শীতে পাখি পরিযান | আব্দুল্লাহ আমান

শীতে পাখি পরিযান | আব্দুল্লাহ আমান

শীতে পাখি পরিযান | আব্দুল্লাহ আমান

আমরা বেসেছি যারা অন্ধকারে দীর্ঘ শীত-রাত্রিটিরে ভালো/ খড়ের চালের পরে শুনিয়াছি মুগ্ধরাতে ডানার সঞ্চার;/ পুরানো পেঁচার ঘ্রাণ; অন্ধকারে আবার সে কোথায় হারালো!/ বুঝেছি শীতের রাত অপরূপ, মাঠে মাঠে ডানা ভাসাবার/ গভীর আহ্লাদে ভরা; অশত্থের ডালে–ডালে ডাকিয়াছে বক;/ আমরা বুঝেছি যারা জীবনের এইসব নিভৃত কুহক;/ —জীবনানন্দ দাশ

হেমন্তের পাকা ধানের সুবাস না কাটতেই উত্তরে হিম বাতাস প্রকৃতিতে হাজির করে শীতকে। প্রকৃতিতে দেখা যায় শীতের আগমনী বার্তা। রাতভর ঝরা কুয়াশায় গাছের পাতায়, ঘাসের ডগায় মুক্তো হয়ে ফুটে থাকে শুভ্র শিশির বিন্দু। তীব্র কুয়াশার বুহ্য ভেদ করে শরীরে আলতো পরশ বুলায় ভোরের মিষ্টি রোদ। ক্ষেতের পর ক্ষেত জুড়ে পসরা মেলে বসে হলুদিয়া সরিষা। সুমিষ্ট গান আর কল-কাকলিতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরো সুশোভিত করতে উত্তরের হিমেল বাতাসে ভর করে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এসময়ে দেশে আসে বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী অতিথি পাখি। তাদের কলকাকলিতে, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরে উঠে দেশের নানা প্রান্তরের হাউর-বাউর, বিল, লেকসহ অসংখ্য জলাশয়। বালিহাঁস, বাটুল, চখাচখি, শামুকখোল, খোপাডুবুরিসহ অন্যান্য পাখির চঞ্চল ওড়াওড়ি মুগ্ধ করে যেকোনো মানুষকে। হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এসব পাখি আসে আমাদের দেশে একটু উষ্ণতার জন্য। শীতের ধূসর প্রকৃতির বিপরীতে রঙ-বেরঙের এই পাখ-পাখালির মেলা যেন নিয়ে আসে উৎসবের আমেজ।

পৃথিবীতে প্রায় ৫ লাখ প্রজাতির পাখি আছে। এসব পাখিদের মধ্যে অনেক প্রজাতিই বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় অন্য দেশে চলে যায়। পাখিদের অন্যত্র চলে যাওয়াকে বলে পাখি পরিযান। পাখি পরিযান বলতে মূলত নির্দিষ্ট প্রজাতির কিছু পাখির প্রতি বছর বা কয়েক বছর পর পর একটি নির্দিষ্ট ঋতুতে বা সময়ে কম করে দু’টি অঞ্চলের মধ্যে আসা-যাওয়াকেই বোঝায়।

আমাদের দেশে মোট পাখি আছে প্রায় ৬২৮ প্রজাতির। এরমধ্যে ২৪৪ প্রজাতির পাখিই স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে বাস করে না। এরা আমাদের দেশের পরিযায়ী পাখি বা অতিথি পাখি। শীত আসার সঙ্গে সঙ্গে এরা আমাদের দেশে আসতে শুরু করে। শীত এলে এরা সহ্য করতে না পেরে অন্য দেশে যেখানে শীত অপেক্ষাকৃত কম সেখানে চলে যায়। তাছাড়া এসময়টাতে শীতপ্রধান এলাকায় খাবারেও দেখা যায় প্রচণ্ড অভাব। কারণ শীতপ্রধান এলাকায় এসময় তাপমাত্রা থাকে অধিকাংশ সময় শূন্যেরও নিচে। সেই সাথে রয়েছে তুষারপাত। তাই কোনো গাছপালা জন্মাতেও পারে না। এজন্য শীত এলেই উত্তর মেরু, সাইবেরিয়া, ইউরোপ, এশিয়ার ও হিমালয়ের আশপাশের কিছু অঞ্চলের পাখিরা ঝাঁকে ঝাঁকে চলে আসে অপেক্ষাকৃত কম ঠাণ্ডা অঞ্চলের দিকে। তারপর বসন্তের শুরুতে যখন বরফ গলতে শুরু করে, আড়মোড়া ভেঙে নতুন করে সবুজ কিশলয় মাথা তুলতে আরম্ভ করে মানে মার্চ থেকে এপ্রিলের দিকে ফিরে যেতে থাকে নিজেদের দেশে।

দীর্ঘ যাত্রায় পাখিরা কিভাবে পথ চেনে সে এক রহস্য। দেখা গেছে পথ চেনাতে অভিজ্ঞ পাখিরাই ঝাঁকের সামনের দিকে থাকে। নতুনরা থাকে পেছনে। এ ক্ষেত্রে পাখিরা উপকূলরেখা, পাহাড়শ্রেণী, নদী, সূর্য, চাঁদ, তারা ইত্যাদির মাধ্যমেই পথ খুঁজে নেয় বলে ধারণা করা হয়।

এসব পাখিদের মধ্যে বাংলাদেশের অতি পরিচিতি অতিথি পাখি নর্দান পিনটেইল। এছাড়া স্বচ্ছ পানির বালি হাঁস, খয়রা, চখাচখি, কার্লিউ, বুনো হাঁস, ছোট সারস পাখি, বড় সারস পাখি, হেরন, নিশাচর হেরন, ডুবুরি পাখি, কাদাখোঁচা, গায়ক রেন পাখি, রাজসরালি, পাতিকুট, গ্যাডওয়াল, পিনটেইল, নরদাম সুবেলার, কমন পোচার্ড, বিলুপ্ত প্রায় প্যালাস ফিস ঈগল (বুলুয়া) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও নানা রং আর কণ্ঠ বৈচিত্র্যের পাখিদের মধ্যে রয়েছে ধূসর ও গোলাপি রাজহাঁস, বালি হাঁস, লেঞ্জা, চিতি, সরালি, পাতিহাঁস, বুটিহাঁস, বৈকাল, নীলশীর পিয়াং, চীনা, পান্তামুখি, রাঙামুড়ি, কালোহাঁস, রাজহাঁস, পেড়িভুতি, চখাচখি, গিরিয়া, খঞ্জনা, পাতারি, জলপিপি, পানি মুরগি, নর্থ গিরিয়া, পাতিবাটান, কমনচিল, কটনচিল প্রভৃতি।

দীর্ঘ যাত্রায় পাখিরা কিভাবে পথ চেনে সে এক রহস্য। দেখা গেছে পথ চেনাতে অভিজ্ঞ পাখিরাই ঝাঁকের সামনের দিকে থাকে। নতুনরা থাকে পেছনে। এ ক্ষেত্রে পাখিরা উপকূলরেখা, পাহাড়শ্রেণী, নদী, সূর্য, চাঁদ, তারা ইত্যাদির মাধ্যমেই পথ খুঁজে নেয় বলে ধারণা করা হয়। যেসব পাখি একা ভ্রমণ করে তাদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে জীবনে প্রথমবার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলেও তারা গন্তব্যে পৌঁছে যায়। এ জন্য বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রই পাখিদের পথ চেনায়।

প্রতি বছরের মত এবারও বাতাসে শীতের ছোঁয়া লাগতেই অতিথি পাখির আনাগোনা শুরু হয়েছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিভিন্ন খাল, বিল, পুকুর, হ্রদ, নদী অববাহিকায় এবারের শীতেও প্রচুর পরিমাণ বিদেশী পাখির বিচরণ ইতোমধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অতিথি পাখির বিচরণস্থান হিসেবে পুর্বে যেসব জায়গা পরিচিত, এবারের শীতে সে সব জায়গাগুলোর অধিকাংশই অতিথি পাখিদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠছে।

পাখির দেশ, গানের দেশ, কবিতার দেশ-বাংলাদেশ। অনিন্দ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এদেশ এবার পেয়েছে অতিথি পাখি সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে বিশেষ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

রাজধানী ঢাকার অদূরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে, নীলফামারী জেলার নীলসাগর দীঘিতে, দেশের সর্ববৃহৎ হাওর হাকালুকিতে, বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের বাইক্কা বিলে প্রভৃতি স্থানে শীতের হাজারো অতিথি পাখির সমাগমে ও কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠেছে। পাখি দেখতে ছুটে আসছে বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য পাখিপ্রেমী মানুষ। বসেছে দর্শনার্থীদের মিলনমেলা। শীতের অতিথি পাখিরা কিচিরমিচির ডাক আর পাখা নাচিয়ে উড়াল দিয়ে পানিতে ভেসে বেড়ানোর খেলায় মেতে উঠছে। ক্রমে অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠবে ছোট-বড় ২৩৫টি বিলের সমন্বয়ে গড়া হাওরাঞ্চল। দেশের যে স্থানগুলোতে অতিথি পাখির সমাগম ঘটে হাকালুকি হাওর তাদের মধ্যে অন্যতম। একটি সূ্ত্রে জানা যায় যে, পাখি বিশেষজ্ঞরা গত ৫ বছর এই হাওড়ে পাখি জরিপ করে ঘোষণা দিয়েছেন সবচেয়ে বেশি অতিথি পাখি সমাগমের পাশাপাশি বেশি প্রজাতির এবং বিলুপ্ত প্রজাতির পাখির দেখা মেলে এখানে।

পাখির দেশ, গানের দেশ, কবিতার দেশ-বাংলাদেশ। অনিন্দ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এদেশ এবার পেয়েছে অতিথি পাখি সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে বিশেষ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। সম্প্রতি ফ্রেন্ডশীপ ইস্ট এশিয়ান-অস্ট্রেলিয়ান ফ্লাইওয়ে নামক অতিথি পাখি সংরক্ষণ ও গবেষক সংস্থা বাংলাদেশকে এই স্বীকৃতি দিয়েছে। পরিযায়ী পাখির আবাসস্থলকে নিরাপদ রাখা ও পাখিদের বিচরণস্থল সংরক্ষণে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রতিবছর ১০ ও ১১ মে বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস(World Migratory Bird Day) পালিত হয়।

পাখি হলো প্রকৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। পাখি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায় না, আমাদের অনেক উপকারও করে। ফসলে ভাগ বসিয়ে পাখিরা মানুষের যেটুকু ক্ষতি করে, উপকার করে তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি। পরিযায়ী পাখিদের জীবন আজ হুমকির সম্মুখীন। ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী আইনের ২৬ ধারা মতে পাখি শিকার ও হত্যা দন্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু এ আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নেই বলে এই মৌসুমে পাখিশিকারিদের দৌরাত্ম্য চলে। শুধু পেশাদার নয়, অনেক শৌখিন শিকারিও অতিথি পাখি শিকার করেন। প্রতিদিনই মারা পড়ছে শতশত অতিথি পাখি। এতে একদিকে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে জীববৈচিত্র্য। বাড়ছে ক্ষতিকর পোকামাকড়ের প্রকোপ, যার কারণে ফসল উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে।

প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের স্বার্থে অতিথি পাখি রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার। তাই আসুন আমরা দেশকে পরিবেশবান্ধব রাখতে নিজ থেকে এগিয়ে আসি।

মানুষের অজ্ঞতা ও অসচেতনতার ফলেই এ দেশে পরিযায়ী অতিথি পাখিরা আজ বিপন্ন। প্রতিবছর চোরা শিকারিরা বিপুল পরিমাণে পরিযায়ী পাখি শিকার করে। ফলে দিনে দিনে বাংলাদেশে পাখি আসা কমে যাচ্ছে। শীতের শুরুতে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় অতিথি পাখি হত্যা, জাল ব্যবহার ও শিকার ইত্যাদির ক্ষেত্রে কিছু আইনগত কার্যকারিতা দেখায়। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই এ তৎপরতায় ভাটা পড়ে। রাস্তা-ঘাটে অবাধে বিক্রি হতে দেখা যায় পরিযায়ী অতিথি পাখি। পত্র-পত্রিকায় এর ছবিও ছাপা হয়। কিন্তু এতে কারও টনক নড়ে না। বারবার একই ছবির পুনরাবৃত্তি ঘটে।

প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের স্বার্থে অতিথি পাখি রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার। তাই আসুন আমরা দেশকে পরিবেশবান্ধব রাখতে নিজ থেকে এগিয়ে আসি। অতিথি পাখি ধরা ও কেনা থেকে বিরত থেকে এ ব্যাপারে গণ সচেতনতা গড়ে তুলি। পরিবেশের বাস্তুতন্ত্রকে সমুন্নত রাখার জন্য সামান্য হলেও সবাই অবদান রাখি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *