সাইয়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) যখন কোয়ারেন্টাইন ক্যাম্পে
মাওলানা আমিনুল ইসলাম ❑ কুতুবুল আলম সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী (রহ.)-এর জীবনী পড়েছি বহুবার। সর্বপ্রথম মাদানী (রহ.)-এর জীবনী পড়েছিলাম, আমাদের আল্লামা ইসহাক ফরিদী (রহ.)-এর লেখা। এরপরেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জনের লিখনী পড়েছি। এখনো পর্যন্ত কোথাও যদি হুসাইন আহমাদ মাদানী (রহ.)-কে নিয়ে কোন প্রবন্ধ বা কোন বই হাতে পড়ে, সাথে সাথে লুফে নেওয়ার চেষ্টা করি।
বর্তমানে আল্লামা কাজি মুতাসিম বিল্লাহ (রহ.)-এর রচিত “বৈচিত্রের মাঝে ঐক্যের সুর” মাদানী (রহ.)-এর বৈচিত্রময় জীবন সস্পর্কে যে এক গ্রন্থ লিখেছেন। সেটা প্রায় সময় মুতালায়া করার চেষ্টা করি। বইয়ের দুটো খন্ডই আমার কাছে সংরক্ষিত। বেশ কয়েকবার পড়া হয়েছে।
কাজি মু’তাসিম বিল্লাহ সাহেবের লিখিত এই বইতে হযরত মাদানী (রহ.) যখন হজ্জব্রত পালনের উদ্দেশ্যে পুরো পরিবার সহ মক্কা-মদিনার সফর শুরু করেন, তখন তাদেরকে কোয়ারেন্টাইন ক্যাম্পে থাকতে হয়েছিল।
আমি যখন প্রথম বইটা পড়ি, তখন কোয়ারেন্টাইন ক্যাম্প কি জিনিস, তা বুঝি নাই। শুধু একজন পাঠকের মত পড়ে গিয়েছিলাম। এই তো সেদিন, আবার যখন পড়ছি, তখন এবার বুঝলাম কোয়ারেন্টাইন ক্যাম্প কি।
হযরত কাজি মু’তাসিম বিল্লাহ (রহ.) মাদানী সাহেবের “নকশে হায়াত”-এর উদ্বৃতি দিয়ে লিখেছেন, মাদানী পরিবারের ১২ জন সদস্য। অর্থাৎ মাদানী (রহ.)-এর পিতা-মাতা, ভাই-পাঁচ জন, এক বোন, এবং ওনাদের তিন ভাইয়ের স্ত্রী, মোট বারজনের এক কাফেলা হজ্জ এবং মদিনায় হিজরতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।
সেটা ১৮৯৮ সনের কথা। একদম বৃটিশ শাসন চলছিল এই ভারত বর্ষে। ঘটনাক্রমে সে বছর পশ্চিম এবং দক্ষিম ভারতে প্লেগ মহামারি দেখা যায়। আর এই মহামারীর দরুন, বোম্বে, করাচি, মোটকথা পশ্চিম এবং দক্ষিণ ভারতের কোথাও থেকে হজ্জ ওমরার এবং যাত্রী বাহী কোন জাহাজ ছাড়া বারণ করা হয়েছিল।
বর্তমানে যেমন করোনা ভাইরাসের কারণে ওমরার ফ্লাইট এবং যাত্রীবাহী কোন ফ্লাইট কোথাও যাচ্ছে না। ঠিক সে সময়ে এই অবস্থা হয়েছিল। তখন তো শুধু পানির জাহাজ ছিল। প্লেনে চলাচল শুরু হয়নি।
মাদানী (রহ.) তাঁর নকশে হায়াতে লিখেছেন, সে বছর সিদ্ধান্ত হলো, পুর্ব ভারত তথা বাংলাদেশ থেকে হজ্জের উদ্দেশ্যে জাহাজ ছাড়বে। তাই তাঁরা ইউপি থেকে ট্রেনে নৈহাটি, কোলকাতার শিয়ালদহ হয়ে বাংলাদেশের দর্শনা, রানাঘাট, গোয়ালন্দ পর্যন্ত আসেন। গোয়ালন্দ ঘাট থেকে ষ্টীমারে চাঁদপুর, এরপর চাঁদপুর থেকে চট্রগ্রামের পাহাতলী ষ্টেশনে পৌছান।
মাদানী (রহ.)-এর পরিবার যখন বাড়ী থেকে বের হয়ে এলাহাবাদ ষ্টেশনে আসেন, তখন সেখানে কোয়ারেন্টাইন ক্যাস্পে থাকতে হয়েছিল। কোয়ারেন্টাইনে থাকার কথা ছিল ১২ থেকে ১৪ দিন। কিন্তু তাদের আরো ৭/৮ দিন বেশী থাকতে হয়। অন্যান্য হাজি সাহেবগণ সকলেই না আসা পর্যন্ত আরো বেশিদিন থাকতে হয়েছিল। একেবারে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে কোয়ারেন্টাইন ক্যাস্পে তাদের থাকতে হয়ে ছিল। কারো সঙ্গে দেখা করা একদম নিষেধ ছিল। কড়া প্রহরার মধ্যেই তাদের থাকতে হয়েছিল।
মাদানী (রহ.) পরিবার যখন চট্রগ্রাম থেকে জাহাজে করে ১৭ দিন পরে এডেন বন্দর হয়ে কামরান বন্দরে পৌছান, সেখানেও তাদের কোয়ারেন্টাইন ক্যাম্পে থাকতে হয়েছে। কামরান বন্দরের কোয়ারেন্টান ক্যাম্পে বেশ কিছু দিন থাকার পরে, তাদের জাহাজ আবার জেদ্দার অভিমুখে রওয়ানা দেন।
তো যাই হোক, আমার মূল কথাটা হলো কোয়ারেন্টাইন নিয়ে। বর্তমান এই শব্দের সাথে আমাদের ব্যাপক পরিচিত ঘটেছে। এখন গ্রামের চাচাদের মুখেও শোভা পাচ্ছে এই শব্দটি। বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপি এখন এই শব্দের বহুল প্রচলন। সরকারের কর্তাগন আমাদেরকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলছেন। বিদেশ ফেরত ভাইদের নিজ বাড়ীতে হোম কোয়ারেন্টাইনে যেতে বলছেন, কিন্তু কে শোনে কার কথা?
বর্তমানের এই মহামারি থেকে বাঁচার জন্য জরুরী আল্লাহর উপর তায়াক্কুল এবং সেই সাথে সতর্কতা। দুনিয়াবী আছবাব গ্রহণ করতে হবে। রাষ্ট্রের নিয়ম মেনে চলতে হবে। সরকার যে পরামর্শ দিচ্ছেন, সেটার প্রতি আন্তরিক হতে হবে সকলের।
দেখুন! আমাদের বুজুর্গানে দ্বীন রাষ্ট্রের নিয়ম মেনেছেন। সে সময়ে প্লেগের প্রাদুর্ভাব থেকে বাঁচার জন্য হাজিদের কোয়ারেন্টাইন বাধ্যতামুলক ছিল। আর তাঁরা হাসি মুখে মেনে নিয়েছেন। আমরা শুধু তাওয়াক্কুল করলাম, কিন্তু কোন আছবাব গ্রহণ করলাম না। এটা ঠিক নয়। নিয়ম মেনে চলতে হবে। নিজেকে সুস্থ রাখতে, দেশবাসিকে সুস্থ রাখতে সরকার প্রদত্ত ফর্মুলা মানা জরুরী। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক


