শুধু শরীক হতে চাই আকাবিরের সেই মিছিলে
মাওলানা আমিনুল ইসলাম : এই বাণীটি আমার শায়েখ আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেবের। আশির দশকের শেষের দিক থেকে এই বাণীটি শুনে আসছি। এই স্লোগানটি বহুবার আমি ফেস্টুনে লিখেছি। আমার মাদ্রাসায় যত প্রোগ্রাম হয়, ওয়াজ মাহফিল, সেমিনারসহ সকল অনুষ্ঠানে ফেস্টুনে, প্ল্যাকার্ড এ এটা লেখা থাকে।
ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেবের এই স্লোগানটি অসম্ভব ভাল লাগে আমার কাছে। আমি এটার মর্ম বুঝতাম না। তারপরেও লিখে টাঙিয়ে রাখতাম। এখন কিছুটা বুঝে আসে। আকাবির আছলাফের মিছিলে তিনি শরীক হওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। তাঁর এই বানী, তাঁর এই স্লোগান স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হওয়া চাই।
‘শুধু শরীক হতে চাই আকাবিরের সেই মিছিলে’ আল্লামা মাসউদ সাহেবের সেই আশির দশকের কথা। তখন কিন্তু বর্তমান সময়ের মত এত ফিতনা ছিল না।বিশেষ করে “লা- মাজহাবী এবং ইসলামের নাম ভাঙিয়ে ডিজিটাল মৌলভী সাহেবদের দৌরাত্মা এত চোখে পড়ত না। হাল জামানার মত এরকম সব জ্যান্তা হুজুরদের এত বাড়াবাড়ি চোখে পড়ত না। আকাবির আছলাফের মত পথকে তোয়াক্কা করে নিজের পন্ডিতি জাহির করার মত লোক কম ছিল।
ঠিক সেই সময়ে বলে ছিলেন, শুধু শরীক হতে চাই আকাবিরের সেই মিছিলে।
আমরা তখন ফরীদ সাহেবের কথা বুঝি নাই। অনেকের কাছে হাস্যকর মনে হয়েছে। আবার কেউ তো বলেছেন, আমরা তো আকাবির আছলাফের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছি, তবে এ বাণী কেন হাইলাইট করতে হবে?
বন্ধু, বর্তমান সময়ে যে ভাবে চতুর্মুখী ফেতনা শুরু হয়েছে। তাতে ফরীদ সাহেবের এই বাণী বারবার আমাদের নাড়া দিচ্ছে। বারবার স্মরণ করে দেয় তাঁর এই স্লোগান।
ফেতনার শেষ নেই। বিশেষ করে ওলামায়ে কেরাম ও সাধারণ দ্বীনদ্বার মানুষকে গ্রাস করার জন্য হণ্য হয়ে ছুটছে বাতিল শক্তি। টিভি খুলবেন, সেখানে মডারেট ইসলামের আহবান, সেমিনারে যাবেন, সেখানে গায়রে মুকাল্লেদ বানানোর ফতুয়া, পত্রিকা, ম্যাগাজিন, ফেসবুকের কলাম সহ বিভিন্ন লিখনীতে আকাবির আছলাফের শানে বিষোদগার। মুসলমানদের সহী পথ থেকে সরানোর চক্রান্ত। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের পথ থেকে বিচ্যুতি ঘটিয়ে বিপথে নেওয়ার অপকৌশল।
আমাদের আকাবির আছলাফগণ কোন বক্র পথে চলেননি। ওলামায়ে দেওবন্দ তারা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের দৃষ্টিভঙ্গি বহনকারী এক জামাত। আমাদের আকাবির আছলাফ যে পথে চলেছেন, আমরাও সে পথের অনুসারী। তাঁরা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছেন। আমরাও সে পথের পথিক।
এর বাইরে কিন্তু কিছু নয়। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের দৃষ্টিভঙ্গি লালন করি আমরা।
এখন কিন্তু আকাবির আছলাফের পথকে অনুসরণ না করে নিজের পাণ্ডিত্ব জাহির করছেন অনেকে। নিজেকে বড় গবেষক ভাবছেন। নিজেকে বড় মুজতাহিদ মনে করে বসে আছেন। আর এতেই সমস্যা বাড়ছে। ফেতনা বাড়ছে। সমাজে অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে।
এক শ্রেণীর পণ্ডিত আবিষ্কার হয়েছে আমাদের দেশে। ওরা আকাবির আছলাফ থেকে কুরআন হাদীস বেশী বোঝার চেষ্টা করে। আর এই বেশী বুঝতে গিয়ে সমাজে ফেতনা উস্কে দেয় তারা। বিভিন্ন ধরনের সমস্যা ঘটে যাচ্ছে সমাজে।
ইসলামের নামে সন্ত্রাস- জঙ্গীবাদ আবিস্কার হচ্ছে। জিহাদ আর সন্ত্রাসকে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। এর এক মাত্র কারণ নিজে নিজে ইসলাম বুঝতে যাওয়া। কাউকে পরোয়া না করা। আকাবির আছলাফের মত পথকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো।
যারাই আকাবিরের মত পথকে পাশ কেটে নিজের মত করে ইসলাম বুঝতে চেয়েছে। পা ফসকে গেছে তাদের। গোমরাহীর দিকে ধাবিত হয়েছে তারা। তার অনুসারীগণও গোমরাহীতে নিমজ্জিত।
এজন্য ওলামায়ে দেওবন্দ তাদের মুরুব্বীদের বাতলানো রাস্তা, অর্থাৎ যে রাস্তা ” মা আনা আলাইহি ওয়া আসহাবি এর উপর কায়েম। সেই রাস্তায় চলার চেষ্টা করে। এবং সেই রাস্তা ছাড়া অন্য রাস্তাকে বর্জন করে চলে।
আর আকাবির আসলাফের বাতলানো রাস্তায় চললে গোমরাহ হয়ে যাওয়ার আশংকা মনে হয় না। এই কারণে ফরীদ সাহেবের অভিপ্রায়, শুধু শরীক হতে চাই আকাবিরের সেই মিছিলে।
ইয়াং কিছু আলেম আবিষ্কার হয়েছে ইদানীং। ওরাতো নিজেরাই এখন সব জান্তা। কোন আকাবির মানেন না। কোন মুরুব্বী তাদের নেই। নিজেরাই এখন বড় গবেষক। অনলাইন তাদের বড় হাতিয়ার। টার্গেট হক্কানী আলেম-পীর মাশায়েখ।
ওরা এখন কলম চালাচ্ছে আলেমদের বিরুদ্ধে। হক্কানী পীর মাশায়েখদের শানে। ফেতনার বিষ- বাষ্প ছড়াচ্ছে সর্বত্র। ওরা নবীন আলেমদের বেশী টার্গেট করে। বিভিন্ন মুখরোচক কথা দিয়ে ভুলিয়ে দলে ভেড়ানো হচ্ছে তাদের। ওদের কাজই আলেমদের ছিদ্রান্বেষণ।
আমাদের কওমীর সন্তানদের এই বিপদগামীতা বারবার মনে হচ্ছে, ফরীদ মাসঊদ সাহেবের স্লোগান, শুধু শরীক হতে চাই আকাবিরের সেই মিছিলে। আল্লাহ তায়ালা আমার প্রিয় শায়েখ আল্লামা ফরীদ উদ্দিন মাসউদকে নেক হায়াত দান করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক ও সমাজ বিশ্লেষক


