আবহাওয়া। মো. রেজাউল করিম সিদ্দিকী
শীতে শিশুর যত্ন
চলছে শীতকাল। পিঠাপুলির উৎসব, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া, বন্ধুবান্ধব, পরিবার পরিজনসহ ঘুরতে যাওয়ার সময়। গ্রীষ্মের খড়তাপ কিংবা বর্ষার মত বৃষ্টি বাদলের ঝামেলা নেই বলে এই সময়টাতে বেড়াতে যাওয়ার উপযুক্ত সময় হিসেবে বেছে নেয় অনেকে। উৎসব আনন্দ যাই হোক না কেন, শীতে শিশুর প্রতি বাড়তি যত্ম নিতে সবারই সতর্ক থাকা উচিৎ।
এবার শীতের প্রকোপ শুরু হয়েছে অনেকটা আকস্মিকভাবেই। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আবহাওয়া বেশ নাতিশীতোষ্ণই ছিল। দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষের দিকে অর্থাৎ পৌষের শুরুতেই আকস্মিক শৈত্যপ্রবাহের মাধ্যমেই মূলত শুরু হয়েছে এবারের শীত। এসময় দুই তিন দিনের ব্যবধানে দেশের গড় তাপমাত্রা দশ থেকে পনের ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে দশ ডিগ্রির নীচে নেমে এসেছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলা যেমন কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, নীলফামারী জেলার রেকর্ডকৃত তাপমাত্রা দশ ডিগ্রির নীচেতো ছিলই, সাথে ঘন কুয়াশা ও উত্তুরে শীতল হাওয়ার কারণে শীতের অনুভবটা ছিল প্রকট আকারে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি এসে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া শেষ দিকে পাঁচ ডিগ্রির নীচে।
তাপমাত্রার এই আকস্মিক পরিবর্তনে শিশু ও বৃদ্ধ বয়সের লোকজন ভোগান্তির শিকার হয়েছে বেশি পরিমাণে। হাসপাতালগুলোতে এবার শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি রোগী। শীতের আবির্ভাব একটু প্রলম্বিত সময়ে হলে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা এটাকে মানিয়ে নিতে যথেষ্ট সময় পেত। ফলে অসুস্থতার হার হ্রাস পেতো। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাবে এবারের শীতের আগমন এমন আকস্মিকভাবে হয়ে থাকতে পারে।
জলবায়ুর পবিরর্তন এবং আবহাওয়ার এমন খামখেয়ালী আচরণ আমরা সহসাই বন্ধ করতে পারবো না, কিন্তু যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করে আমরা নিজেদের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি এবং ভোগান্তির পরিমাণ কমিয়ে আনতে পারি।
শুরুতেই উল্লেখ করেছি শিশুর প্রতি শীতে বাড়তি যত্নে প্রসঙ্গে। সে প্রসঙ্গে আসছি। শিশুদের শরীরের তাপমাত্রা বয়স্কদের থেকে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বেশি থাকে। ফলে একই পরিবেশে তাপমাত্রার পার্থক্য বড়দের তুলনায় শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি হয়ে থাকে। তাছাড়া প্রাপ্ত বয়স্কদের তুলনায তাদের সহন ক্ষমতা কম থাকায় শীতে শিশুরা সহজেই অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। ফলে শীতজনিত জটিলতা হতে রক্ষা পাবার জন্য শিশুদের প্রতি বাড়তি যতœ অবশ্যই নিতে হবে।
পরিবেশের তাপমাত্রা পনের ডিগ্রি সেলসিয়াসের নীচে থাকলে শিশুদের বিশেষ করে নবজাতককে বাইরের খোলা বাতাসের হাত থেকে যথা সম্ভব রক্ষা করতে হবে। বিনা প্রয়োজনে বাইরে বেরুনো হতে বিরত থাকতে হবে। যদি নিতান্তই কোথাও নিয়ে যেতে হয় তবে যথেষ্ট পরিমাণে গরম কাপড়ে মুড়ে তাকে বাইরে নিতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে শিশুর দেহের কোন অংশ যেন অনাবৃত না থাকে, বিশেষ করে মাথা, গলা এবং বুকের দিকটা যেন মোটা কাপড়ে মোড়া থাকে। বাইরের ঠাণ্ডা বাতাস সরাসরি শিশুর ফুসফুসে প্রবেশ করে তাকে দুর্বল বা অসুস্থ করে তুলতে পারে। এ থেকে শিশুর নিউমোনিয়া হবারও আশঙ্কা থাকে। শিশুর মুখম-লের চারপাশ গরম কাপড়ে ঢেকে মায়ের বুকের কাছাকাছি রাখতে হবে যেন তার ফুসফুসে অপেক্ষাকৃত গরম বাতাস প্রবেশ করে।
শুধু বাইরে বেরুনোর সময় নয়, ঘরের ভেতরেও শিশুকে ঠাণ্ডার হাত থেকে রক্ষার জন্য নিতে হবে বাড়তি যত্ন। ঠাণ্ডা আবহাওয়ার কারণে শিশুর ঘন ঘন প্রসাব হতে পারে। শিশুর ঠাণ্ডা লাগার এটা অন্যতম কারণ। শিশু পায়খানা বা প্রস্রাব করার সাথে সাথে তার কাপড় পাল্টে দিতে হবে। রাতের বেলা অনেক শিশু লেপ, কম্বল বা কাঁথার নীচে থাকতে চায় না। পা দিয়ে ক্রমাগত ঠেলতে ঠেলতে এগুলি বাইরে পড়ে যায় এবং শিশু অনাবৃত হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় অভিভাবক নিদ্রিত থাকলে দীর্ঘ সময় শিশু অনাবৃত থেকে তার ঠাণ্ডা লেগে যেতে পারে। আবার অধিক পরিমাণে মোটা কাপড়ে ঢেকে রাখলে শিশু ঘেমে যেতে পারে। এই ঘাম থেকেও শিশুর ঠাণ্ডা লাগতে পারে। দিনে কিংবা রাতে ঘুমানোর সময় শিশুকে মায়ের বুকের কাছে রাখা শিশুকে উষ্ণ রাখার সবচেয়ে ভাল উপায়। এতে মায়ের শরীরে উষ্ণতা শিশুকে প্রয়োজনীয় তাপ সরবরাহ করে তার শরীর উষ্ণ রাখে। এছাড়া এতে মায়ের সাথে শিশুর আত্মিক সম্পর্ক আরও গভীর হয় যা তার পরবর্তী জীবনে সামাজিকীকরণ ও তার মানসিক বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
শীতে শিশুর খাবারের প্রতি নিতে হবে বাড়তি যত্ন। শুষ্ক মওসুম হওয়ায় এ সময় প্রচুর ডিহাইড্রেশন হয়। ফলে শিশুকে প্রচুর পানি খাওয়াতে হবে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যে ঠাণ্ডা পানি যেন পান না করে। শিশুকে পানি, দুধ বা অন্য যে কোন তরল খাবার হালকা গরম অবস্থায় খাওয়াতে হবে। বাড়িতে রেফ্রিজারেটর খোলার সময় শিশুকে নিরাপদ দূরত্বে রাখতে হবে যেন ভিতরের ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাপটা তার শরীরে না লাগে। অধিক ঠাণ্ডা বা গরমে শিশুর ডায়রিয়াজনিত রোগ দেখা দিতে পারে। সেদিকে সজাগ থাকতে হবে। কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় অধিক সময় বাইরে যেন শিশুরা খেলাধুলা না করে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এ সময় মাটি বা ফ্লোরের ঠাণ্ডা হতে রক্ষার জন্য শিশুকে সব সময জুতা/মোজা পরিয়ে রাখতে হবে।
কোনোভাবেই খালি পায়ে হাটা চলা করতে দেওয়া যাবে না। শিশুর গোসলের পানি অবশ্যই গরম করে নিতে হবে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন তা শরীরের জন্য সহনীয় হয়। প্রয়োজনে গরম পানির সাথে ঠাণ্ডা পানি মিশিয়ে তাপমাত্রা স্বাভাবিক করে নিতে হবে। গ্রামাঞ্চলের অনেকে এ সময আগুন পোহাতে অভ্যস্ত। নিজেরা আগুন পোহানোর সময় শিশুর প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে, যেন কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে। তবে শিশুদেরকে আগুন থেকে দূরে রাখাই নিরাপদ।
শীতকালে শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে ত্বক শুষ্ক হয়ে বিশেষ করে হাত, পা, ঠোঁট ও শরীরের বিভিন্ন স্থানের নরম অংশের ত্বক ফেটে যেতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবারই লোশন বা পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করা উচিৎ। অনেকে শীতের মৌসুমে সরিষার তেল ব্যবহার করে থাকেন। ত্বকের যত্নে বিশেষ করে শিশুকে ঠাণ্ডার হাত থেকে রক্ষা করতে এটা যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া এ সময় কতিপয় ভিটামিনের অভাবজিনত রোগ দেখা দিতে পারে। যেমন: মুখে ঘা, স্কার্ভি বা বেরিবেরি রোগ শীতের শেষদিকে দেখা যায়। এজন্য শিশুকে প্রয়োজনীয় ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার দেওয়া উচিত। বিশেষ করে ভিটামিন বি ও সি সমৃদ্ধ খাবার শীতকালে বেশি পরিমাণে খাওয়ানো উচিৎ।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস করতে সম্ভব সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। শিশুমৃত্যুর হার হ্রাসে সহস্রারাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০১৫ সালের মধ্যে সফলভাবে অর্জনের ধারাবাহিকতায় ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার এ লক্ষ্য অর্জনেও সম্ভব সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি শিশুকে বিনামূল্যে অতি প্রয়োজনীয় সকল টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবজনিত অন্ধত্ব রোধ করতে প্রতি ছয় মাস অন্তর ০-৫ বছর বয়সি সকল শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাপসুল খাওয়ানো হচ্ছে।
মা ও শিশুর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সারাদেশে চৌদ্দ হাজারেরও বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়েছে। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য পরিচর্যায় সমাজের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রচারণা চালাচ্ছে সরকার। এক কথায় বলতে গেলে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস করতে সরকার সম্ভব সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কিন্তু সরকারের প্রচষ্টোর সাথে সাথে আমরা নিজেরা যদি সচেতন না হই, শিশুর যত্নে আমরা যদি সচেষ্ট না হই তাহলে এই প্রচেষ্টা সফল করা সম্ভব নয়। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সর্বাগ্রে প্রয়োজন পরিবারের সবার সচেতনতা ও কার্যকর ব্যবস্থা। এক্ষেত্রে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ সহায়ক ভূমিকা পালন করবে কিন্তু মূল দায়িত্ব পালন করতে হবে পরিবারকেই।
আর শিশুর যত্নে মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। একজন সচেতন মা’ই পারেন শিশুকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখতে। শীতে শিশুকে ঠাণ্ডা জনিত অসুস্থতা হতে রক্ষা করতে হলে তাই পরিবারের অন্যদের সাথে শিশুর মাকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
লেখক : কলামিস্ট


