সময়চিন্তা । মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন

সময়চিন্তা । মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন

সময়চিন্তা । মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন

করোনার শিক্ষা

যখন কোনো মহামারি আসে তখন তা ক্ষতি করার পাশাপাশি অনেক শিক্ষাও দিয়ে যায়। সব মহামারিরই শেষ আছে। তবে তার শিক্ষাটি থেকে যায়। পুর্জিনির্ভর অর্থনীতি মুনাফাই চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত হলেও জীবন সেখানে বিপন্ন। পৃথিবীর ১০ শতাংশ মানুষের হাতে ৯০ শতাংশ সম্পদ থাকলেও চূড়ান্ত মানুষেরা নিরাপদ নয়। সবচেয়ে বড়ো যে শিক্ষা করোনাকাল শেখাল,তা হচ্ছে বৈষম্যের অবসান।

চীনের উহান শহর থেকে NOVEL CORONA VIRUS (NCov-19), বা সার্স-কোভ-২ (SARS-Cov-2)” নামক ভাইরাসের উৎপত্তি হয় অক্টোবর-২০১৯, এর শেষ ভাগে, এরপর আস্তে আস্তে পৃথিবীর প্রায় সব দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এই ভাইরাসটি। এখন পর্যন্ত এক কোটির বেশি লোক আক্রান্ত হয়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। অল্প সময়ের মধ্যে এই ভাইরাসটি আমাদের দেশেও হানা দিয়েছে। গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEEDCR) এর ভাষ্যমতে এ পর্যন্ত আক্রান্ত এক লাখ ৩৭ হাজার জনের উপরে এবং মৃত্যু হয়েছে এক হাজার ৭০০ জনের বেশি। প্রতিবছর উন্নয়নশীল দেশে, বিশেষ করে বাংলাদেশে ইনফ্লুয়েঁজা, নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ, এমন কি রোড এক্সিডেন্টে যে পরিমাণে লোক মারা যায় যা কিনা কোভিড-১৯ এর মৃত্যু হারের চেয়ে অনেক বেশি। এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বুয়েট) এর মতে প্রতিমাসে গড়ে ৯শ’র উপরে মানুষ বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। সুতরাং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বর্তমানে আমাদের ভেতরে একটি পরিবর্তনের আশার সঞ্চার করে, অন্ততপক্ষে বর্তমানে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ একটি ভাইরাস এবং তার সক্ষমতা সম্পর্কে উপযুক্ত ধারণা পেল।

এনকোভ-১৯, বৈশিষ্ট্য সম্বলিত ভাইরাস অতীতেও পৃথিবীতে এসেছিল। ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু মহামারি, (সংক্ষেপে- H1N1)নামে এক ধরনের ভাইরাস টানা দুই বছর, পৃথিবীতে বিরাজ করে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল। সে সময় প্রায় ৫০ মিলিয়ন লোক মারা গিয়ে ৫০০ মিলিয়নের মতো আক্রান্ত হয়েছিল। ব্লুমবার্গ ২৭ এপ্রিল, ২০২০ এক গবেষণায় দেখিয়েছে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ফলে বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাপক হারে নষ্ট হবে। যা কোনো সরকারি এর নেতিবাচক প্রভাব সামাল দিতে পারবে না। রিসার্চ প্রতিষ্ঠানটি গবেষণায় আরো দেখিয়েছে, বিশ্ব তৈল বাজার ২০০৮ সালের পরে সব চেয়ে কমে গেছে। কোভিড-১৯ এর প্রভাবে বৈষয়িক শেয়ারবাজারে দরপতন অব্যাহত শ্রমবাজারে লোকজনের চাকরি ছাটাই শুরু হয়ে গিয়েছে, ফলে লোকজন নতুন কাজ খোঁজা শুরু করেছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) দিয়েছে আরো ভয়ঙ্কর তথ্য, তাদের মতে বিশ্ব অর্থনীতি, চলতি বছরে ৩ শতাংশ হ্রাস পাবে, ফলে বৈশ্বিক, ১৯৩০ সালের সমভাবে মহামন্দার দেখা দিবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৩ ট্রিলিয়ন ডলার বেকার শ্রমিক এবং প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের সহায়তার জন্য বিল পাস করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন এটি যৎসামান্য হবে বিশ্ব অর্থনীতির ধর সামাল দিতে।

বৈশ্বিক অর্থনীতির নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশও পড়তে শুরু করেছে। গত বেশ কিছু বছর ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি শক্ত অবস্থানে রয়েছে এবং উপর্যপরি ম্যাজিক ফিগার ৮ শতাংশ এর আশেপাশে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে, এর ফলে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং কর্মসংস্থান মূলত এই বিষয়গুলো দুইটি কারণ কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। প্রথমত রেমিটেন্স এবং দ্বিতীয়ত তৈরি পোশাক শিল্প, যদিও তৈরি পোশাক শিল্পে ১৭০ মিলিয়ন মানুষের অভ্যন্তরাভিমুখে বিশাল একটি বাজার রয়েছে এবং এই বাজারে চাহিদাও ব্যাপক, আতঙ্কের বিষয় হলো কোভিড-১৯, মহামারির নেতিবাচক দিকগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। বিশ্বের ৩০ টি দেশ হতে বাংলাদেশী প্রবাসীরা গত অর্থবছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছে, যেটি বাংলাদেশের অর্থনীতির শিকড় আরো মজবুত করে চলেছে এবং রেমিটেন্স ছিল গত অর্থবছরের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। কিন্তু শঙ্কার বিষয় হলো চলতি অর্থবছরের রেমিটেন্স প্রবাহ গত বছরের তুলনায় ৩.১৪ শতাংশ কমে ১.৬৪৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অধিকন্তু বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য এবং অভ্যন্তরীণ ব্যয় অনুরূপভাবে ভোগে। বিষয়টি সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি আতঙ্কের বিষয়। ইতোমধ্যে তৈরি পোশাক খাতেও কোভিড-১৯ এর প্রভাবে আক্রান্ত। বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এর হিসেব মতে (মার্চ, ২০২০) প্রধান আমদানিকারক দেশগুলোর লকডাউন অবস্থা থাকার কারণে শুধু তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়েছে। এই ধরনের বাণিজ্য যদি আগামী ছয় মাস চলতে থাকে, তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব হবে দীর্ঘমেয়াদি নতুন কর্মসংস্থান তো হবেই না বরং চাকরিচ্যুত হবে বিভিন্ন পেশার লক্ষ লক্ষ মানুষ। আমাদের দেশে মাঝারি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জিডিপিতে কন্ট্রিবিউশন প্রায় ২২ শতাংশ, যেখানে পোশাকশিল্পের কন্ট্রিবিউশন ১২ শতাংশের মতো। এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) এর হিসেব মতে শুধু পোশাক খাতে বর্তমান অর্থবছর অনেকে চাকরি হারাবে।

দেশে করোনাভাইরাস ছোবলে আক্রান্ত প্রাইমারি থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পাঠ দান বিশেষ করে কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রায় পাঁচ কোটি শিক্ষার্থী। গত ১৭ মার্চ কার্যত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে আগষ্টের আগে এ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কোনো সম্ভাবনা নেই। করোনা পরিস্থিতিতে যারা তাদের শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করে, কর্মজীবনে ঢোকার জন্য অপেক্ষা করছে বা করতে যাচ্ছে, বিশেষ করে অপরিহার্য সার্টিফিকেট ও অন্যান্য কাগজপত্রের জন্য অপেক্ষা করছে, অনেকে উচ্চশিক্ষার স্কলারশিপ পেয়েছে, কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তারা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পাঠাতে ব্যর্থ হচ্ছে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম, ২০১৩ সালে এক আলোচনায় বর্তমান বিশ্বকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব এর সাথে তুলনা করেছে। অর্থাৎ ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সকল পর্যায়ে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হচ্ছে। উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশে বর্তমানে আমরা যা লক্ষ্য করছি। তারা এও বলেছেন আগামী ১০ বছরে বর্তমানে যে ধরনের চাকরি রয়েছে তার ৯০ শতাংশ থাকবে না। চাকরির বাজার যেহেতু ছোট হয়ে শিক্ষার্থীদেরকে এখন থেকেই বিশ্বায়নের সাথে সাথে নিজেদেরকে তৈরি করতে হবে। যুগের সাথে সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে হবে। প্রফেশনাল লাইফে সারভাইভ করার জন্য চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সময় হার্ড স্কিল এর প্রয়োজন হবে ২০ শতাংশ, যা আমরা পুঁথিগত পঠন পাঠন থেকে সহজেই অর্জন করতে পারি । আর বাকি ৮০ শতাংশ প্রয়োজন হবে, সফট স্কিল বা পার্সোনাল ডেভেলপমেন্ট প্রফেশনালিজম (পিডিপি) যা অর্জনের মধ্য দিয়ে আপনার প্রফেশনাল লাইফ কে, আপনি সহজেই নিয়ে যেতে পারেন উচ্চ স্তরে। কেনিয়ার রাজধানীর নাম মুখস্ত করে চাকরি পাওয়ার দিন শেষ হয়ে আসছে! অধিকন্তু এই ডিগ্রী ইনফ্লেশনের যুগে অবশ্যই যোগ্য ব্যক্তির চাকরি বা ব্যবসার অভাব হবে না।

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে সভ্যতার বিভিন্ন সময় করোনা ভাইরাস সদৃশ অনেক ভাইরাস আমাদের এই পৃথিবীতে এসেছে, আবার সেটি এক সময় চলেও গিয়েছে করোনাভাইরাস আমাদেরকে শিখিয়েছে প্রযুক্তির ব্যবহার, ব্যক্তিগত সর্তকতা, সুস্থতা, হাইজিন জীবন-যাপন, যার যার ধর্ম অনুসারে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ এই বিষয়গুলো এখন বাস্তবতা। বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে ঢুকে গেছে,সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনাভাইরাস এই সামগ্রিক পরিস্থিতিতে আমরা কতটুকু নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছি এবং নিজেদেরকে উন্নতি করছি এটাই এখন মুখ্য বিষয়। আশা করি আমরা এই চ্যালেঞ্জগুলো গ্রহণ করতে পারব।

করোনা ভাইরাসের এই দুঃসময়ে বিল গেটসের মতে, সংস্কৃতি, ধর্ম, পেশা, আর্থিক অবস্থা, খ্যাতি ইত্যাদির পরো আমরা সবাই সমান। ভাইরাস এই বিষয়টি আমাদের খুব ভালো করেই বুঝিয়েছে। যদি আপনি বিশ্বাস না করেন, তবে টম হ্যাঙ্কসকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। তার মতে, করোনা আমাদের দেখিয়েছে যে, আমরা সবাই একে অপরের সঙ্গে দারুণভাবে সম্পৃক্ত। জগতের সব কিছুই একটি বন্ধনে আবদ্ধ। সীমান্তরেখাগুলো আসলেই মিথ্যা। এগুলোর মূল্য কতো কম তা করোনা ভাইরাস বুঝিয়ে দিয়েছে।

বিশ্বের এই সেরা ধনকুবেরের মতে, এই মারণ ভাইরাস আসলে বুঝিয়ে দিয়েছে, জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত। যে কোনো সময় জীবনের ইতি টানতে হতে পারে। এই সংক্ষিপ্ত জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে বয়স্ক আর শিশুদের বেশি করে যত্ন নেওয়া। জীবন বাঁচাতে টয়লেট পেপার কিনে ঘর ভর্তি করাটাই জীবনের উদ্দেশ্য নয়। ভাইরাস স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, আমরা কতো স্বার্থপর। জড়বাদে বিশ্বাসী, ভোগবাদি আর বিলাসের সমাজই আমরা তৈরি করেছি। সঙ্কটময় মুহূর্তে বোঝা যায়- জীবনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো হচ্ছে, খাদ্য, পানি আর ওষুধ। দামি বাড়ি, গাড়ি আর পাঁচ তারকা রিসোর্ট নয়।

বিল গেটসের মতে, এই মারণ ভাইরাস করোনা দেখিয়ে দিয়েছে নিজের পরিবার আর আপন জনকে আমরা কতোটুকু অবহেলা করি। আমরা যখন নিজ থেকে ঘরে ফিরিনি, আপনজনদের সময় দেইনি; ভাইরাস জোর করেই আমাদের প্রিয়জনদের কাছে ফেরাল। প্রিয়জনদের সঙ্গে নতুন করে দৃঢ় সম্পর্ক তৈরি করার সুযোগ তৈরি করে দিল। আমাদের আসল কাজ শুধু চাকুরি করাই নয়। আমরা যা করি তার জন্যই আমাদেরকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়নি। আমাদের সৃষ্টির আসল কাজ হলো মানুষ মানুষের পাশে থাকা, পাশের মানুষকে রক্ষা করা।

সবাই ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ মেনে চলুন, ঘরে থাকুন, আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হোন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন, বিষোদগার কিংবা ঘৃণা-বিদ্বেষ না ছড়িয়ে বরং করোনা মোকাবিলায় যারা ফ্রন্টলাইনে আছেন তাদেরকে সমর্থন করুন, সহায়তা করুন। সর্বোপরি আপনার সুস্থতা আপনার কাছেই তাই নিজে বাঁচুন, পরিবার ও প্রতিবেশীকে বাঁচান। সুদিন আর বেশি দূরে নয়, করোনার বিরুদ্ধে মানুষের জয় হবেই ইনশাআল্লাহ। পিআইডি নিবন্ধ
২৬.০৮.২০২০

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *