পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : মানুষ মানুষের জন্য, ধর্ম মানুষকে বিভেদ শেখায় না, শেখায় মানবাতা উদারতা, তাইতো যখন কেউ বিপদে উপনিত হয় তখন সকলে ছুটে আসে ধর্ম, বর্ণ, গোত্রের ঊর্ধ্বে থেকে। আর ইসলামতো মানবতায় এগিয়ে সবচে বেশি, তার উজ্জ্বল প্রমান মিললো এইতো সেদিন নদীয়ার নাকাশিপাড়ার চ্যাঙা গ্রামে।
সাধারনত মুসলিম পাড়া-পড়শির ইন্তেকাল হলে সকলেই দেখতে আসে শান্তনা দেয় খোঁজ নেয়, দাফন কাফনের বিষয়াদিতে দৌড়ে সাহায্য সহযোগিতা করে, খাবার-দাবারের বন্দবস্ত করে। কিন্তু যেখানে হিন্দু মুসলিম একসাথ বাসকরে সেখানে মুসলমানদের কি তাদের পাড়াপ্রতিবেশির ব্যাপারে কোনো দায়দায়িত্ব থাকবেনা? নাদীয়ার চ্যাঙা গ্রামে গোটা গাঁয়ে মোটে দু’ঘর হিন্দু বসতি, বাকি সকলেই মুসলিম। শেষ যাত্রায় কাঁধে নিয়ে শ্মশানে যাবার লোকোনেই সেখানে, এসময়ে যদি কোনো হিন্দু লোকের মৃত্যু হয় তখন কী করবে মুসলিম!
এমনি এক ঘটনার সূত্রপাত, ভ্যানচালক অসীম হাজরার তার গ্রামেরবাড়ি নদীয়ার নাকাশিপাড়ার চ্যাঙায়, দীর্ঘদিন ধরেই শ্বাসকষ্ট ও কিডনির রোগে ভুগছিলেন ছাপান্ন বছর বয়সী অসীম হাজরা। গত শুক্রবার (২৯ মার্চ) দুপুরে সকল কষ্ট যন্যন্ত্রণার বলয় থেকে মুক্তি নিয়ে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগকরে চলে যান। টানাটানির সংসার, স্বজনদের মাঝে রেখে গেছেন দুই ছেলে ও পত্নীকে, ছেলেরাও ভ্যান চালান অস্বচ্ছল সংসার, দিন আনে দিন খায়। ভ্যান চালান অসীমের ভাই কাজল হাজরাও। দীর্ঘ দিনের অসুস্থতায় রেখে যেতে পারেননি তেমন কোনো সম্বলও পরিবার পরিজনদের জন্য। কিন্তু তাই বলেকি এভাবেই শব রেখে দেয়া যায়? কী ভাবে কী হবে সেই চিন্তায় স্বজন হারানোর ব্যথা ভুলে তাঁরা দিশেহারা। কাঁধে নেয়ার লোকতো নেইই তার উপর খাট, ফুল, নতুন সাদা চাদর, টেম্পোর ভাড়া এতসব তাঁরা পাবে কোথায়?
তখন নদীয়ার নাকাশিপাড়ার চ্যাঙা গ্রামের মুসলমান যুবকেরা তাঁদের কাছে এগিয়ে আসে। তাঁরা বললো চিন্তার কিছু নেই সেতো আমাদেরই একজন, আমাদেরই সাথে ছিলো এতোটা কাল। আপনাদের এনিয়ে কিছু ভাবতে হবে না, সবকিছুর ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মসজিদের মাইকে সকলকে জানিয়ে দেয়া হয়, অসীম হাজরার মৃতের সংবাদ, অন্য মুসলমানদের মৃত্যু সংবাদ যে ভাবে জানানো হয়। চাদা তুলে মুসলিম বাসিন্দারাই খাট-ফুলের বন্দোবস্ত করে হবিষ্যি করার জন্য, তোলা হয় চাল পরিবারপরিজনদের জন্য। বাঁশের মাচায় মৃতদেহ নিয়ে টেম্পোয় তুলে পাটুলি ঘাটে নিয়ে যান মুসলিম গ্রামবাসীরাই। সেখানেই করাহয় শবদাহ, যদিও মুখাগ্নি করেছেন অসীমের ছেলেরাই, কিন্তু চিতার আগুন নেভা পর্যন্ত ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে সকল সাহায্যই করেছেন সেখানের মুসলমানেরা। এই ঘটনার সাথে বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য শান্তি সম্প্রীতির পুনর্জাগরণ যেনো গড়ে তুললো মুসলমানরা।
নিছক গাঁয়ের লোকের স্বাভাবিক দায়িত্ববোধের মানসিকতার থেকেই হয়তো করেছেন এই কাজ। কিন্তু এমন এক সময়ে করেছেন, যখন উগ্র ধর্মীয় প্রচারের জেরে ‘স্বাভাবিক’ ছবিগুলো দিনে দিনে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
অসীমের ভাই কাজল বলেন, ‘দাদার মৃত্যুর পরে আমরা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলাম। গাঁয়ের মুসলিম ভাইয়েরা এগিয়ে না এলে কী করে সব কিছু করতাম, তা যেনো ভাবতেও পারছিনা।
গ্রন্থনা : হানজালা ফিদা


