সুলতান ফাতিহের ইস্তাম্বুল ও আয়া সোফিয়া—একটি পর্যালোচনা

সুলতান ফাতিহের ইস্তাম্বুল ও আয়া সোফিয়া—একটি পর্যালোচনা

ফিরে দেখা । যুবায়ের বিন আরমান

সুলতান ফাতিহের ইস্তাম্বুল ও আয়া সোফিয়া—একটি পর্যালোচনা

সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহের ইস্তাম্বুল জয়

১৪৫৩ সালের ২৯ মে বিশ বছর বয়সী তুর্কি সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে প্রবেশ করলেন।
ইতোপূর্বে ৪০-৪৫ বার এই রাজধানী দখলের চেষ্টা করেছেন বহু রাজা বাদশা। কিন্তু কারো পক্ষেই বিজয় করা সম্ভব হয়নি। জয় ধরা দিয়েছে এই তরুন সুলতানের হাতেই।

উল্লেখ্য যে, যুদ্ধের পূর্বে সুলতান কয়েকবার দূত পাঠিয়ে চুক্তি সম্পাদনের আহ্বান জানিয়েছিলেন ততকালীন অত্যাচারী খৃষ্টান রাজার কাছে। কিন্তু তিনি রাজি হননি। অতপর যুদ্ধের মাধ্যমেই জয় হয় বাইজেন্টাইন সম্রাজ্যের এই রাজধানী।

নোট : কনস্টান্টিনোপুলের বর্তমান নাম ইস্তাম্বুল

যুদ্ধে জয়ের নীতিমালা

যুদ্ধে জয় ও চুক্তিভিত্তিক নগর জয়ে শরীয়তের দৃষ্টিতে বহু পার্থক্য রয়েছে। যুদ্ধের মাধ্যমে কোন শহর বিজিত হলে সেটির ভাগ্য সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে বিজয়ী সেনাপতির ইচ্ছার ওপর। তিনি চাইলে পুরো শহরের অপসংস্কৃতি, বিধর্মীদের যাবতীয় আস্তানা গুড়িয়ে দিতে পারেন। এটা সকল ধর্মের, সকল যুদ্ধের নিয়ম।

সুলতান মুহাম্মদ ফাতেহ বিজয়ী হয়ে যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

সুলতান ফাতিহ খুবই দয়ালু ছিলেন। তিনি বিজিত খ্রিস্টানদেরকে এমন বহু অধিকার দিয়েছেন, যা চুক্তির মাধ্যমেও পাওয়া যেত না। তিনি গির্জায় সমবেত হয়ে খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে নিয়মিত প্রার্থনা করার অনুমতি দিলেন। ধর্মযাজকদের ওপর হতে জিযিয়া কর মওকুফ করলেন। খৃষ্টানদের নেতা ও উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিবর্গকে যথাযথ সম্মান, পদবী ও দয়া প্রদর্শন করেন।

বাইজেন্টাইন আমলে প্রতিষ্ঠিত ও উসমানীয় তুর্কিদের সহায়তায় পুনর্নিমিত কিছু চার্চ এখনো বিদ্যমান আছে ইস্তাম্বুলে। যেমন ১৩৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত সেইন্ট গ্রেগরি দ্য ইল্যুমিনেটর চার্চ অব গালাটা এবং ১২৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত চার্চ অব সেইন্ট মেরি অব মঙ্গলস।

আয়া সোফিয়া

যুদ্ধের মাধ্যমে বিজিত শহরে সেনাপতি চাইলে যে কোনো স্থাপনাকেই গুড়িয়ে দিতে পারেন। সুলতান চাইলে আয়া সোফিয়াকেও নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারতেন। কিন্তু আয়া সোফিয়া ছিলো খুবই জাঁকজমকপূর্ণ স্থাপনা।

এদিকে ফিকহ অনুযায়ী কোন মুসলিম শহরে অমুসলিমদের জৌলুসপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা থাকবে না, যা মসজিদের চেয়ে বড় ও অধিক দৃষ্টিগোচর। তাই আয়া সোফিয়াকে চার্চ হিসেবে বহাল রাখার সুযোগ ছিল না। আগেই বলেছি, বিজিত শহর হিসাবে এটিকে গুড়িয়ে দেবার অধিকার ছিলো সুলতানের। কিন্তু সুলতান এমন একটা স্থাপনা ভাঙতে চাইলেন না। এটি না ভেঙে এর পরিপূর্ণ মূল্য পরিশোধ করে সুলতান খ্রিস্টানদের কাছ থেকে আয়া সোফিয়া কিনে নেন।

অতপর এটিকে মসজিদে রূপান্তর করেন। ১৪৫৩ সালের ১ জুনে মসজিদে রূপান্তরিত আয়া সোফিয়ায় প্রথমবারের মত জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়, যাতে ইমামতি করেন সুলতান ফাতিহ-এর শিক্ষক শায়খ শামসুদ্দিন।

স্পেন – গ্রানাডা

যুদ্ধে বিজিত একটি শহরের গির্জাকে সম্পূর্ণ বৈধভাবে মসজিদ বানানোর পরেও জ্বালাপোড়া করছে কিছু বুদ্ধিজীবীদের। অথচ তারা স্পেনের গ্রানাডা শহরের ব্যাপারে সম্পূর্ণ বোবা।

গ্রানাডা ছিল সর্বশেষ স্পেনীয় মুসলিম শহর। ইস্তাম্বুলের মত যুদ্ধ করে এটি জয় করেনি ফর্ডিন্যান্ড ও ইসাবেলা; বরং চুক্তির মাধ্যমেই দেশ ছেড়েছিলেন বানুল আহমারের শেষ আমির আবু আবদুল্লাহ।

৪৭ দফার চুক্তিতে বলা হয়েছিল, মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা বহাল রাখা হবে। শুধু তাই নয়, তাদের পারিবারিক আইন চর্চার জন্য কাজি নিয়োগ দেয়া হবে, মাদ্রাসাও চালানো যাবে।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে গ্রানাডার গ্রান্ড মসজিদ তো বটেই, ছোটখাট সমস্ত মসজিদও গির্জায় রূপান্তরিত হয়। এমন বর্বর অত্যাচারে যারা নিরব তারাই আবার বৈধভাবে নির্মিত একটি মসজিদ সহ্য করতে পারছেন না।

কামাল আতাতুর্ক

হিটলারের চেয়েও ভয়ংকর ছিলেন ১৯২৩ সালে তুর্কিদের ঘাড়ে চেপে বসা এই নাস্তিক কামাল আতাতুর্ক। তিনি কামাল পাশা নামেও প্রশিদ্ধ। প্রায় পনের বছর ১২ দিন রাজত্ব করেছিলেন এই জালিম শাসক।

মানবতার মিথ্যে স্লোগান সামনে রেখে মানুষের ধর্মীয় অধিকারকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করেছিলেন তিন।

উসমানী সুলতানদের তিলে তিলে গড়ে তোলা লাখ লাখ মসজিদকে নিশ্চিহ্ন করেছিলেন এই কামাল। প্রায় পাঁচ শত বছর ধরে মসজিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত স্থাপনা আয়া সোফিয়াকে তিনি জাদুঘরে পরিণত করেছিলেন।

মানুষকে ধর্ম থেকে দূরে রাখতে তাদের মাতৃভাষার হরফকে পর্যন্ত বদলিয়ে ফেলেছিলেন তিনি।
লা’নাতুল্লাহি আলাইহি।

প্রেসিডেন্ট এরদোগান

কামালবাদীদের বহু বছরের চেষ্টার পরও তুরস্ক থেকে ইসলামি চিহ্ন মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। এক সময় ক্ষমতায় আসেন ইসলামপছন্দ হোজ্জা আরবাকান। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে তাকে সরিয়ে দেয় নাস্তিক্যবাদী সামরিক বাহিনী। তার কয়েকবছর পর আরো প্রবলভাবে ক্ষমতায় আসেন হোজ্জাশিষ্য এরদোগান।

এরদোগান আপাদমস্তক ইসলামপন্থী হলেও দীর্ঘদিনের স্যাকুলার রাজ্যের স্যাকুলার জাতিকে রাতারাতি বদলিয়ে ফেলা কিছুতেই সম্ভব নয়। তবুও সাধ্যমত লড়াই করে চলেছেন আল্লাহর এই মুজাহিদ। আল্লাহ পাক তাঁকে সাহায্য করুন। আমাদের উচিৎ নয় তুর্কি ইতিহাস না জেনে এরদোগানকে গালাগালি করা। এরুপ করলে খুবই দুঃখজনক হবে।

দিরিলিস

এশিয়ায় বসে দিরিলিস নিয়ে ভাবলে চোখ বন্ধ করে হারাম ফতুয়া দেওয়া যাবে। কারণ পরিপূর্ণ ইসলামের অনুসরণ এখানে হয় নি।

কিন্তু যদি তুরস্কের বাস্তবতায় দিরিলিস নিয়ে কল্পনা করা হয় তবে এটিকে প্রেসিডেন্ট এরদোগানের নির্ভুল, নিখুঁত এক বুলেট হিসাবেই দেখা যাবে।
চিন্তা করুন ৯৫% ভাগ নাস্তিক জাতি। যাদের ৯৮ ভাগ নগ্ন। সেখানে দিরিলিসের বেপর্দাকে অশ্লীল মানতে আমার খুব আপত্তি রয়েছে।
আবারো বলছি, কথাগুলো তুরস্কের পরিস্থিতির বিচারে বলা। তাই কওমি ছাত্রীদের দিয়ে তাদের বিচার করবেন না।

(পুরো লেখার যাবতীয় তথ্য নেট থেকে সংগ্রহ করা। এককভাবে কোনো লিংক থেকে কপি করি নি। তাই লিংক দেওয়া যাবে না। লিংক চাইবেন না। আমার লেখার দায় আমার।)

লেখক : প্রবাসী কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *