স্বাস্থ্য সচেতনতা ও এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার (১ম পর্ব)

স্বাস্থ্য সচেতনতা ও এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার (১ম পর্ব)

স্বাস্থ্য সচেতনতা ও এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার (১ম পর্ব)

ডা. মোহাম্মদ হাসান জাফরী : “অযথা অ্যান্টিবায়োটিক সেবন ক্ষতির কারণ, বিনা প্রেসক্রিপশনে তা কিনতে বারণ” আমাদের  স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিশ্ব অ্যান্টিবায়োটিক সচেতনতা সপ্তাহ, ২০১৮ উপলক্ষ্যে এ স্লোগান জনসচেতনতায় প্রচার করে চলেছে। অসুস্থ হলেই অ্যান্টিবায়োটিক গেলো জ্বরে ডাক্তার যে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েছিলেন এবারের জ্বরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই সে ওষুধ সেবন, এমন ইচ্ছেমাফিক অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া আর নিজেকে চিকিৎসক ভেবে জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করা থেকে বিরত থাকা জরুরি। এক জীবনে বার বার ভুল করার সুযোগ নেই। তাছাড়া ফলমূল শাকসবজিতে আমরা ফরমালিন, কীটনাশকসহ অন্যান্য অত্যধিক ক্ষতিকর রাসায়নিক খেয়ে চলেছি নিয়মিত। মানুষের শরীর ঢলে পড়তে সময় লাগে না, একটু সঠিক পথে জীবনকে পরিচালিত করা আর বেশিদিন সুস্থতার সঙ্গে জীবনকে উপভোগ করা খুবই জরুরি। প্রবাদ আছে অল্পবিদ্যা ভয়ংকর।

ডাক্তার সাহেবকে মাঝে মাঝে কিছু রোগে বিশেষ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে দেখে আমরা নিজেরাই ডাক্তারি বিদ্যা না জানা সত্ত্বেও পণ্ডিত বনে যাই। রোগীর অবস্থা, রোগের সংক্রমণ, অ্যান্টিবায়োটিক আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা, তা না বুঝেই আমরা নিজেরা আবার কখনো-বা ওষুধের দোকানদারের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া শুরু করি। অযথা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ভয়াবহতা জানা না থাকায় হর-হামেশাই আমরা তা ব্যবহার করে চলেছি প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে। ফলে শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হচ্ছে।

কোনো অ্যান্টিবায়োটিকের সাধারণভাবে যেসব জীবাণুর ওপর কাজ করার কথা, যেসব জীবাণুকে মেরে ফেলার কথা, তা যদি না করতে পারে তাহলে ঐ রোগীর দেহের ব্যাকটেরিয়াগুলোর ওপর ঐ অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং এক সময় পুরোপুরি লোপ পায়। পরে সেই রোগীর দেহ থেকে অন্য মানুষের শরীরে যে জীবাণু ছড়ায় তার ওপর ঐ অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করে না। এটাই সহজ ভাষায় ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, অপ্রয়োজনে যে হারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার হচ্ছে তাতে ২০৫০ সাল নাগাদ সাধারণ ইনফেকশনেও ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা থাকবে না। বিশ্বে রোগীর চিকিৎসায় এক ক্রান্তিকালের সূচনা হবে, রোগী মারা যাবে, কারণ আমাদের কাছে তখন কোনো কার্যকর ওষুধ থাকবে না। তাই আমরা সকলে সচেতন হয়ে সঠিক রোগে, সঠিক সময়ে, নির্দিষ্ট মাত্রায়, নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার নিশ্চিত করব এ শপথ আজই নিতে হবে।

উন্নত বিশ্বে রোগীর অপারেশনের পরও কখনো কখনো অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না কারণ অপারেশনের জন্য নির্ধারিত মেডিক্যাল টিমের সকল সদস্য রোগ সংক্রমণ রোধে পর্যাপ্ত আচরণবিধি মেনে চলেন। অথচ আমাদের দেশের বেশিরভাগ হাসপাতালে অপারেশনে উপযুক্ত রোগজীবাণুবিহীন পরিবেশ না থাকায় এবং মেডিক্যাল টিমের সকলের সচেতনতার বিষয়টি প্রশ্নবোধক হওয়ায় কর্তব্যরত চিকিৎসক অপারেশনের পর পরই অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করে দেন। অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার যখন তখন শুরু করলে এবং কোর্স সমাপ্ত না করলে ঐ রোগীর ক্ষেত্রে ঐ অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। পরে ঐ ব্যক্তির শরীরে ঐ অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারে আশানুরূপ সফলতা পাওয়া যায় না।

ফলে ঐ রোগীর জন্য ঐ বিশেষ অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়ে। এভাবে অন্য যে সমস্ত অ্যান্টিবায়োটিক কোনো রোগীর ক্ষেত্রে অপব্যবহার করা হবে সেগুলো আস্তে আস্তে ঐ রোগীর জন্য অকার্যকর হয়ে পড়বে বিধায় সকলকে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। শুধু নিয়মমাফিক সঠিক প্রয়োজনে, সঠিক সময়ে, উপযুক্ত কালচার-সেনসিটিভিটি টেস্টের পর, সঠিক মাত্রায়, পর্যাপ্ত সময় পর্যন্ত অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, তবেই ব্যাকটেরিয়া যথাযথ দমনে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

লেখক : কলামিস্ট

 

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *