শূন্যেরও নিচে দরপতন হল যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম

শূন্যেরও নিচে দরপতন হল যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : করোনাভাইরাস উদ্ভূত পরিস্থতিতে গোটা বিশ্বের অবস্থা কাহিল। প্রাদুর্ভাবে সারাবিশ্বই স্থবির। আড়াইশ কোটি মানুষ ঘরবন্দি হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। জরুরি পরিবহন ছাড়া যান চলাচলও বন্ধ। এ অবস্থায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদা এতই কমেছে যে দাম গিয়ে ঠেকেছে শূন্যেরও নিচে।

সোমবার (২০ এপ্রিল) ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এতটা দরপতন হলো অপরিশোধিত তেলের। ওই দিন এক ব্যারেল (প্রায় ১৫৯ লিটার) অপরিশোধিত তেল বিক্রি হয়েছে মাইনাস ৩৭ দশমিক ৬৩ ডলারে। অবশ্য মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সেই হতাশা সামান্য কিছুটা কাটিয়ে উঠেছে। এ দিন অপরিশোধিত তেলের দাম মাইনাস ১ ডলার পর্যন্ত উঠেছে।

সাধারণত এক মাস পরের বাজারে তেলের দাম কত হবে তা ঠিক করে ডব্লিউটিআই ফিউচার্স। অর্থাৎ মে মাসে তেলের দাম কত হবে তা ঠিক করা হয় এপ্রিলেই। আগামী মাসের জন্য দর ঠিক করার মেয়াদ শেষ হচ্ছে আজ মঙ্গলবার। যদিও ডব্লিউটিআই ফিউচার্সে জুন মাসে ব্যারেল প্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম ২০ দশমিক ৪৩ ডলার ও জুলাই মাসে ২৬ দশমিক ১৮ ডলার ধরা হয়েছে।

অপরিশোধিত তেলের দামের এই ব্যাপক পতনের কারণ হিসাবে করোনাকেই দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদরা। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনা রুখতে অনেক দেশই লকডাউনের পথে হেঁটেছে। তার ফলে তেলের চাহিদাও প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। বন্ধ আন্তর্জাতিক ফ্লাইটও। দাম তলানিতে নেমে যাচ্ছে দেখে, ১০ শতাংশ তেলের উৎপাদন কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় অর্গানাইজেশন অব পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ (ওপেক)-এর সদস্য এবং মিত্র দেশগুলো। কিন্তু তাতেও পতন ঠেকানো যায়নি।

মার্কিন মুলুকে তেলের দামের এই ঐতিহাসিক পতনকে দেখে দক্ষিণ এশিয়ায় পরিস্থিতি কী হতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে এই পতনের তেমন একটা প্রভাব পড়বে না। তার কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ওঠানামা করলেও, তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে দেশে খুচরো বিক্রির ক্ষেত্রে খুব কম সময়েই দাম কমানো হয়। এর আগে ২০১৫ সালে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম পৌঁছেছিল ২৮ ডলার। কিন্তু তার প্রভাব বাজারে তেমন একটা পড়েনি।

এর আগেই সৌদি-রুশ মূল্যযুদ্ধে নতুন করে ধাক্কা খায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজার। ওই সময় জ্বালানি পণ্যটির দাম ব্যারেলপ্রতি ৫০ ডলারের কাছাকাছি ছিল। পরবর্তী সময়ে দাম কমতে কমতে তা ব্যারেলে ২০ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে। একদিকে নভেল করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারী, অন্যদিকে জ্বালানি তেলের রেকর্ড দরপতন—এ দুইয়ের জের ধরে জ্বালানি পণ্যটির রফতানিকারকরা বিপদে পড়েন।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ওপেক-নন ওপেক দেশগুলোকে চাপ দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন ট্রাম্প। মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রহে ওপেক-নন ওপেক দেশগুলো জ্বালানি তেলের সম্মিলিত উত্তোলন কমিয়ে আনতে ঐতিহাসিক চুক্তি করে।

এ চুক্তিতে বলা হয়েছে, অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের রেকর্ড দরপতনের লাগাম টানতে এবং মূল্যযুদ্ধ নিরসনে ওপেক-নন ওপেক দেশগুলো জ্বালানি পণ্যটির সম্মিলিত বৈশ্বিক উত্তোলন দৈনিক গড়ে ৯৭ লাখ ব্যারেল কমিয়ে আনবে। এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহ ২০ শতাংশ কমে আসবে। ওপেকের ইতিহাসে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো আগে কখনই অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন এতটা কমায়নি। আগামী ১ মে থেকে নজিরবিহীন এ চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

সৌদি আরব, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সই হওয়া এ চুক্তি অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করেছিলেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তবে এখনো এর দৃশ্যমান কোনো ফলাফল চোখে পড়েনি। বরং জ্বালানি তেলের দাম কমে ইতিহাসের সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমেছে।

এ বিষয়ে সিডনিভিত্তিক পণ্যবাজারবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সিএমসি মার্কেটসের জ্যেষ্ঠ বাজার কৌশলবিদ মাইকেল ম্যাকার্থি বলেন, ওপেক-নন ওপেকের উদ্যোগ এখনো বাজারে প্রভাব ফেলতে পারেনি। বরং নভেল করোনাভাইরাসের কারণে চাহিদায় রেকর্ড পতন জ্বালানি তেলের দাম আরো কমিয়ে দিয়েছে।

তিনি জানান, ২০০৯ সালের পর থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। তবে ২০১৭ সাল থেকে চাহিদা প্রবৃদ্ধি অনেকটাই কমে এসেছে। চলতি বছর বৈশ্বিক মহামারীর কারণে জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদা ও চাহিদা প্রবৃদ্ধি—দুটোই ঋণাত্মক হতে পারে। মূলত এ চ্যালেঞ্জ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের রেকর্ড দরপতনের পেছনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *