শিশু ধর্ষণ প্রতিরোধে প্রয়োজন সচেতনতা

শিশু ধর্ষণ প্রতিরোধে প্রয়োজন সচেতনতা

হালচাল। নার্গিস আকতার টিপ

শিশু ধর্ষণ প্রতিরোধে প্রয়োজন সচেতনতা

কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলা হাসপাতাল থেকে তিশাকে নিয়ে ময়মনসিংহ চলে যান তিশার খালা আইনজীবী মিনু বেগম। এখন থেকে তিশা খালার কাছে থেকেই পড়াশোনা করবে। যাতে ভুলে যায় তার জীবনে ঘটে যাওয়া কলঙ্কিত ঘটনাটি। সপ্তম শ্রেণিতে পড়া তাসনুভা হুদা তিশাকে স্কুল থেকে ফেরার পথে বখাটেরা তার ওপর যৌন নির্যাতন করে।

তিশার বাবা উপজেলা মৎস্য অফিসে চাকুির করেন। সেই সুবাদে উপজেলায় পরিবারের সাথে থাকতো তিশা। স্কুল যাওয়ার পথে কিংবা কোচিংয়ে আসা-যাওয়ার পথে কয়েকজন বখাটে তাকে প্রায়ই উক্ত্যক্ত করতো। তিশা তার বাবা-মাকে জানিয়েছিল বিষয়টি। কিন্তু ব্যাপারটা তারা প্রথমে গুরুত্ব দেয়নি। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে বখাটেরা তিশাকে জোরপূর্বক উপজেলার পরিত্যক্ত খাদ্যগুদামের ভেতর নিয়ে ধর্ষণ করে। তিশার চিৎকার শুনে উপজেলা অফিসের ঝাড়–দার তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায় এবং পরিবারের সদস্যদের খবর দেয়। তিশা প্রাণে বেঁচে গেলেও শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপন্ন হয়ে পড়ে। তিশার এ ঘটনায় থানায় মামলা করে তার বাবা। পুলিশ ধর্ষণকারীদের গ্রেফতার করে।

সারাদেশেই শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। কখনো ধর্ষণের পর হত্যা করা হচ্ছে। শিশুর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। শিশু থেকে বয়স্ক নারী কেউই এর বাইরে নয়। নগর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম, প্রায় প্রতিদিনই শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। মানুষের নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের বহি:প্রকাশ ধর্ষণের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে। নিশ্চিত করে বলা না গেলেও প্রতীয়মান হচ্ছে যে, অবদমনের সংস্কৃতিই বৃদ্ধি করছে মানসিকতার বিকৃতি। এসব রোধে সমাজে সুস্থ সংস্কৃতিচর্চা যেমন বাড়াতে হবে তেমনি সহশিক্ষার প্রসারেও গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রাণিজগতে যৌনতা একটি সহজাত প্রবণতা। সংযত ও আইনসঙ্গত না হলে তা অপরাধ। অবৈধভাবে সংঘটিত হলে সমাজ যৌনতাকে মারাত্মক অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। আমাদের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের যে সংজ্ঞা দেওয়া আছে তাতে কোন নারীর জোরপূর্বক বা ভয় দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়েছে (ধারা-৩৭৫)।

এই প্রসঙ্গে বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন বলেন, সাইকোলজিস্ট ফ্রয়েডের মতে, সমাজে দুই ধরনের মানুষ আছে। একজন হচ্ছে ধর্ষকাম আরেকজন হচ্ছে মর্ষকাম। একদল ধর্ষিত হয়ে আনন্দ পায় আরেকদল ধর্ষণ করে আনন্দ পায়। ধর্ষিত হয়ে আনন্দ পায় তাদের সংখ্যা খুবই কম। কিন্ত বিশে^ ধর্ষকাম লোকের সংখ্যা প্রচুর। যাদের সভ্য এবং নাগরিক সমাজে দেখা যায়। আমাদের দেশে দিন দিন নাগরিক সমাজ হয়ে উঠছে। শিশুকাল থেকেই এই প্রবৃত্তিগুলো চাপা দেওয়ার জন্য সামাজিকীকরণ হয়। আর এটা হয় দুই জায়গায় একটা হয় পরিবারে, আরেকটা স্কুল-কলেজ ইত্যাদি ক্ষেত্রে। অপরদিকে গ্রামীণ সমাজের লোকজন শহরে আসার পর তাদের মধ্যে নানা প্রবৃত্তি যেমন-টিভি, সিনেমা, পর্ণোগ্রাফি দেখার প্রবণতা বেড়ে যায়। ফলে তাদের খারাপ প্রবৃত্তি জেগে ওঠে। কিছু লোক সুযোগ পেলেই খারাপ প্রবৃত্তি চরিতার্থ করে।

শিশু অধিকার নিয়ে করা ব্যক্তিরা বলছেন, বিচারিক ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা, সামাজিক-পারিবারিক অসচেতনতা এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে এমন ঘটনা ঘটছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসে মোট ধর্ষণের ঘটনা ছিলো ৬৩০টি, যার অর্ধেক ঘটনায় ধর্ষিতের বয়স ছিল ১৮ বছরের নিচে। আর ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার কারণে শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে ২১টি। ধর্ষণের শিকার সবচেয়ে বেশি হয়েছে ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা। গত বছর ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টা ফলে শিশু হত্যার ঘটনা ছিলো ৩৫টি।

এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে সারাদেশে শিশু ধর্ষণের মামলা হয়েছে ৩০০এর বেশি। আর গত পাঁচ বছরে মোট শিশু ধর্ষণ মামলার সংখ্যা ছিলো ৩ হাজারের বেশি।

এই ব্যাপারে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক আহমেদ হেলাল বলেন, শিশুদের সামাজিক নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। যদিও সরকার নারী ও শিশুর নিরাপত্তা বিধানে অত্যন্ত আন্তরিক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার, মাদকাশক্তি, শিশু-কিশোরদের আচরণগত সমস্যাকে পরিবার থেকে গুরুত্ব না দেওয়ায় এমন ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে। শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের পাশাপাশি পরিবারকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।

নারী ও শিশু নির্যাতন, পাচার শুধু বাংলাদেশে নয় বিশ্বব্যাপী বেড়েছে। এটা এখন একটা বৈশ্বিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, অপহরণের ঘটনাগুলে অনেকক্ষেত্রে প্রকাশিত হয় না আবার অনেকে লোকলজ্জার ভাবে ধামাচাপা দেওয়া চেষ্টা করে। কিন্তু যেখানেই এ ধরণের ঘটনা ঘটুক আইনের আশ্রয় নেয়া উচিত। নির্যাতিতদের আইনি সুবিধার্থে ২০০০ সালে সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন তৈরি করে। সে আইনকে ২০১৩ সালে সংশোধন করে আরো কঠোর করা হয়। এখানে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে দ্রুত বিচার আইনের মাধ্যমে অপরাধীদের সাজা দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেকের বিচার হয়েছে। অনেকের বিচার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন রোধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।

শিশুরা হচ্ছে ফুলের মতো। তাদের সুরক্ষার মধ্য দিয়ে লালন-পালন করা প্রত্যেকের দায়িত্ব। অথচ বাবা-মাসহ আমরা সে দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারছি না। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার তাগিদ অনুভব করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌন নিপীড়ন বিরোধী নীতিমালা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সর্বত্র শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি আইনি সহায়তা কোথায় পাওয়া যায় সে সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এছাড়া জরুরি সেবা ৯৯৯, নাগরিক সেবা ৩৩৩, দুদুকের হট লাইন নম্বর ১০৬ ইত্যাদিতে ফোন করে দিন রাত যেকোনো সময়ে সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান পাওয়া যায়।

শিশু ধর্ষণের ঘটনায় শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক জীবনে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই ব্যাক্তি পর্যায়ে পাড়ায় পাড়ায় কমিটি গঠন করে এ অপরাধ প্রতিরোধ করার উদ্যোগ নিতে হবে। অভিভাবক, শিশু সংগঠন, মানবাধিকার সংস্থা, স্কুল-কলেজ এবং পাড়ার তরুণদের সম্মিলিভাবে এই অপরাধ ঠেকাতে এগিয়ে আসতে হবে।

আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সমাজ থেকে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা নির্মূলে মানবিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আর তার জন্য প্রয়োজন শিশু-কিশোরদের নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা বাড়াতে হবে স্কুল-কলেজে। আমাদের স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচিতেও এ বিষয়ে সচেতনতামূলক ও শিক্ষামূলক ধারণা থাকতে হবে। এ ব্যাপারে গণমাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টিসহ ব্যক্তিপর্যায় থেকেও এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমানে নারী ও শিশুর জীবনধারাকে কন্টকমুক্ত করার ক্ষেত্রে সরকারের নানা উদ্যোগও প্রশংসনীয়। সম্মিলিতভাবে সমাজের অভ্যন্তরে মানবিকতার অনুশীলন করা এখন সময়ের দাবী। তবেই সমাজ এবং মানুষের জীবনধারায় পরিবর্তন ঘটবে। সবাই সচেতন হলে এবং পারিবারিক ও সামিাজকভাবে পরস্পরিক মমতা ও শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি হবে। কমে যাবে শিশু ধর্ষণের মতো অমানবিক ঘটনা।

লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *