ক্রীড়া ডেস্ক : সিরিজ তো আগেই খোয়া গেছে। দুই ম্যাচ হেরে সিরিজের শেষ ও তৃতীয় ওয়ানডেতে ৩৩১ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য সামনে রেখে খেলতে নেমে ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। হোয়াইটওয়াশ এড়ানোর লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ইনিংসের ভূমিকাতেই ধাক্কা খায় টাইগাররা। একে একে যাওয়া-আসার মিছিলে যোগ দেন টপঅর্ডার-মিডলঅর্ডার। তবে থেকে যান সাব্বির রহমান। বুক চিতিয়ে লড়েন তিনি। ফিফটি তুলে এগিয়ে যান সেঞ্চুরির পথে। শেষ পর্যন্ত ১০৫ বলে ১২ চার ও ২ ছক্কায় তিন অংকের ম্যাজিক ফিগার স্পর্শ করেন তিনি। এটিই তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারে প্রথম সেঞ্চুরি। ঝুলিতে রয়েছে ৫টি হাফসেঞ্চুরির ইনিংস।
তিন সংস্করণ মিলে একশর বেশি ম্যাচ খেলা সাব্বির রহমান অবশেষে পেলেন তিন অঙ্কের দেখা। ডানেডিনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় ওয়ানডে ম্যাচে টপ অর্ডারের ব্যাটিং ব্যর্থতার দিন জ্বলে ওঠেন নিষেধাজ্ঞা কমিয়ে বাংলাদেশ দলে ফেরানো এই ক্রিকেটার। ক্যারিয়ারের তিন বছরের মাথায় এসে প্রথম সেঞ্চুরির দেখা পেয়েছেন সাব্বির।
ওয়ানডেতে আগের সর্বোচ্চ সংগ্রহ ছিল ৬৫, টেস্টে ৬৬ আর টি-টুয়েন্টিতে ৮০ রান। এবারই প্রথম তিন অঙ্ক ছুঁয়েছেন এ ডানহাতি ব্যাটসম্যান। তিন ফরম্যাট মিলে একশর বেশি ম্যাচ খেলে পেয়েছেন সেঞ্চুরির দেখা। ১০৯তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ আর ১১৩তম ইনিংসে ১০৫ বলে শতকে পৌঁছান এ ডানহাতি। ১২টি চার, ২ ছক্কায় সাজান ইনিংস।
সাব্বির ছাড়া নিউজিল্যান্ডের মাটিতে সেঞ্চুরি আছে বাংলাদেশের কেবল দুই ব্যাটসম্যানের। ২০১৫ বিশ্বকাপে করেছিলেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। তার আগে ২০১০ সারে দ্বিপাক্ষিক সিরিজে সেঞ্চুরি হাঁকান ইমরুল কায়েস।
তামিম-মুশফিক-মাহমুদউল্লাহদের মতো অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানরা যেখানে দাঁড়াতেই পারছেন না সেখানে সাব্বির করলেন সাবলীল ব্যাটিং, খেললেন লম্বা ইনিংস। কঠিন কন্ডিশনকেই বানালেন সেঞ্চুরি উদযাপনের মঞ্চ। ৬১ রানে ৫ উইকেট হারানোর পর বড় জুটির দেখা পেয়েছে বাংলাদেশ। সাব্বির রহমান ও মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনের ব্যাটে ভদ্রস্থ হয় বাংলাদেশের স্কোর
এর আগে জবাব দিতে নেমে শুরুতেই টিম সাউদির পেস তোপে পড়ে বাংলাদেশ। সূচনালগ্নে তার বলে উইকেটের পেছনে টম লাথামকে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন ড্যাশিং ওপেনার তামিম। এই সিরিজে সুপার ফ্লপ তিনি। এর রেশ না কাটতেই এই ডানহাতি পেসারের বলে সরাসরি বোল্ড হয়ে ফেরেন সৌম্য সরকার। ফিরতি ওভারে রানের খোঁজে থাকা লিটন দাসকে এলবিডব্লিউ করে তিনি ফিরিয়ে দিলে চাপে পড়ে টাইগাররা।
এরপর মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে নিয়ে দলকে টেনে তোলার চেষ্টা করেন মুশফিকুর রহিম। ভালোই এগোচ্ছিলেন তারা। তবে আচমকা থেমে যান মুশফিক। ট্রেন্ট বোল্টের শিকার হয়ে ফেরেন অফফর্মে থাকা মিস্টার ডিপেন্ডেবল। পরে টিকতে পারেননি মাহমুদউল্লাহও। কলিন ডি গ্র্যান্ডহোমের বলে কলিন মানরোকে লোপ্পা ক্যাচ দিয়ে তিনি ফিরলে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় বাংলাদেশ। এবার কোনো ম্যাচেই তার সাইলেন্ট কিলারের ভূমিকাটা দেখা গেল না।
৩৩১ রানের পাহাড়সম টার্গেট। সেই লক্ষ্যে খেলতে নেমে ৬১ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে বিপর্যয়ে পড়ে বাংলাদেশ। সেই পরিস্থিতিতে ক্রিজে আসেন মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। ভীষণ চাপের মুখে তাকে নিয়ে দলের হাল ধরেন সাব্বির রহমান। ধীরে ধীরে এগিয়ে যান তারা। এতে বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠে টাইগাররা। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে দারুণ মেলবন্ধন গড়ে ওঠে। তাতে লড়াইয়ের ইঙ্গিত দেয় তারা। কিন্তু বিধিবাম! থেমে যেতে হয় সাইফউদ্দিনকে। ঠিকমতো ব্যাটে-বলে না হওয়ায় বোল্টের বলে গ্র্যান্ডহোমকে ক্যাচ দিয়ে আসেন তিনি। ফেরার আগে ৬৩ বলে ৪ চারে ৪৪ রানের সংগ্রামী ইনিংস খেলেন সাইফ।
এই অলরাউন্ডার ফিরলে ব্যাটিং অর্ডারে পরিবর্তন এনে মিরাজকে বসিয়ে নামেন মাশরাফি। তবে সাব্বিরকে যোগ্য সহযোদ্ধার সমর্থন দিতে পারেননি তিনি। সাউদির চতুর্থ শিকার হয়ে বোল্টের হাতে ক্যাচ তুলে দিয়ে ফেরেন তিনি। এতে জয়ের প্রহর গুনতে থাকে নিউজিল্যান্ড।
বুধবার ডানেডিনে টস জিতে নিউজিল্যান্ডকে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ জানান বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। এ ম্যাচে নিয়মিত কিউই অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসনের পরিবর্তে খেলতে নামেন কলিন মানরো। তবে সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি তিনি। শুরুতেই তাকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলে প্রথমে বোলিং নেয়ার যৌক্তিকতা প্রমাণ করেন মাশরাফি নিজেই।
ওয়ানডাউনে নেমে মার্টিন গাপটিলকে নিয়ে প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে ওঠেন হেনরি নিকোলস। তবে এদিন খুব বেশিদূর যেতে পারেননি ফর্মের মগডালে থাকা গাপটিল। মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনের বলে তামিমের দুর্দান্ত ক্যাচে পরিণত হন ব্যাক টু ব্যাক সেঞ্চুরি হাঁকানো এই ব্যাটার। ফেরার আগে করেন ৪০ বলে ৩ চার ও ১ ছক্কায় ২৯ রান।
পরে রস টেইলরকে নিয়ে খেলা ধরেন নিকোলাস। প্রথমে ধীরলয়ে হাঁটলেও ক্রিজে সেট হওয়ার পর কোপ বসাতে শুরু করেন তারা। ছোটান স্ট্রোকের ফুলঝুরি। তাতে উল্কার গতিতে ছোটে নিউজিল্যান্ড। তবে হঠাৎই স্তব্ধ হয়ে যান নিকোলাস। দুর্দান্ত খেলতে থাকা এই ওপেনারকে ক্যাচ তুলতে বাধ্য করেন মেহেদী হাসান মিরাজ। তামিমের তালুবন্দি হওয়ার আগে ৭৪ বলে ৭ চারে ৬৪ রান করেন তিনি।
তবে থেকে যান টেলর। এবার এসে তাকে সঙ্গ দেন টম লাথাম। ফলে রানের চাকা সচল থাকে। পথিমধ্যে ফিফটি তুলে নেন টেলর। এর সঙ্গে ১ রান যোগ হতেই বনে যান নিউজিল্যান্ড ওয়ানডে ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। এর আগে রেকর্ডটি দখলে ছিল সাবেক ব্ল্যাক-ক্যাপস অধিনায়ক স্টিফেন ফ্লেমিংয়ের দখলে। সবার ওপরে ওঠে অবশ্য বেশিক্ষণ ক্রিজে থাকতে পারেননি তিনি। দলীয় ২০৬ রানে রুবেল হোসেনের বলে ডিপ স্কয়ার লেগে ক্যাচ তুলে দেন টেলর। মাহমুদউল্লাহর তালুবন্দি হওয়ার আগে ৮২ বলে ৭ বাউন্ডারিতে ৬৯ রান করেন মিডলঅর্ডারে ব্যাটিং স্তম্ভ।
শুরুটা ভালো হলে এবং মাঝপথে রানের চাকা ভালোভাবে গড়লে পরের ব্যাটসম্যানদের জন্য রান তোলার গতিটা বাড়ানো সহজ হয়। সেটাই বাস্তবে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন লাথাম ও জেমস নিশাম। টেইলের বিদায়ের পর তাণ্ডব চালান তারা। ব্যাটকে তলোয়ার বানিয়ে টাইগার বোলারদের কচুকাটা করে রানের ফোয়ারা ছোটান এই জুটি। এই পরিস্থিতিতে নিশামের স্টাম্প উপড়ে ফেলেন মোস্তফিজুর রহমান। ফেরার আগে ২৪ বলে ৩ চার ও ২ ছক্কায় ৩৭ রানের টর্নেডো ইনিংস খেলেন তিনি। পরক্ষণেই লাথামকে সৌম্য সরকারের ক্যাচে পরিণত করেন কাটার মাস্টার। ড্রেসিং রুমের পথ ধরার আগে ৫১ বলে ২ চারের বিপরীতে ৩ ছক্কায় ৫৯ রানের নান্দনিক ইনিংস খেলেন উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান। ততক্ষণে চ্যালেঞ্জিং স্কোরের ভিত পেয়ে যায় স্বাগতিকরা।
শেষদিকে এর ওপর দাঁড়িয়ে মাশরাফিদের ওপর স্টিম রোলার চালান কলিন ডি গ্র্যান্ডহোম ও মিচেল স্যান্টনার। রানের নহর বইয়ে দেন তারা। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ওভারে ৬ উইকেটে ৩৩০ রানের পাহাড় গড়ে নিউজিল্যান্ড। মাত্র ১৫ বলে ৪ চার ও ২ ছক্কায় ৩৭ রানের হার না মানা ঝড়ো ইনিংস খেলেন গ্র্যান্ডহোম। আর ৯ বলে ১ চারে ১৫ রানে অপরাজিত থাকেন স্যান্টনার। বাংলাদেশের হয়ে মোস্তাফিজ নেন ২ উইকেট। ১টি করে উইকেট নেন মাশরাফি, রুবেল, মিরাজ ও সাইফউদ্দিন।


