচু জমি ভরাট নিষিদ্ধ। সরকার কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের ‘অথরাইজড অফিসার’ হিসেবে ঘোষণা করবে, যারা এসব কাজের অনুমতি দেবেন। স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো কাজ বেআইনি ও অকার্যকর গণ্য হবে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও বিদেশী মডেলকে নতুন আইনে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ভারতে মুম্বাই, পুনে ও ব্যাঙ্গালুরুতে উন্নয়নস্বত্ব (টিডিআর) ব্যবস্থার মাধ্যমে রাস্তা, পার্ক, ফ্লাইওভার ইত্যাদির জন্য জমি নেয়া হলেও মালিককে বাজারদর অনুসারে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়নি। এতে মালিক নির্দিষ্ট হারে টিডিআরের বিপরীতে সুদ বা মুনাফা লাভ করে।
সিঙ্গাপুরে সিটি প্ল্যানিং অ্যাক্টে গণশুনানি বাধ্যতামূলক; প্রতি ১০ বছরে সেখানে মাস্টার প্ল্যান রিভিউ হয়। লন্ডনে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ডেভেলপমেন্ট কন্ট্রোলের মাধ্যমে প্রতি বছর পরিকল্পনা হালনাগাদ করে; খোলামেলা ওয়েব-পোর্টালে সব অনুমোদন দেখা যায়। মালয়েশিয়ায় আবাসিক এলাকা ও জলাশয় রক্ষায় স্ট্রাকচার প্ল্যান ও ডিটেইল্ড লোকাল প্ল্যান বাধ্যতামূলক।
তুলনীয় এসব দেশের বিবেচনায় বাংলাদেশে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে- বাস্তবায়ন সক্ষমতার বিষয়টি। রাজউকের প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদ, আইনি কর্মকর্তা- সব ক্ষেত্রেই জনবল ঘাটতি রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের চাপ বা ভিআইপি প্লট বরাদ্দের সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে আইন কার্যকর হবে না।
ডেটাবেজ ঘাটতিও একটি সমস্যা। সঠিক ও আপডেটেড জমির রেকর্ড ও মালিকানা তথ্য ছাড়া বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা করা কঠিন। এর বাইরে রয়েছে সমন্বয়হীনতা। স্থানীয় সরকার, ওয়াসা, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদফতর- সব সংস্থার সমন্বয় দরকার। বাংলাদেশে জনসচেতনতা ও স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে নেয়া গণশুনানির প্রক্রিয়া অনেক সময় প্রহসনে পরিণত হয়। আর এটি হলে জনআস্থা তৈরি হবে না।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কিছু নীতিগত সুপারিশ বিবেচিত হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে রাজউককে স্বতন্ত্র পরিকল্পনা কমিশনের মতো একটি শক্তিশালী টেকনিক্যাল ইউনিট গঠন; সব অনুমোদন ও পরিকল্পনার অগ্রগতি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ; গণশুনানিকে বাধ্যতামূলক ও কার্যকর রাখতে স্বাধীন তদারকি কমিটি থাকা; রাজউক, স্থানীয় সরকার, পরিবেশ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যে ইন্টিগ্রেটেড প্ল্যাটফর্ম চালু করা এবং প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক সংস্থা (ইউএন-হাবিতাত, বিশ^ ব্যাংক ইত্যাদি)-র সহায়তা নেয়ার কথা বলা হয়েছে।
নতুন অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. ফারুকুল ইসলাম মনে করেন, ‘নতুন আইনে আন্তর্জাতিক ভালো প্র্যাকটিস অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ভবিষ্যতের ঢাকা ও আশপাশের নগরীগুলো পরিকল্পিত হবে। তবে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শীর্ষ কর্মকর্তার মতে, প্রস্তাবিত রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, ২০২৫ শুধু একটি আইন নয়; এটি পরিকল্পিত নগরায়নের একটি কাঠামো। তবে আইনের ধারা থাকলেই হবে না- রাজউক, স্থানীয় সরকার, নাগরিক সমাজ ও বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এর সফলতা আসবে না।


