দাম্পত্যসঙ্গীর অধিকার
মাহতাব উদ্দীন নোমান : ইসলাম একটি সর্বজনীন ধর্ম। দুনিয়াতে মানুষের জন্মগ্রহণ থেকে মৃত্যুবরণ পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ের সহজ ও উপকারী সমাধান ইসলাম দিয়েছে। ব্যক্তিগত থেকে পারিবারিক, সামাজিক থেকে রাষ্ট্রীয় সব বিষয়ের দিক নির্দেশনা এখানে রয়েছে। শুধু বিধিনিষেধ দিয়েই ইসলাম থেমে যায়নি, বরং তা বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছে।
আমাদের সমাজে পরকীয়ার মত জঘন্য সমস্যার সমাধানও ইসলামে রয়েছে।
কিন্তু কেন এই পরকীয়া?
পরকীয়ার ঘটনাগুলো গভীরভাবে অনুসন্ধান করলে এর কারণ হিসাবে ৩ টি বিষয় পরিলক্ষিত হয়।
১. স্বামী স্ত্রী একজন অপরজনের অধিকার আদায় করে না
২. স্বামী চোখের হেফাজত করে না, স্ত্রী পর্দা করে না
৩. স্বামী স্ত্রীর মধ্যে আল্লাহর ভয় নেই
এই ৩ টি বিষয় সংশোধন করতে পারলে এই সমস্যার সমাধান সহজ হবে।
আজ ১ম পর্বে আমরা আলোচনা করবো ইসলামে দাম্পত্যসঙ্গীর অধিকার নিয়ে।
ইতিহাস সাক্ষী, প্রাক-ইসলামী যুগে নারীর কোন অধিকার ছিল না। নারীকে শুধু ভোগ্যপণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হতো। নিজের স্ত্রীদের অধিকার আদায় তো দূরের কথা, তাদের সাথে দাসীর মত আচরন করা হতো। এমনকি তাদের ভরণপোষণ, বাসস্থান, মহর, উত্তরাধিকারীর মতো মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত রাখা হতো। নারী জাতি ছিল তখন চরম অসহায়। কিন্তু ইসলাম স্ত্রীকে তার আপন মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। তাদের সাথে খারাপ আচারণ এবং তাদের উপর জুলুম করা থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। নারীকে বানিয়েছে ঘরের রানী। স্ত্রীকে বানিয়েছে স্বামীর জীবন সঙ্গিনী, সম্পূরক ও সৌন্দর্যের ভূষণ। দাম্পত্য জীবনে স্ত্রীর উপর স্বামীর যেমন অধিকার রয়েছে তেমনি স্বামীর উপরও স্ত্রীর হক বা অধিকার রয়েছে। কুরআন কারীমে ইরশাদ হচ্ছে,
“আর স্বামীদের প্রতি স্ত্রীদেরও অনুরূপ অধিকার আছে যেমন নারীদের প্রতি স্বামীর অধিকার আছে।” (সূরা বাকারা, আয়াত : ২২৮)
ইসলাম স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার ও কর্তব্য সমূহের ব্যাপারে যে পথ নির্দেশনা দিয়েছে, সেগুলোর বিশেষ উদ্দেশ্য এটাই যে, এ সম্পর্ক উভয়ের জন্য খুব মধুময়, আনন্দদায়ক ও শান্তির কারণ হবে এবং একজন অপরজনকে মায়া, মোহাব্বত ও ভালোবাসা দিয়ে জড়িয়ে রাখবে।
আল্লাহ তাআলা স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসা তাঁর অনুগ্রহ ও নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করে ইরশাদ করেছেন,
“এবং আল্লাহ তাআলার অন্যতম নিদর্শন হল, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদেরই মধ্য হতে তোমাদের স্ত্রীদেরকে সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো এবং তিনি তোমাদের পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা ও সহানুভূতির সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।” (সূরা রুম, আয়াত : ২১)
তাফসীরবিদগণ বলেন, আলোচ্য আয়াতে দাম্পত্য জীবনের ব্যাপারে তিনটি বিষয়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
এক.
পুরুষদের বলা হয়েছে যে তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের স্বগোত্রীয়। তাদের সৃজনে এবং জীবন-যাপনে তারা তোমাদেরই অনুরূপ। চিন্তা-চেতনায় আশা-আকাঙ্ক্ষায় তারা তোমাদেরই ন্যায়। অর্থাৎ যেভাবে তোমাদের মনের গহীনে অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা, অনেক চাওয়া-পাওয়া থাকে যা তোমরা তাদের নিকট থেকে পেতে চাও, ঠিক তেমনি তারাও তোমাদের নিকট অনেক কিছু আশা করে। অনেক কিছু পেতে চায়। সুতরাং তোমরা তাদের আবেগ, অনুভূতি, ভালোবাসা, চাওয়া-পাওয়ার প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখবে।
দুই.
স্ত্রীদের বলা হয়েছে যে, তোমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে যেন তোমরা তোমাদের স্বামীর শান্তি ও সান্তনার কারণ হতে পারো। তাদের সুখ-দুঃখের সাথী হতে পারো। তারা যেন তোমার কাছে এসে প্রশান্তি লাভ করে। তাদেরকে সুখ, শান্তি এবং আনন্দ দেওয়ার জন্য তুমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
তিন.
তোমাদের সম্পর্কের ভিত্তি হবে পরস্পর ভালোবাসা, আকর্ষণ, আন্তরিকতা, সহযোগিতা ও সহমর্মিতা। কেমন যেন একজন আরেকজনের সম্পূরক। এ ভিত্তি যত সুদৃঢ় হবে দাম্পত্য জীবন সার্থক হবে। (তাফসীরে নূরুল কুরআন, খন্ড : ২১, পৃষ্ঠা : ৮২)
দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সহানুভূতি ও ভালবাসাকে আরো সুদৃঢ় করার জন্য আল্লাহ রব্বুল আলামীন কুরআনে একজনকে অপরজনের সৌন্দর্যের ভূষণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ইরশাদ করেছেন,
“স্ত্রীগণ হলো তোমাদের ভূষণ আর তোমরা হলে তাদের ভূষণ।” (সূরা বাকারা, আয়াত : ১৮৭)
দাম্পত্য জীবনে পরস্পরে মান-অভিমান ঝগড়া-রাগ হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তখনও ইসলাম স্বামীদেরকে তাদের স্ত্রীর সাথে ভালো ব্যবহারের নির্দেশ দেয়। জাহেলী যুগের ন্যায় তাদের সঙ্গে অমানুষিক ব্যবহার করা যাবে না। বরং তাদের অধিকারগুলো যথাযথ আদায় করতে হবে। স্বামী যদি স্ত্রীর কোনো অভ্যাস বা আচরণে কষ্ট পায় তাহলে ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে। হতে পারে যে, এই স্ত্রীর মধ্যেই আল্লাহপাক তার জন্য প্রভূত কল্যাণ নিহিত রেখেছেন। ইরশাদ হচ্ছে,
“এবং তোমরা তাদের সাথে সৎ ভাবে জীবনযাপন কর। যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ করো তবে এমনও হতে পারে যে তোমরা যাকে অপছন্দ করো আল্লাহ পাক তাতেই রেখেছেন তোমাদের জন্য প্রভূত কল্যাণ।” (সূরা নিসা, আয়াত : ১৯)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “কোন ঈমানদার স্বামী তার ঈমানদার স্ত্রীকে ঘৃণা করতে পারে না। সে যদি তার একটি আচরণকে অপছন্দ করে তাহলে অন্য একটি আচরণ তার পছন্দনীয় হবে।” (মুসলিম, হাদীস : ২৬৭২)
স্ত্রী সাথে উত্তম আচরণই স্বামীর ভালো ও উত্তম হওয়ার মাপকাঠি। স্ত্রীর সাথে যার আচরণ অত্যন্ত আন্তরিক ও হৃদ্যতাপূর্ণ হবে, সেই সবচেয়ে উত্তম স্বামী। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম। আর আমি আমার স্ত্রীদের কাছে খুবই উত্তম।” (তিরমিযী, হাদীস : ৩৮৯৫)
ঠিক তেমনি ভাবে স্বামীর অনুগত হওয়া, তাকে খুশি করা এবং তার অনুপস্থিতিতে তার আমানত সমূহ হেফাজত করা একজন আদর্শ স্ত্রী হওয়ার জন্য মাপকাঠি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “মুমিন ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার তাকওয়া অর্জনের পরে একমাত্র আদর্শ স্ত্রীর থেকেই বেশি কল্যাণ অর্জন করতে পারে। যখন স্বামী তাকে আদেশ করবে স্ত্রী তা পালন করবে। যখন স্বামী তার দিকে তাকাবে স্ত্রী তাকে খুশি করে দিবে। স্বামী তার উপর কসম খেলে স্ত্রী সেটা পূরণ করবে। স্বামী যখন অনুপস্থিত থাকবে তখন স্ত্রী স্বামী এবং তার মালের বিষয়ে কল্যাণ কামনা করবে।” (ইবনে মাজাহ, হাদীস : ১৮৫৭)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বামীদেরকে নিজেদের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা স্ত্রীদের উপর বেপরোয়াভাবে প্রয়োগ করতে কঠিন ভাবে নিষেধ করেছেন।
হযরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজের ভাষণে এ কথা বলেছিলেন, “হে লোকসকল! তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। কেননা তোমরা তাদেরকে আল্লাহর নিরাপত্তার সাথে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর কালেমা দ্বারা তোমরা তাদেরকে বৈধ করেছ। তাদের উপর তোমাদের এ দাবি রয়েছে যে, তোমরা নিজেদের ঘরে যাদের আনাগোনা কে অপছন্দ করো, তারা যেন তাদেরকে সেখানে আসার সুযোগ না দেয়। এরপরও যদি তারা এমনটি করে ফেলে তাহলে (সতর্ক ও সংশোধনের জন্য) তাদেরকে সাজা দিতে পারো, তবে এ সাজা যেন গুরুতর না হয়। আর তোমাদের উপর তাদের অধিকার হচ্ছে, ন্যায়সঙ্গত ভাবে তাদের ভরণপোষণ এর ব্যবস্থা করা।” (মুসলিম হাদীস : ২১৩৭)
স্ত্রীর ভুল হলে তা উপেক্ষা করবে
স্বামী-স্ত্রীর অধিকার এর ব্যাপারে ইসলামের শিক্ষা ও দিকনির্দেশনার সারকথা এই যে, স্ত্রীর জন্য উচিত, সে তার স্বামীকে নিজের জন্য অন্যসবার চেয়ে ঊর্ধ্বে মনে করবে। তার বিশ্বস্ত ও অনুগত হয়ে থাকবে। তার কল্যাণকামিতা ও সন্তুষ্টি অর্জনে ক্রুটি করবে না। নিজের দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ তার সন্তুষ্টি সাথে সম্পৃক্ত মনে করবে। পক্ষান্তরে স্বামীর উচিত, সে নিজের স্ত্রীকে আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামত মনে করবে। তার যথাযথ মূল্যায়ন করবে। তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে। তাকে ভালোবাসা দান করবে। যদি তার কোন ভুল হয়ে যায়, তাহলে সেটা উপেক্ষা করে যাবে। ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে তার সংশোধনের চেষ্টা করবে। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তার বিভিন্ন প্রয়োজন সুন্দরভাবে পূরণ করবে এবং তার আরাম ও মনোরঞ্জনের চেষ্টা করবে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের প্রত্যেক স্বামী-স্ত্রীকে নিজেদের দাম্পত্যজীবনে ইসলামের অনুশাসন ও দিকনির্দেশনা মেনে চলার তৌফিক দান করুন। আমাদের প্রত্যেকের পারিবারিক জীবনকে সুন্দর এবং আনন্দদায়ক বানিয়ে দিন। আমাদের সমাজকে পরকীয়া এবং এর সকল প্রকার অনিষ্টতা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
আগামীকালঃ সংযমী পুরুষ | সমাজ বিধ্বসংসী পরকীয়াঃ সমাধানে ইসলামী ভাবনা ২য় পর্ব
লেখকঃ শিক্ষক ও খতীব
আরও পড়ুনঃ মাদক বিরোধী আদর্শে ইসলাম | ২য় পর্ব


