শিশু লালন-পালনে মায়ের ভূমিকা

শিশু লালন-পালনে মায়ের ভূমিকা

শিশু লালন-পালনে মায়ের ভূমিকা

মোঃ আবদুর রহমান : শিশু লালন-পালনে পিতা-মাতা, বিশেষ করে মায়ের ভূমিকা অতুলনীয়। একজন মা একাধারে গর্ভধারিনী, স্তন্যদায়িনী, লালন-পালনকারী, সেবিকা, শিক্ষয়িত্রী, স্নেহশীলা, অভিভাবিকা। মায়ের কর্তব্য ও দায়িত্বের কোনো সীমা নেই। শিশুর দৈহিক ও মানসিক গঠনের মতো চরিত্র গঠনও মায়ের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। তাই সন্তান লালন-পালনে মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ ভূমিকা পালনে মাকে অত্যন্ত সচেতন ও দূরদর্শী হতে হবে।

একজন মাকে দীর্ঘ দশ মাস গর্ভে সন্তানধারণের সময় তাকে যথেষ্ট কষ্ট সহ্য করতে হয়। গর্ভাবস্থায় মায়ের চলাফেরা, আচার-আচরণ ও চিন্তাধারার একটা প্রভাব সন্তানের ওপর পড়ে। তাই গর্ভাবস্থায় মাকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করতে হয়। খাওয়া-দাওয়া, ওঠা-বসা সবদিকেই বিশেষ নজর রাখতে হয়।

গর্ভাবস্থায় মায়ের নিজের প্রয়োজনীয় খাবার খাওয়ার পাশপাশি গর্ভস্থ শিশুর জন্য বাড়তি খাদ্যের প্রয়োজন হয়। তাই গর্ভবতী মা প্রতিদিন পুষ্টিকর খাবার মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, কলিজা, ডাল, সবুজ ও হলুদ রঙের শাক-সবজি এবং মৌসুমী ফলমূল বেশি করে খাবেন এবং বেশি বিশ্রাম নেবেন। এসময় মাকে দুশ্চিন্তা থেকে বিরত থাকতে হবে। তাকে সুন্দর চিন্তাভাবনা করা উচিত। চরিত্রগঠনমূলক বই-পুস্তক অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। গর্ভকালীন পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা প্রয়োজন। ভূমিষ্ঠ হবার পর পরই শিশুকে মায়ের বুকের প্রথম দুধ বা শাল দুধ খেতে দিতে হবে। শাল দুধে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ইমিউনোগ্লোবিউলিন বা রোগ প্রতিরোধকারী উপাদান। শাল দুধ খাওয়ালে শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়ে এবং একইসাথে শিশু প্রয়োজনীয় পুষ্টিও লাভ করে। মায়ের দুধ মা ও শিশুর মধ্যে এক স্বর্গীয় ভালবাসার বন্ধন সৃষ্টি করে, যা পরবর্তী জীবনে শিশুকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। জন্মের পর থেকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ালে শিশুকে অপুষ্টিজনিত বিভিন্ন রোগের হাত থেকে রক্ষা করা যায়। শিশুকে সুন্দর ও স্বাস্থ্যবান করে গড়ে তোলার জন্য উপযুক্ত খাদ্য হিসেবে মায়ের দুধের কোনো বিকল্প নেই। সৃষ্টিকর্তা সন্তানের জন্মের পূর্বেই মায়ের বুকের দুধে এমন খাদ্যের ব্যবস্থা করে রেখেছেন যার কোনো তুলনা হয় না। এ থেকে সন্তানকে বঞ্চিত করা ঠিক নয়।

মায়ের দুধ পানে শিশু মানসিক ও শারীরিক ভারসাম্যসহ বেড়ে ওঠে।

শিশুর বয়স ছয় মাসের পর থেকে দু’বছর বয়স পর্যন্ত বুকের দুধের পাশাপাশি শিশুকে বাড়তি খাবার খাওয়াতে হবে। শিশুকে ছোট বেলা থেকে শাক-সবজি ও ফলমূল খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে। মায়ের দেহের ক্ষয়পূরণ ও বুকের দুধ উৎপাদনের জন্য মাকে সব ধরনের পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। এতে শিশুর অপুষ্টিও দূর হবে। প্রসূতি মায়ের প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি খেতে হয়। শিশু জন্মগ্রহণের পর মায়ের ওপরই নির্ভরশীল থাকে। মা তার হৃদয় নিংড়ানো মমতা ও আদর দিয়ে শিশুকে বড় করে তোলেন। সন্তানের খাওয়া-দাওয়া, গোসল, নিদ্রা সকল ব্যাপারে মা নজর রাখেন। শিশুর সুস্বাস্থ্যের জন্য ঘুম অত্যন্ত জরুরি। তাই নির্জন পরিবেশে শিশুকে ঘুমের অভ্যাস করানো উচিত। এই বিশ্রামের ফলে শিশুর স্বাস্থ্য ভালো হয়।

মা সন্তানের প্রাথমিক শিক্ষাগুরু। মায়ের হাতেই শিশুর শিক্ষার হাতে খড়ি হয়। সে মায়ের কাছ থেকেই কথা শিখে, ভাষা শিখে। শিশু সারাক্ষণ মাকে অনুসরণ করে। এ সময় মায়ের কথাবার্তা, চাল-চলন ও আচার-আচরণে সতর্ক হওয়া একান্ত প্রয়োজন। সন্তানের মন ও মানসে বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ে এমন কোনো আরচণ করা উচিত নয়। সন্তানের কচি মনে মা যে শিক্ষার পরশ দেবেন, তাই স্থায়ীভাবে দাগ কেটে থাকবে। মায়ের কাছ থেকেই সন্তান আক্ষরিক জ্ঞান এবং পরে পুঁথিগত শিক্ষা পেয়ে থাকে। সন্তানকে বৈষয়িক শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা দেয়া মায়ের দায়িত্ব। মা সন্তানকে যে শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলেন সন্তান সেভাবেই গড়ে ওঠে। তাই প্রতিটি মায়েরই সন্তানকে ভাল ও সুন্দর বিষয়ে শিক্ষা দেয়া উচিত।

একটি আদর্শ পরিবারে মায়ের অন্যতম কর্তব্য হচ্ছে সন্তানদের তত্ত্বাবধান করা। তার আচার-আচরণের খোঁজ-খবর রাখা। সন্তানের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য মাকে যেমন সন্তানের পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে খেয়াল রাখতে হয়, তেমনি নিজেকেও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হয় এবং পরিবেশও পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়। শিশুর খাবারের সাথে যাতে কোন রোগ জীবাণু তার দেহে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য খাবার তৈরি ও পরিবেশনার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। খাবার প্রস্তুত, পরিবেশন ও খাওয়ানোর আগে মায়ের হাত সাবান দিয়ে ভাল করে ধুয়ে নিলে শিশুর অনেক রোগব্যাধি প্রতিরোধ করা যায়। অপরিচ্ছন্ন খাবারের জন্য শিশু আমাশয়, ডায়রিয়া প্রভৃতি নানা রকম পেটের অসুখের শিকার হতে পারে। শিশুর নখ কেটে ছোট রাখা উচিত। এছাড়া শিশুর শরীর, জামা-কাপড় ও বিছানা সব সময় পরিস্কার রাখতে হবে। দাঁত ওঠার সময়ে বাচ্চারা সব কিছুই মুখে দিতে চায়। যাতে ময়লা কোনো কিছু শিশুর মুখে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সংক্রামক রোগ থেকে রক্ষা পেতে নিরাপদ খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি শিশুদের পান করাতে হবে। তাছাড়া শিশুদের স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটারি পায়খানা ব্যবহার করার অভ্যাস করাতে হবে।

মায়ের অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে সন্তানদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কাজ হাতে-কলমে বাস্তব ও ব্যবহারিক শিক্ষা দেয়া। বিশেষ করে কন্যা সন্তানকে মায়ের রান্না-বান্না ও ঘরকন্যার প্রয়োজনীয় সব কাজই শিক্ষা দেয়া প্রয়োজন। অজ্ঞতার কারণে অনেকে একজন কিশোরীকে একজন কিশোরের চেয়ে কম খাদ্য ও যত্ন দিয়ে থাকেন। কিন্তু আজকের কিশোরীই আগামী দিনের মা। তাই তার প্রতি অধিক যত্ন নিতে হবে এবং অধিক পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। কিশোরী যদি উপযুক্ত পরিচর্যা ও পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে সে ভবিষ্যতে জন্ম দেবে একটি দুর্বল, অসুস্থ ও স্বল্প ওজনের অপুষ্ট শিশু। কিশোরীর বাড়ন্ত শরীরের পুষ্টি যোগাতে তাকে প্রতিদিন পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়াতে হবে এবং পুষ্টি সচতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

কিশোরী অবস্থায় মেয়ের বিয়ে দেয়া ঠিক নয়। আঠারো বছরের পর বিয়ে দিলে মা এবং সন্তানের অপুষ্টিতে ভোগার আশংকা কমে যায়। মায়ের স্বাস্থ্য যদি ভাল থাকে, তাহলে সেই মা অবশ্যই একটি সুস্থ শিশুর জন্ম দিতে পারে। কিশোরীকে বয়সে বিয়ে দিলে, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়। কৈশোরে শারীরিক ও মানসিক কারণে মেয়েরা অনেকটা সংকুচিত ও দিশেহারা হয়ে পড়ে। কিশোরীর আবেগকে অবহেলা না করে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। বয়ো:সন্ধিতে একটি কিশোর বা কিশোরীর আচরণের নানা পরিবর্তন আসে। এ সময় সে অনেক ভুল পদক্ষেপ নিতে পারে। একমাত্র মা-ই তখন বন্ধুর মতো আচরণ দিয়ে সন্তানকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে পারেন। মা সন্তানের চরিত্রগঠনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।

শিশুর মানসিক বিকাশে মায়ের ভূমিকা অনন্য। শিশুকে হাসি-খুশি রাখা এবং তার প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দেয়া মা’র কর্তব্য। পারিবারিক পরিবেশ সুস্থ রেখে শিশুর মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করার প্রতি মা’র খেয়াল রাখা উচিত। মায়ের চিন্তা-চেতনা, আচার-আচরণ, কথাবার্তা ও আদবকায়দা শিশুর মন-মানস ও আচার-আচরণে প্রতিফলিত হয়। এসময় মাকে খুবই সতর্ক হতে হয়।

কাজেই, সন্তানের লালন-পালন, শিক্ষা-দীক্ষা, চরিত্রগঠন সর্বক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই মাকে নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে সর্বদা সচেতন থাকতে হবে। সন্তানকে বুকের দুধ, পুষ্টিকর খাবার, আদর, স্নেহ, সোহাগ ও শাসনের মাধ্যমে আদর্শ, সুস্থ ও স্বাস্থ্যবান মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য নেপোলিয়ান বলেছেন, “আমাকে একটি ভাল মা দাও, আমি তোমাদেরকে একটি ভাল জাতি উপহার দেব।”
লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *