শিশুদের নিরাপদ ইন্টারনেট নিশ্চিতে উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার

শিশুদের নিরাপদ ইন্টারনেট নিশ্চিতে উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার

দেশ ভাবনা । মো. সিরাজুল হক

শিশুদের নিরাপদ ইন্টারনেট নিশ্চিতে উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার

করোনা মহামারির পর থেকে ইন্টারনেট ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে বিশেষ করে শিশুদের। স্কুল কলেজ বন্ধ থাকায় অনলাইনে লেখাপড়া, বিনোদনসহ নানা কাজে শিশুরা ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। ইন্টারনেট এখন মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীবনের গতি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে ইন্টারনেট। তবে ইন্টারনেটে শিশুরা নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে। ফলে শিশুদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট এখন সময়ের দাবি। নিরাপদ ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে হলে পাঠ্যপুস্তকে নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং অভিভাবকদের সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।

দেশের ৬৫ হাজার ৬২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক কোটি ৪০ লাখ শিশু পাঠ গ্রহণ করছে। ১৭ মার্চ থেকে করোনা ভাইরাস মহামারীর কারণে স্কুল বন্ধ হওয়ার পর প্রথম সংসদ টেলিভিশন অনলাইন পাঠদান শুরু করে। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের স্মার্ট ফোনের মাধ্যমে অনলাইনে পাঠদান শুরু হয়। জেলা, উপজেলা পর্যায়েও শিক্ষকগণ ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুকের মাধ্যমে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

দীর্ঘস্থায়ী করোনা পরিস্থিতি কারণে দেশের বিপুল সংখ্যক শিশুদের পড়ালেখার বাইরে রাখা সম্ভব নয়। তাই ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়াতেই হবে। সে ক্ষেত্রে শিশুদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে একটা নীতিমালা থাকা দরকার। ২০২২ সাল থেকে প্রাথমিকের নতুন কারিকুলাম শুরু হবে। সেখানে শিশুদের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার নিরাপদ করার বিষয়টি যুক্ত করার বিষয়ে আইসিটি মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করছে।
ইন্টারনেটের বদৌলতে পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয়। তবে এর অপব্যবহারের কারণে অনলাইনে ভুল তথ্য প্রচার আর সাইবার বুলিং বেড়েছে কয়েকগুণ। বেশ ক’বছর ধরে কিশোরীরা অনলাইনে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। করোনার সময়ে বিশ্বব্যাপী শিশুর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্য বেড়েছে বিশেষ করে কন্যাশিশুদের প্রতি সহিংসতার মাত্রা বেড়েছে বহুগুণ। তাদের সুরক্ষা বেশি জরুরি। শিশুদের সহিংসতা ও বৈষম্য কমিয়ে আনা শিক্ষার একটি বড় উদ্দেশ্য। শিক্ষা বলতে কেবল আনুষ্ঠানিক শিক্ষাই বোঝায় না। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র থেকেও শিশুরা অনেক কিছুই শেখে। তাই সাইবার অপরাধ সম্পর্কে সচেতনতা তাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে। শিশুদের ক্ষতিকর কাজে যুক্ত হওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে। দেশের বিশাল এই শিশুগোষ্ঠীর সাইবার সুরক্ষার বিষয়টি অবহেলা করলে চলবে না। প্রযুক্তির প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটছে সারা বিশ্বে। প্রতিনিয়ত এর হালনাগাদ সংস্করণ মানুষের হাতে আসছে। এসব প্রযুক্তির ক্ষতিকর দিকটিও তাই নিত্যনতুন। ব্যবহারকারীদের তা জানতে হবে। ইন্টারনেট তথা সাইবার বুলিং থেকে শিশুদের রক্ষা করতে হলে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে অভিভাবকদের সচেতন করতে হবে। আমাদের দেশে শিশুদের একটা অংশ প্রতিবন্ধী। এ বিষয়ে শিক্ষক, অভিভাবকসহ শিক্ষাসংশ্নিষ্ট সবাইকে সচেতন হতে হবে। কারণ একজন স্বাভাবিক শিশুর চেয়ে একজন প্রতিবন্ধী শিশুর প্রযুক্তির সহায়তা বেশি প্রয়োজন।

করোনাকালীন পড়াশোনা এবং বিনোদনের জন্য শিশু-কিশোরদের কাছে ইন্টারনেট অত্যাবশ্যকীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ইন্টারনেটের নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে তাদের বেশিরভাগের ধারণা নেই। ফলে অনলাইনে তারা নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহার অনস্বীকার্য, তবে এর অপব্যহার অনেক সময় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক বেশি সময় ইন্টারনেটে থাকলে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, নেতিবাচক দিক বেশি বিকশিত হয়। ফলে শিশুর মানসিক উন্মেষও বাধাগ্রস্ত হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার করে শিশুর মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। অনেক অভিভাবক না বুঝে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকের শিশুদের হাতে স্মার্টফোন ফোন তুলে দিচ্ছেন। বেশি মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে এর রেডিয়েশনে শিশুর মস্তিস্কের ভীষণ ক্ষতি করে।

চলমান বৈশ্বিক মহামারি পরিস্থিতির কারণে শিশুদের বাধ্য হয়েই শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হচ্ছে। এই বাস্তবতায় যেসব কিশোর-কিশোরী মূলধারার শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে রয়েছে তাদের জন্য অনলাইন সেফটি প্রজেক্ট ও প্রশিক্ষণের পরিধি বাড়াতে ইউনিসেফের সাথে যৌথভাবে কাজ করছে গ্রামীণফোন। ইউনিসেফের অ্যাডোলেসেন্ট ক্লাব প্রোগ্রামের মাধ্যমে এ প্রকল্পের সহায়তায় ৯০ হাজার কিশোর-কিশোরীর মাঝে সচেতনতা বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

২০০৯ সালে দেশে আইসিটি পলিসি তৈরি হয়। আইসিটি শিক্ষায় অনেক এগিয়েছে দেশ। অনলাইন যৌন নির্যাতনের মতো ভয়াবহ দিকগুলো মাথায় রেখে শিশুদের নিরাপদ করতে কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তকে সেগুলো আনতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের জন্য প্রণীত টিচার্স গাইড ম্যানুয়েলেও তা রাখতে হবে। সমকাল এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর যৌথ উদ্যোগের আয়োজিত শিশুদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারে প্রতিবন্ধকতা উত্তরণে করণীয় শীর্ষক আলোচনায় দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বিশেষজ্ঞগণ এ বিষয়ে মত দেন।

গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরীদের জন্য ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ সরকার বিশেষায়িত প্রকল্পভিত্তিক নানা কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এ প্রকল্পগুলোর লক্ষ্য হলো, তরুণদের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে তাদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো। বর্তমান পরিস্থিতিতে সারা দেশের ১৬শ’ ক্লাবের কিশোর-কিশোরীদের মাঝে অ্যাপ্লিকেশন বেজড অনলাইন প্রশিক্ষণ পরিচালনা করা হচ্ছে। সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি শিশুদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট নিয়ে বোঝাপড়া বৃদ্ধিতে এবং বাবা-মা, অভিভাবক ও শিক্ষকদের জানাশোনা বাড়াতে ২০১৪ সাল থেকে গ্রামীণফোন দেশজুড়ে স্কুলগুলোতে আউটরিচ প্রোগাম আয়োজন করে আসছে। ২০২০ সালের মধ্যে সারাদেশে ৬ লাখ বাবা-মা এবং ১২ লাখ শিক্ষার্থীর কাছে নিরাপদ ইন্টারনেট পৌঁছানোর লক্ষ্যে ইউনিসেফের সাথে যৌথভাবে কাজ করছে সরকার।

শিশুসহ বয়স্করাও এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করছে বেশি। ডিজিটাল বিশ্বে তারা কীভাবে নিরাপদে ও সুরক্ষিত উপায়ে বিচরণ করবে এ নিয়ে তাদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়াতে তাদের সহায়তা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইনে নিরাপত্তা নিয়ে বাবা-মা, শিশু, কিশোর-কিশোরী, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনা হওয়াও জরুরি। এখানে মূলধারার শিক্ষা ও এর বাইরে যেসব শিক্ষার্থী রয়েছে তাদেরকে যুক্ত করতে হবে। ইন্টারনেটে নিরাপদ ও সুরক্ষিতভাবে অভিজ্ঞতা পেতে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের অনলাইন সেফটি নিয়ে প্রশিক্ষণ সহায়তা দেবে ‘চাইল্ড অনলাইন সেফটি প্রজেক্ট’।

অনলাইন বিষয়ক ক্রমবর্ধমান সমস্যা ও ধারা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ২০০৪ সাল থেকে প্রতি বছর ১১ ফেব্রুয়ারি নিরাপদ ইন্টারনেট দিবস পালিত হচ্ছে। ‘নিরাপদ ইন্টারনেট দিবস: ভালো ইন্টারনেটের জন্য একত্র হই’ শীর্ষক এবারের আয়োজনে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেছেন, ‘এক বছরের মধ্যে আমরা ১০ লাখ স্কুলগামী শিশুদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের সনদ প্রদানের মাধ্যমে ইতিহাস তৈরি করবো এবং অনলাইন ঝুঁকির বিরুদ্ধে আমাদের শিশুদের অতি প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রগতি সাধন করব।’ সরকারের এ উদ্যোগ শিশুদের অনলাইন অভিজ্ঞতাকেই নিরাপদ করবে না, দেশকেও নিয়ে যাবে একটি অনন্য রেকর্ডের দ্বারপ্রান্তে। ক্রমবর্ধমান নেট-সংযুক্ত বিশ্বে এদেশের শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা অনলাইনে যেসব ঝুঁকি ও বিপদের মুখোমুখি হয় তা কমিয়ে আনতে ইউনিসেফের সহায়তায় সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আইসিটি বিভাগ এই কার্যক্রম শুরু করছে।

বাংলাদেশে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১,২৮১ জন শিশুর ওপর জরিপ করে দেখা যায়, প্রায় ২৫ শতাংশ শিশু তাদের বয়স ১১ বছর হওয়ার আগেই ডিজিটাল বিশ্বে প্রবেশ করে। এসব শিশুরা অধিক মাত্রায় সাইবার নিপীড়নের ঝুঁকিতে থাকে, তবে সার্বিকভাবে সব শিশুরাই ক্ষতিকর কনটেন্ট, যৌন হয়রানি এবং সাইবার নিপীড়ন ঝুঁকিতে রয়েছে। সরকারের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার সংক্রান্ত উদ্যোগ বাংলাদেশের শিশুদের অনলাইনে নিরাপদে থাকার জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে সহায়তা করবে।

প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব, সেই সাথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশও। মহামারীর এ সময়েও দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে। বর্তমানে মোট ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ কোটি ১১ লাখে। আর মোবাইল গ্রাহক সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটি ৭১ লাখ ৯ হাজার। বিটিআরসি’র প্রকাশিত সর্বশেষ সেপ্টেম্বর ২০২০ জরিপে এ তথ্য জানা যায়। করোনাকালে ইন্টারনেটের মাধ্যমে শিশুদের পাঠদান চলছে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের মায়েদের কাছে উপবৃত্তির টাকা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। এসবই সম্ভব হচ্ছে প্রযুক্তির কল্যাণে। তাই পযুক্তিকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। দরকার প্রযুক্তির ভালো দিকটা অনুসরণ করা এবং ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতনতা হওয়া।

লেখক : কলামিস্ট

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *