শিশু নির্যাতন বন্ধে সচেতনতা জরুরি
আব্দুল লতিফ বকসী : পরন্ত বিকেল। নাদীম বন্ধুদের সাথে খেলছে মাঠে। বয়স বড় জোর পাঁচ বছর। হঠাৎ গ্রামের প্রভাবশালী বাদশা মিয়া নাদিমকে নির্দয়ভাবে প্রহার করতে শুরু করে। তার আত্মচিৎকারে অনেক লোক ছুটে আসে। এদৃশ্য মোবাইল ফোনে ছবি তোলা আর ভিডিও করার প্রতিযোগিতা করছে অনেকেই, বাকীরা দর্শক। কারণ কেউ জানে না। ছেলেটিকে উদ্ধারের তৎপরতা নেই কারো। মনে হচ্ছে কোন চলচ্চিত্রের স্যুটিং হচ্ছে। প্রহারের একপর্যায়ে মাটিতে লুঠিয়ে পরে নাদীম। এরপর শান্ত হয় বাদশা মিয়া। এতক্ষণে জানা গেল নাদিমের উপর বাদশার নির্যাতনের কারণ। বাদশার অভিযোগ নাদীম চোর, সে মোবাইল ফোন চুরি করেছে। কিন্তু তার কাছে কোন প্রমাণ নেই, সন্দেহে করে এ নির্যাতন। খবর পেয়ে নাদীমের দিনমজুর বাবা ছুটে আসে। মুমুর্ষ অবস্থায় ছেলেকে নিয়ে যায় হাসপাতালে। একটু দেরি হলে নাদীমের মৃত্যু হতে পারতো।
নাদীম বাদশা মিয়ার ছেলের খেলার সাথী এবং তারা প্রতিবেশি। কারণে অকারণে সে বাদশা মিয়ার ঘরে যায়। এতে কোন দিন আপত্তি উঠেনি। ঘটনার দিন বাদশা মিয়ার ছেলে সুরুজ তার বাবার মোবাইল ফোনটি নিয়ে বাড়ির পিছনে বাগানবাড়িতে বসে গেম খেলে ফোনটি সেখানেই ফেলে এসেছে। বাদশা মিয়া ঘরে এসে ফোন না পেয়ে সন্দেহ করে নাদীমকে। কারণ বাদশা মিয়া বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় দেখেছে নাদীম তার বাড়িতে যাচ্ছে। এর সময় সুরুজ মায়ের সাথে বেড়াতে গেছে পাশের বাড়িতে। এটুকু সময়ের মধ্যে ঘটে গেলো এসব ঘটনা।
বাংলাদেশ ডিজিটালি উন্নত ও মধ্যআয়ের দেশে পরিনত হতে যাচ্ছে। এটা এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব। দেশের উন্নতি হয়েছে, যুগের পরিবর্তন হয়েছে। তবে পরিবর্তন প্রয়োজন আমাদের নৈতিক মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধের। মানুষের পারস্পরিক আত্মার সম্পর্কের দুরত্ব বেড়েছে, দুরত্ব বেড়েছে প্রতিবেশিদের সাথে সম্পর্কেরও। মানুষ সামাজিক জীব, একসময় ছিল সমাজের সবসমস্যা মানুষ সমাজে বসেই সমাধান করতো। আইন আদালত পর্যন্ত গড়াতো না। সুখে-দুঃখে মানুষ একে অপরের অংশীদার হতো। বিপদে-আপদে এগিয়ে আসতো। নিজের স্ত্রী বা সন্তানকে শাসন করার সময়ও প্রতিবেশি ছুটে আসতো অধিকার নিয়ে। সমাধান করে দিতো সমস্যা। এখন মানুষের মাধ্যে সে গুণাবলী কমে যাচ্ছে। মানুষ হয়ে যাচ্ছে যান্ত্রিক। এখন আর একে অপরের সুখ-দুঃখে, আপদে-বিপদে এগিয়ে আসতে চায় না। এটাকে সামাজিক অবক্ষয় বলা যায়।
লেখক : শিশু গবেষক ও কলামিস্ট
(চলবে)


