মাওলানা নুরুল ইসলাম শ্রীপুরী : পরম প্রিয়তম মহান আল্লাহর প্রেমে উন্মক্ত, তাঁর সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যে তন্ময় থেকে, আহার-বিহার, ভোগ-বিলাস ও পাশবিকতা পরিহার করত পরমাত্তার রঙে নিজেকে রাঙ্গিয়ে তোলার নামই রোযা। প্রিয়তমের মহামিলনের যাত্রা পথের অন্যতম পাথেয় সম্বল হচ্ছে রোযা। প্রেমময়কে পাওয়ার জন্য স্বয়ং আল্লাহ্ তা’আলা ভক্তপ্রেমিককে রোযার মূল্যবান সওগাত দান করেছেন।
রোযার মহান উদ্দেশ্যের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রেমিকদের জন্য আল্লাহ্ বলেছেন, লা’ল্লাকুম তাত্তাকুন’ তোমরা যাতে পরহেযগার হও (বাকারা)। রব্বানী চরিত্রে উন্নতি সাধনের লক্ষ্যে বান্দা পরম আগ্রহভরে প্রেমময়ের নির্দেশে সিয়াম পালন করেছে বিধায় প্রেমিককুলের কঠোর সিয়াম সাধনা ও প্রেমভক্ত হৃদয়কে আল্লাহ অত্যধিক ভালোবাসেন। এমনকি উপবাসের কারণে রোযাদারের মুখে যে গন্ধ অনুভূত হয় সে গন্ধ ও আল্লাহ তা’আলার নিকট মৃগনাভী অপেক্ষা অধিক প্রিয় (মুসলিম শরীফ)। রোযার মহান ব্রত সাধন আল্লাহ তা’আলার নিকট কত প্রিয় ও মূল্যবান সে বিষয়ে আমাদের পেয়ারে নবীজী মুহাম্মদ সা. আল্লাহ তা’লার ঘোষণা এ ভাবে ব্যক্ত করেছেন যে, আদম সন্তানের প্রতিটি পূণ্যের প্রতিদান দশ হতে সাতশত গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়া হয়। তবে রোযার বিষয়টি ব্যাতিক্রম। কারণ তা একমাত্র আমার জন্যই এবং আমি স্বহস্তে এর প্রতিদান দিব। বরং ভক্ত প্রেমিকের প্রেমময় সিয়াম সাধনার বিনিময়ে আমি নিজেকেই নিবেদন করব।
প্রেম জগতের মিলত মাধুরীর দাবি এ রকম; যে যার প্রেমে মত্ত হয়, যার সাথে মিলনের আশা বুকে লালন করে সব কিছু পরিত্যাগ করে। পরিনামে সে যদি প্রিয়ার পরশ থেকে বঞ্চিত থাকে, তাহলে এ দুঃখ প্রকাশ করবে কোথায়? এ শোকাহত মন শান্তি খুঁজবে কার কাছে? পরোক্ষভাবে তাকে অঢেল প্রতিদানে ভূষিত করা হলেও তার কাঙাল হৃদয়ের অতৃপ্ত পিপাসা কিছুতেই পরিতৃপ্ত হবে না। প্রিয়জনের মিলনের জন্য সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। প্রেমময় আল্লাহকে পাওয়ার জন্য আশা নিরাশার মাঝে অঝোর ক্রন্দনই যেনো এ দরিদ্র প্রেমিকের একমাত্র পথ সম্বল। ব্যাকুল ও অসহায়ের মতো চোঁখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। রমজানের রহমতের একপশলা বৃষ্টির ফোঁটা দ্বারা সম্ভব হবে এ অশ্রু মোচন করা।
কবি হাফিজ চমৎকার বলেছেন- ‘আয ছেরে বালীনে মন বরখীয, আয় নাঁদা ত্ববীব/দরদ মন্দে এশকরা দারূ বজুয দীদারে নেস্ত।’ [মুর্খ চিকিৎসক! সরে যাও আমার শিয়র হতে। প্রেমের বেদনায় যার বুক ভরা, একমাত্র প্রিয়ার দর্শন ব্যতীত তার ব্যথা নিরাময় সম্ভব নয়।]
পরম প্রিয়তম আল্লাহ নিষ্ঠুর নন, দরদহীন নন। ভক্ত প্রেমিকের ত্যাগ ও সাধনা তিনি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন এবং নিজের দিদার লাভের জন্য বান্দাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কত মর্যাদামন্ডিত এ প্রতিশ্রুতি। হৃদয় জগতের গভীরে কী অন্তহীন প্রতিক্রিয়া সঞ্চার করেছে তা একমাত্র ভক্ত প্রেমিকই অনুভব করতে পারে। প্রিয়জনের মিলন সংবাদে যার হৃদয় আনন্দে ভরে উঠেনা, যার প্রাণ সুখে নাচতে থাকেনা, তাকে জড়পদার্ত, পাষাণ হৃদয় বললে অত্যুক্তি হবে না। কিন্তু অনেক সময় পাষাণ-পাথরে ও প্রেমের কোমল প্রভাব বিস্তার করে। মহান রাব্বুল আলামীন বলেন, ‘ও ইন্না মিনহা লামা য়াহবিতু মিন খাশিয়াতিল্লাহ’ আল্লাহর ভয়ে পাথর ও কাঁদে।
প্রেমিক সিয়াম সাধকদের জন্য সুসংবাদ ও মধুর সওগাত রয়েছে। রাসূল সা. ইরশাদ করেন, ‘রোযাদারের অপরিসীম আনন্দের দু’টি সময় রয়েছে। এক, ইফতারের সময় বা ঈদুল ফিতরের সময়। দুই, পরম প্রিয়তম আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ লাভের সময় (মুসলিম শরীফ)।
বৎসরের বারো মাসের মধ্যে রমজান মাসের ফজিলত অনন্য। এ মাস হচ্ছে নানাবিধ রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের বর্ষাকাল। এ মাসের প্রতিটি মুহুর্তে বয়ে যায় রহমতের অমৃত প্লাবন। খরাগ্রস্ত, বিশুষ্ক মনোজগতে বর্ষণ করে রহমতের হিমাদ্রি।
প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, রমজান শরীফে আমার উম্মতকে এমন পাঁচটি নেয়ামত দান করা হয়েছে যা পূর্বে অন্য কোনো নবীগণকে দেয়া হয়নি।
১. রমজানের প্রথম রজনীতে আল্লাহ তা’আলা ভক্ত প্রেমিকদের প্রতি রহমতের দৃষ্টি নিবিষ্ট করেন। যে কেউ তাঁর শুভদৃষ্টিতে পতিত হয় আল্লাহ তা’আলা কখনো তাকে আযাব দেন না।
২. রোযাদারের বিকাল বেলার মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মৃগনাভী অপেক্ষা প্রিয়।
৩. আল্লাহর ফেরেশতাগণ রমজানের প্রতিটি রাতে সিয়াম সাধনাকারীদের নিমিত্তে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
৪. রোযাদার প্রেমিকদের সম্মানে আল্লাহ তা’আলা বেহেশতকে প্রস্তুত হতে আদেশ দেন ।
৫. রমজানের শেষ রজনীতে তিনি তাদের সকল পাপ-পঙ্কিলতা ক্ষমা করে দেন (বায়হাকি শরীফ)।
যে কৃষক বর্ষাকালে জমি চাষের জন্য পানি না পায়, তৃষিত হৃদয়ের তৃষ্ণা মেটাতে না পারে, তাহলে সে জীবনভর পিপাসার্ত থাকবে। দূর্ভাগা সে যে, সমুদ্রের তীরে বসে ও পিপাসার্ত থাকে। আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগে উষর আরবের ধুসর বুকে কালিমা তাইয়্যিবা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর আওয়াজ আবিশ্বের আপামর জনমানবের কর্ণকুহরে গুঞ্জরিত হয়েছিল। অভূতপূর্ব এ কালিমা তাঁর অমিত তেজ হেদায়েত দিয়ে দিকভ্রান্ত জাতিকে সঠিক দিশা ও সম্বিত ফিরে দিয়েছে। অসংখ্য মানবকে জাহান্নামের আগুনের মর্মন্তুদ শাস্তি থেকে মুক্তি দিয়ে অনন্তকালের জন্য সুখদ জান্নাতের অধিবাসী করেছে। কিন্তু হায় আফসোস, শত পরিতাপ ও ধিক্ষার সেই পাষণ্ড আবু জেহেল ও আবু লাহাবের জন্য তারা তাদের পাপাত্মাকে একত্ববাদের সুনির্মল কালিমার অমীয় ফুল্গুধারায় ধন্য করতে পারেনি। ফলে অনন্তকালের জন্য ঘোর অন্ধকারে রয়ে যায়। একদা রাসূল সা. অসুস্থতার কারণে শেষ রাতে তাহাজ্জুদের জন্য উঠতে পারেননি, সে দিন আবু জেহেলের প্রেতাত্মা স্ত্রী গঞ্জিকা পানে মদমক্ত হয়ে বলেছিল, ‘আজ মনে হয় মুহাম্মদের শয়তান তার উপর ক্ষেপেছে বিধায় সে তাহাজ্জুদের জন্য উঠতে পারেনি’ (নাউযুবিল্লাহ)।
আল্লাহর অভিপ্রায় বুঝার সাধ্য কার? যে সুমিষ্ট ফোয়ারার অমীয় শরবত পান করে আরবের খর্জুর বীথিকা বেধ করে আটলান্টিকের বেলাভূমি পর্যন্ত সকলেই হেদায়েত লাভ করেছে। কিন্তু ঘরের সাথে ঘর, কপালপোড়া, হতভাগ্য আবু জেহেল, আবু লাহাব হেদায়েত পায়নি। কবির সৌকুমার্য শুধু তাঁর জন্যই, ‘মিলে যদি মুর্শিদে কামেল অভাগার এতে কি লাভ? খিজিরের আবেহায়াত পানে মিটলনা সিকান্দারের তৃষ্ণাভাব’। সেই কালিমার বিপ্লবী অনুভূতিতে অভীভূত হয়ে নাজাত পেয়েছে অসংখ্য মানুষ। যারা ছিলো তমশায় তারা ফিরে এসেছে আলোর পরশে। যারা ছিলো যাযাবর তারা পেয়েছে আদর্শের ঘর। যারা ছিলো রাহযান তাঁরা হয়েছে রাহবার। তাঁদের সামনে উন্মোচিত হয়েছে মানবতা ও সামাজিকতার নতুন দিগন্ত।
কবি বলেন- ‘এই খানে এই বনে এই কাননের মাঝখানে, ছিল ঘুমন্ত জেগেছে বসন্ত তোমার আগমনে’ গাহিছে দোয়েল-পাপিয়া কুহু কুহু তানে ‘শাখা শাখি উঠিছে মাতিয়া মর্মর গুঞ্জরণে’।
প্রিয় নবী সা. বলেন, রমজানের সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে যে ক্ষমা লাভ করতে পারল না, আর কখন সে ক্ষমা লাভ করবে? এমন হতভাগ্যের ক্ষমা প্রাপ্তির আশা খুবই কম (তাবরানি)। রমজান মাসে প্রতিটি ভাল কাজের মর্যাদা অন্যান্য মাসে কৃত ভাল কাজের চেয়ে অনেক বেশি। রাসূল সা. বলেছেন, রমজান মাসের একটি নফল আমলের মর্যাদা অন্যান্য মাসের ফরজ আমলের সমতুল্য। আর ফরজ আমলের মর্যাদা অন্যান্য মাসে সম্পাদিত ফরজ অপেক্ষা সত্তোর গুণ বেশি। রহমত বরকতের বৃষ্টিস্নিগ্ধ এ মাসে আমরা বেশি বেশি কল্যাণের প্রতি অনুপ্রাণিত হই। রহমতের প্রবলবর্ষণ আমাদের হৃদয়কে সকল ধরনের পাপ-পঙ্কিলতা ও আবিলতা থেকে মুক্ত করুক। আমাদের মননজগতকে আধ্যাত্মিক সজীবতা, আত্মিক উৎকর্ষতা দিয়ে ভরে দিক।
লেখক : শিক্ষক


