শিশুর বিকাশে চাই পুষ্টিকর খাবার

শিশুর বিকাশে চাই পুষ্টিকর খাবার

সেলিনা আক্তার : আজকের শিশু আগামী দিনের পরিণত মানুষ। আগামীতে বিশ্ব পরিচালনায় নেতৃত্ব দেবে। সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। প্রকৃতপক্ষে তারা রাষ্ট্রের সম্পদ। শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ। শিশুর সুষ্ঠু বিকাশ নিশ্চিত হলে রাষ্ট্র ও জাতির ওপর তার প্রত্যক্ষ ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই এ অমূল্য সম্পদ রক্ষা করে তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার বিষয়টি জরুরি।

শিশুর সুস্বাস্থ্য গঠনে পুষ্টিকর খাবারের গুরুত্ব অনেক। শিশুকে উন্নত ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে রাখতে হবে। তবেই শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সুষ্ঠু হবে। শিশুর স্বাস্থ্য বিকাশের অনুকূল পরিবেশ চাইলে মায়েদের কথাও ভাবতে হবে। মা যদি সুস্থ থাকে ও পুষ্টিসম্পন্ন খাবার গ্রহণ করে তাহলে মায়ের গর্ভে থাকা শিশুটিও ভালো থাকবে। সুস্থ মা-ই পারে একটি সুস্থ জাতি উপহার দিতে।

‘পুষ্টিহীনতা’ কিংবা ‘অপুষ্টি’ শব্দগুলোর সাথে আমাদের সবাই কমবেশি পরিচিত। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অগণিত শিশু, বৃদ্ধ, যুবকরা অপুষ্টিতে ভুগছে। আমরা এর ব্যতিক্রম নই। ‘পুষ্টি’ শব্দটি খুব শোনা গেলেও আমরা এর সঠিক সংজ্ঞা খুঁজি না। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে শরীরে খাদ্য শোষিত হয়ে তাপ ও শক্তি উৎপন্ন হয়। ফলে শরীরে বৃদ্ধি ঘটে। সর্বোপরি, উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে পুষ্টি শোষণ হলেই দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়।

পুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে চাইলে অপুষ্টি বিষয়েও জানতে হবে। আমরা বিভিন্ন ধরনের খাবার গ্রহণ করে থাকি। তবে সব কিছুরই একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ আছে, যেটুকু গ্রহণে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিংবা কম খাবার গ্রহণ করলে দেহে যে তারতম্য ঘটে তাকেই অপুষ্টি বলে। অপুষ্টি কেবল শারীরিক কিংবা পারিবারিক সমস্যা নয়, এটি সামাজিক এমনকি অর্থনৈতিক সমস্যাও তৈরি করতে পারে। আবার অপর্যাপ্ত খাদ্য গ্রহণ কিংবা ঘন ঘন অসুখ হলে কম পুষ্টিজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাবার গ্রহণ এবং সাথে সাথে শারীরিক পরিশ্রম না করলে পুষ্টির বাড়তি কিংবা অতিপুষ্টিও হতে পারে।

একটি শিশুর জন্মের সময় সাধারণত ওজন ৩ থেকে ৩.৫ কেজি থাকে এবং উচ্চতা থাকে ৪৯ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার। যদি ঠিকমতো শিশুকে পুষ্টিকর খাবার দেওয়া যায় তাহলে ৫ মাস বয়সে ওজন দ্বিগুণ হয় এবং এক বছরে ওজন হয় তিনগুণ। এই হিসেবে ৫ মাস বয়সে একটি শিশুর ওজন হওয়া উচিত ৫ থেকে ৭ কেজি এবং এক বছরে ৯ থেকে ১০ কেজি। সেই সাথে উচ্চতা হবে ৫ মাসে ৬৫ থেকে ৬৭ সেন্টিমিটার এবং ১২ মাস বয়সে ৭৪ থেকে ৭৬ সেন্টিমিটার। শিশুর প্রথম ৬ মাসে কেবল মায়ের দুধই তার জন্য একমাত্র পুষ্টিকর খাবার। ৭ মাস বয়স থেকে শিশুকে ফলের রস, সবজি, প্রোটিন ও ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার, ডিমের কসুম এবং ভাত, ডাল, সবজি ও তেল। এই খাবারগুলো নরম করে শিশুকে তার উপযোগী করে খাওয়াতে হবে।

পুষ্টিহীনতায় ভুগছে এমন শিশুদের দেখলেই বুঝা যায়। কারণ এসব শিশুদের পরিপূর্ণ শারীরিক বিকাশ হয় না। এরা বয়সের তুলনায় খাটো ও কম ওজনবিশিষ্ট এবং পর্যাপ্ত উচ্চতা থাকলেও কম ওজনবিশিষ্ট হয়ে থাকে। অপুষ্টির শিকার হলে অনেকগুলো লক্ষণই প্রতীয়মান হয়- দুর্বল ও চুপচাপ থাকা, রোগা, ঘাড় ও পাজরের হাঁড় স্পষ্ট চোখে পড়া, কুচকানো চামড়া, রগচটা ও খিটমিটে মেজাজ, হাত-পায়ে পানি আসা, ক্ষুধামান্দ্য রোগ ইত্যাদি।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশু পুষ্টিহীনতায় ভোগে। এদের বেশির ভাগেরই প্রোটিন ও ক্যালরির ঘাটতি রয়েছে। এদের প্রায় ৩৫ শতাংশ খাটো, ৩৩ শতাংশ কম ওজনবিশিষ্ট এবং প্রায় ১৫ শতাংশ রোগা-পাতলা গড়নের।

মাতৃগর্ভ থেকে কিংবা জন্মের পর সঠিক খাবার সুষম উপাদানে না পেলেও শিশু অপুষ্টির শিকার হয়ে থাকে। তবে যেভাবেই হোক না কেন, এর প্রভাব সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি-সব কিছুর ওপরই পড়ে। মহিলাদের বেশির ভাগেরই জিংক, আয়রণ, আয়োডিনের স্বল্পতা দেখা যায়। এ সমস্যাগুলো সবক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে। ২৬ শতাংশ মহিলাই রক্তস্বল্পতায় ভোগে। পাঁচ বছরের নীচে শিশুদের প্রায় ৩৩.১ শতাংশই রক্তস্বল্পতায় ভোগে। তবে বর্তমানে আয়োডিনের অভাবে যেসব রোগ হতো সেগুলো কমেছে অনেকাংশে। শিশুদের মায়ের দুধ এবং সঠিক ও যথাযথ পরিমাণে পরিপূরক খাবার দেওয়া হলে এই সামাজিক সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসা সহজ হবে। অপরিকল্পিত ও অপর্যাপ্ত খাবার গ্রহণ, খাবার নির্বাচনে অজ্ঞতা এবং একই ধরনের খাবার বার বার গ্রহণে সমস্যা বাড়ে। অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের প্রতি যত্মবান হতে হবে। এসব শিশুর মৃত্যুহার স্বাভাবিকের চেয়ে ৯ গুণ বেশি। সচেতনতা বাড়ালে তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যুঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

মেয়ে শিশুদের খাদ্য, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া না গেলে তাদের দৈহিক আকার ছোটো হয়ে যায় অর্থাৎ খর্বাকৃতির হয়। এরা এই অপুষ্টি নিয়েই বাড়তে থাকে। এটি একটি চক্রাকার প্রক্রিয়া, কারণ প্রাথমিক অবস্থায় যদি ঠিকভাবে পুষ্টিকর খাবার না পায় তবে সেই মেয়ের অপুষ্ট শিশুর জন্ম দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আবার এই অপুষ্টি নিয়ে জন্মানো শিশু তার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে একইভাবে পৌঁছাবে। এভাবেই মেয়েদের মধ্যে অপুষ্টির দুষ্টচক্রটি ঘুরতে থাকে, যার পরিণতি ভয়াবহ।

আমাদের দেশে এখনো আঠারো না পেরুতেই অধিকাংশ মেয়ের বিয়ে হয়। অথচ আঠারো বছরের নিচে কোনো মেয়ে সন্তান ধারণের জন্য সম্পূর্ণ তৈরি থাকে না। ১৮ বছরের নীচে গর্ভধারণ নিরাপদ নয়। ১২ বছর বয়স থেকে মেয়েদের প্রজননঅঙ্গ সন্তানধারণ উপযোগী হতে শুরু করে এবং পূর্ণতা পায় ১৮ বছর বয়সে। এ সময় অবশ্যই মেয়েদের পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার দিতে হবে যেন তার শারীরিক বিকাশ সঠিক হয়। তবেই সে সুস্থ শিশু জন্ম দিতে পারবে। নারী-পুরুষের বৈষম্যের কারণে কোনো মেয়ে শিশু যাতে অপুষ্টির শিকার না হয় সে দিকে সবার নজর দিতে হবে। ১৮ বছর বয়সের নিচে গর্ভধারণের ফলেই আমাদের দেশে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার উন্নত দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। এ সমস্যা উত্তরণে ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করে তোলার পাশাপাশি প্রজননস্বাস্থ্য ও পুষ্টির বিষয়ে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ এবং জাতিকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে। জনগণকে এ বিষয়ে সচেতন করে তুলতে বর্তমান সরকার বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কিন্তু এটিকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হলে সরকারের পাশাপাশি এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে। বিশেষ করে সুশীল সমাজ ও বিভিন্ন মিডিয়ার ভূমিকা এখানে অনস্বীকার্য।

শিশুদের অপুষ্টি প্রতিরোধে কিশোরী, গর্ভবতী মা এবং দুগ্ধদানকারী মায়ের যথাযথ পুষ্টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অল্পবয়সে বিয়ে না দিলে সমস্যাগুলো কমে আসবে, বাল্যবিয়ে দেওয়ার ফলে অল্পবয়সে মা হলে শিশু ও মা দুজনই অপুষ্টিতে ভোগে।

গর্ভবতীর খাদ্যাভাসে ও ঔষধ গ্রহণে সচেতন হতে হবে। আয়রণ, জিংক গ্রহণ না করলে শারীরিক নানান সমস্যা তৈরি হবে। শুধু তাই নয় এ সময় পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম প্রয়োজন। পারিবারিক মহলও হতে হবে সুখকর। শিশুর অপুষ্টি প্রতিরোধে তার জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শালদুধ পান করাতে হবে। জন্মের পর প্রথম ৬ মাস শুধুই মায়ের দুধে শিশু বড়ো হবে। ৬ মাস পূর্ণ হলে শিশুদের উপযোগী বাড়তি নরম খাবার দিতে হবে। তবে দুই বছর পর্যন্ত মায়ের দুধ পান করাতে হবে। তাকে বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধী টিকাগুলো সময়মতো দিতে হবে।

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য অত্যন্ত আবশ্যক। কাজেই একটু সচেতন হলেই শিশুর জন্য পুষ্টিকর ও সুষম খাবার নিশ্চিত হবে। তবেই আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম স্বাস্থ্যবান, বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রতিভার অধিকারী হবে, দেশ গঠনে সফল অবদান রাখতে পারবে। সকলে এ বিষয়ে সচেতন হলেই দেশে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার এবং অপুষ্টির অভাব হ্রাস পাবে।

লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *