শান্তি ও সমতা প্রতিষ্ঠা করলে তালেবান সফল : আরশাদ মাদানী

শান্তি ও সমতা প্রতিষ্ঠা করলে তালেবান সফল : আরশাদ মাদানী

• তালেবানের সাথে দেওবন্দের মৌলিক কোনো সম্পর্ক নেই
• তালেবানের সাফল্য-ব্যার্থতা সম্পর্কে ভবিষ্যতই কথা বলবে

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : আফগানিস্তানে শান্তি ও সমতা প্রতিষ্ঠা করা হলে তালেবানের এ লড়াই সফল হবে বলে মন্তব্য করেছেন আমীরুল হিন্দ, দারুল উলুম দেওবন্দের সদরুল মুদাররিসিন ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি, হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ আরশাদ মাদানী।

সম্প্রতি তালেবান প্রসঙ্গে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাতকারে এসব কথা বলেন তিনি।

‘কিছু লোক তালেবানকে দেওবন্দের সাথে সম্পৃক্ত করছে’ – এমন প্রশ্নের উত্তরে দেওবন্দের শিক্ষাপ্রধান আল্লামা আরশাদ মাদানী বলেন, মূলত বিষয়টি এমন নয়। কিছু লোক মনে করে এরা দেওবন্দের ছাত্র, বাস্তবে তা নয়। ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পূর্বে আফগানী অনেকে দেওবন্দে পড়াশোনা করেছেন বটে, কিন্তু তাদের কেউই তো আর জীবিত নেই।  

তালেবান ও আফগানিস্তানের সাথে দেওবন্দের সম্পর্কের বিষয়টি স্পষ্ট করতে গিয়ে তিনি বলেন, আমাদের নেতা শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের অংশ হিসেবে, রাজা প্রতাপ সিংকে প্রধান করে আফগানিস্তানের মাটিতে স্বাধীন ভারতের প্রবাসী সরকার গঠন করেছিলেন। এতে মাওলানা বরকতুল্লাহ ভূপালীকে প্রধানমন্ত্রী এবং মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধীকে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত করেন।

বর্তমানে যারা তালেবান হিসেবে পরিচিত, এরা হচ্ছে সেসময় শাইখুল হিন্দের সাথে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে যে আফগানীরা যোগ দিয়েছিলেন, তাদের বংশধর। এরা শাইখুল হিন্দের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছে। তিনি যেভাবে স্বাধীনতার জন্য কাজ করেছেন, নিজের জান কুরবান করেছেন, ছাত্রদের নিয়ে মুক্তিকামী ফৌজ তৈরী করে দেশকে স্বাধীন করেছেন, যেহেতু তারাও মাতৃভূমিকে দখলদার মুক্ত করতে চেয়েছে, তাই শাইখুল হিন্দের দেখানো পথে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেরণা গ্রহণ করেছে। ব্যস, বিষয়টি কেবল এইটুকুই।

আল্লামা আরশাদ মাদানী বলেন, কিছু লোক বলে আমরা নাকি তালেবানকে সমর্থন দিয়েছি, এটাও গলদ কথা। সেখানকার কোনো দল সম্পর্কেই তো আমাদের কোনো মতামত বা অবস্থান নেই! এটা ভবিষ্যতই বলবে যে, তালেবান তাদের দেশে কী করছে বা কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে।

সফলভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে তালেবানকে দুটি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে উল্লেখ করে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি বলেন, যেকোন সরকারের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনায় দুটো মৌলিক নীতি রয়েছে।

১. জনগণের মাঝে পরস্পরে ভালোবাসার বন্ধন তৈরী করা

নিজেদের মাঝে শত্রুতা সৃষ্টি করা, এটা কোন ভালো কাজ নয়। সব শ্রেণীপেশার মানুষদের মাঝে, দলমত নির্বিশেষে ভালোবাসা ও সম্প্রীতি তৈরী করতে হবে। 

২. সকল নাগরিকদের মাঝে সমতা বিধান নিশ্চিত করা

আফগানিস্তানে নানা ধর্মের সংখ্যালঘু অধিবাসী রয়েছে। এছাড়াও একাধিক নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর আবাস এখানে। তালেবানরা পশতুভাষী হলেও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ফার্সীভাষী জনগোষ্ঠী রয়েছে। এই সকল সংখ্যালঘু আর সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদেরকে এক কাতারে রাখতে হবে। কারও নাগরিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করা যাবে না। জীবনধারণের ক্ষেত্রে, শিক্ষাঙ্গনে, নাগরিক সুবিধাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে সমতা বিধান নিশ্চিত করতে হবে, কোনরূপ বৈষম্য করা যাবে না।

এসব সামনে রেখে তালেবান যদি ভবিষ্যতে আফগানিস্তানে শান্তি ও সম্প্রীতি, ভালোবাসা ও সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে, নিজ ধর্ম বা গোত্রের লোক হোক কিংবা সংখ্যালঘু – সকল নাগরিকের প্রতি যদি ইনসাফ বজায় রাখতে পারে, সকল নাগরিকের জান ও মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, তবে আমরা সাধুবাদ জানাবো। আর যদি তা না পারে, তবে আমরাও তাদের প্রশংসা করবো না, দুনিয়ার কেউই তাদের প্রশংসা করবে না। 

আফগান জাতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে আমীরুল হিন্দ আল্লামা আরশাদ মাদানী বলেন, আফগানীরা এমন এক জাতি, যারা অন্যের আধিপত্য কখনই মেনে নিতে পারেনি, আজও মেনে নেয়নি। ঐতিহাসিকভাবেই এটা তারা পেয়ে এসেছে। শায়খুল হিন্দের সাথে তাদের যোগসূত্রও এখানেই। শায়খুল হিন্দের ইন্তেকালের পর আফগানিস্তানে অনুষ্ঠিত এক স্মরণসভায় তৎকালীন বাদশা (আমীর আমানুল্লাহ) ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘যে কাজ শাইখুল হিন্দ শেষ করে যেতে পারেননি, সেই কাজ আমি সমাপ্ত করবো।’ আজ এর ফলাফল আমরা দেখতে পাচ্ছি। 

শান্তি-সম্প্রীতি, ভালোবাসা ও সমতা প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করে আমীরুল হিন্দ সাইয়্যিদ আরশাদ মাদানী বলেন, বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে তালেবান ব্যার্থ হলে একসময় জনগনের মধ্য থেকেই নতুন করে আবার একদল উঠে দাঁড়াবে। 

অনুবাদ: আব্দুর রহমান রাশেদ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *