স্বাস্থ্য । ডা. মোহাম্মদ হাসান জাফরী
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ জরুরি
ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র বা মধুমেহ একটি নন-কমিউনিকেবল (অসংক্রমণযোগ্য) রোগ, যা একবার হলে সম্পূর্ণ প্রতিকার করা সম্ভব নয় কিন্তু নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। বর্তমান বিশ্বে ডায়াবেটিস এক নিরব ঘাতক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ অনুযায়ী সারা বিশ্বে এই সমস্যা বেড়েই চলেছে। বর্তমানে বিশ্বে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৪২ কোটিরও বেশি। ৩০ বছর আগের তুলনায় এই সংখ্যা এখন চার গুণেরও বেশি। ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা প্রায় ৭৫ লক্ষ। অথচ এদের ৫৭ শতাংশই জানেন না যে তাদের ডায়াবেটিস রয়েছে। জীবনযাত্রার পরিবর্তন, কায়িক শ্রম কমে যাওয়া, খাদ্যে নানাবিধ ক্ষতিকর পদার্থের উপস্থিতি, দুশ্চিন্তা বেড়ে যাওয়া-সব মিলিয়ে ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। রোগীদের সক্ষমতা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
আমরা যখন কোন খাবার খাই তখন আমাদের শরীর সেই খাদ্যের শর্করাকে ভেঙে গ্লুকোজে রূপান্তরিত করে। অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নামক যে হরমোন নিসৃত হয়, তা আমাদের শরীরের কোষগুলোকে গ্লুকোজ গ্রহণ করতে সাহায্য করে। এই গ্লুকোজ শরীরের জ্বালানি বা শক্তি হিসেবে কাজ করে। শরীরে যখন ইনসুলিন তৈরি হতে না পারে অথবা এটা ঠিক মতো কাজ না করে, তখনই ডায়াবেটিস হয় এবং এর ফলে রক্তের মধ্যে গ্লুকোজ জমা হতে শুরু করে।
ডায়াবেটিস বিভিন্ন ধরণের হতে পারে। তবে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে, টাইপ-১ এবং টাইপ-২।। টাইপ-১ (Insulin Dependent Diabetes, Juvenile Diabetes) ডায়াবেটিস সাধারণত ছোট বয়সেই দেখা দেয় এবং প্রত্যহ ইনসুলিন গ্রহণ ব্যাতিরেকে এর কোনো চিকিৎসা নেই, অর্থাৎ ইনসুলিন নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে। সাধারণত ৪০ বছর বয়সের দিকে ডায়াবেটিস এবং বংশ পরম্পরায় চলতে পারে। এই ডায়াবেটিসই টাইপ-২ (Insulin Non Dependent Diabetes, Adult Onset Diabetes) ডায়াবেটিস। তবে এ বয়সের মানুষদের পাশাপাশি ছোটদেরও ইদানিং ডায়াবেটিস লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং তা ক্রমশ বেড়েই চলেছে।
টাইপ-১ ডায়াবেটিসে অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। তখন রক্ত প্রবাহে গ্লুকোজ জমা হতে শুরু করে। ডাক্তারদের মতে, এর পেছনে জিনগত কারণ থাকতে পারে অথবা অগ্ন্যাশয়ে ভাইরাসজনিত সংক্রমণের কারণে ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলো নষ্ট হয়ে গেলে এমন হতে পারে। আর টাইপ-২ ডায়াবেটিসে যারা আক্রান্ত তাদের অগ্ন্যাশয়ে যথেষ্ট ইনসুলিন উৎপন্ন হয় না অথবা এই হরমোনটি ঠিক মতো কাজ করে না।
সন্তানসম্ভবা হলেও অনেক নারীর ডায়াবেটিস হতে পারে (Gestational Diabetes)। তাদের দেহ থেকে যখন নিজের এবং সন্তানের জন্যে প্রয়োজনীয় ইনসুলিন যথেষ্ট পরিমাণে তৈরি হতে না পারে, তখনই তাদের ডায়াবেটিস হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৬ থেকে ১৬ শতাংশ গর্ভবতী নারীর ডায়াবেটিস হতে পারে। ডায়েট, শরীর চর্চা অথবা ইনসুলিন নেওয়ার মাধ্যমে তাদের শরীরে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা গেলে তাদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
ক্লান্তি বোধ করা ডায়াবেটিসের একটি বড় উপসর্গ। সবচেয়ে সাধারণ উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে : খুব তৃষ্ণা পাওয়া, বারবার ক্ষুধা লাগা, স্বাভাবিকের চাইতেও ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া (বিশেষ করে রাতের বেলায়) কোনো কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া, প্রদাহজনিত রোগে বারবার আক্রান্ত হওয়া, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া, শরীরের কোথাও কেটে গেলে সেটা শুকাতে দেরি হওয়া ইত্যাদি। রক্তে স্বাভাবিক গ্লুকোজের পরিমাণ ৫.৫ থেকে ৬.০ mmol/L (খালিপেটে) এবং ৭.৭ mmol/L (ভরাপেটে) কিন্তু যখন এই গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যায়, তখনই সে অবস্থাকে আমরা ডায়াবেটিস বলি।
রক্তে চিনির পরিমাণ বেশি হলে রক্তনালীর মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। শরীরে যদি রক্ত ঠিক মতো প্রবাহিত হতে না পারে, তবে যেসব জায়গায় রক্তের প্রয়োজন সেখানে রক্ত পৌঁছাতে পারে না, ফলে স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এতে করে মানুষ দৃষ্টি শক্তি হারাতে পারে। ইনফেকশন দেখা দিতে পারে পায়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অন্ধত্ব, কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়া, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ইত্যাদির পেছনে একটি বড় কারণ ডায়াবেটিস। এছাড়া হাইপোগ¬াইসেমিয়া, কিটোএসিডোসিস ইত্যাদি মারাত্মক জটিলতাও তৈরি হতে পারে।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে শুধু ওষুধ বা ইনসুলিনই যথেষ্ট নয়। খাদ্যাভ্যাস, ঔষধ এবং শৃঙ্খলাবোধের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। প্রক্রিয়াজাত খাবার ও পানীয় এড়িয়ে চলতে হবে। এড়িয়ে চলতে হবে ফাস্ট ফুড, চিনি জাতীয় পানীয়, মিষ্টি ইত্যাদি। খেতে হবে শাক সব্জি, ফল এবং মোটা দানার খাদ্য শস্যের মতো স্বাস্থ্যকর খাবার। স্বাস্থ্যকর তেল, বাদাম খাওয়াও ভালো। যেসব মাছে ওমেগা থ্রি তেল আছে সেগুলো বেশি করে খেতে হবে। এক বেলা পেট ভরে না খেয়ে অল্প পরিমাণে বিরতি দিয়ে খেতে হবে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মেডিসিনের মধ্যে আছে মূলত ইনসুলিন, যা বিভিন্ন রোগীর ক্ষেত্রে বিভিন্ন মাধ্যমে এবং ডোজে দেওয়া হয়। এছাড়া আছে বিভিন্ন মুখে খাওয়ার বিভিন্ন ওষুধ, যেমন সালফোনাইলইউরিয়া, মেটফরমিন, লিনাগি¬পটিন ইত্যাদি।
জীবনযাপনে শৃঙ্খলাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি। শরীর চর্চা বা ব্যায়াম করার মাধ্যমে রক্তে চিনির মাত্রা কমিয়ে রাখা সম্ভব। প্রতিসপ্তাহে আড়াই ঘণ্টার মতো ব্যায়াম করা দরকার। তার মধ্যে দ্রুত হাঁটা এবং সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠাও এর মধ্যে রয়েছে। শারীরিকভাবে থাকতে হবে সক্রিয়। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ধূমপান পরিহার করাও জরুরি। নজর রাখতে হবে কোলস্টেরলের মাত্রার ওপরও।
১৪ নভেম্বর বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। প্রতিবছর ডায়াবেটিস নিয়ে বিশ্ব জুড়ে নানা আঙ্গিকে দিনটি পালিত হয়। বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিস রোগ ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ব ডায়াবেটিস ফেডারেশন (আইডিএফ) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ১৯৯১ সালে ১৪ নভেম্বরকে ডায়াবেটিস দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এদিন বিজ্ঞানী ফ্রেডরিক বেনটিং জন্ম নিয়েছিলেন এবং তিনি বিজ্ঞানী চার্লস বেস্টের সঙ্গে একত্রে ইনসুলিন আবিষ্কার করেছিলেন। তাদের স্মরণে এ দিনটিতে ডায়ারেটিস দিবস পালিত হয় বিশ্বব্যাপী।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ১৯৮০ সালে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১১ কোটি, ২০১৪ সালে তা বেড়ে হয় ৪২ কোটিরও বেশি। ১৯৮০ সালে ১৮ বছরের বেশি বয়সী মানুষের ডায়াবেটিসের হার ছিল ৫ শতাংশেরও কম কিন্তু ২০১৪ সালের তাদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন বলছে, প্রাপ্ত বয়স্ক ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশ মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশের, যেখানে খুব দ্রুত খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ঘটছে। সংস্থাটি বলছে, ২০১৬ সালে ডায়াবেটিসের কারণে বিশ্বে প্রায় ১৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
উন্নত দেশগুলোর তুলনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এ রোগের বৃদ্ধির হার অনেক বেশি। বাংলাদেশে বর্তমানে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা প্রায় ৭৫ লাখ। ২০৪০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা দেড় কোটি ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় ডায়াবেটিস সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে এবং চিকিৎসা সেবা প্রদানে বাংলাদেশ সরকার এবং বিভিন্ন সংগঠন নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে স্বল্প খরচে ডায়াবেটিসের টেস্টগুলো করার ব্যবস্থা আছে। সরকারি টারশিয়ারি হাসপাতালগুলোতে মেডিসিন বিভাগের পাশাপাশি এন্ডোক্রাইন (হরমোন) এবং ডায়াবেটিস বিভাগ চালু আছে, যা ডায়াবেটিস রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা মেডিকেলসহ দেশের বিভিন্ন মেডিকেলে ডায়াবেটিক ক্লিনিক চালু আছে। এছাড়া বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে বিভিন্ন মাঠ, পার্কসমূহ হাঁটার উপযোগী করা হয়েছে। বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশের নদীর পাশে তৈরি হচ্ছে ওয়াকওয়ে। নিঃসন্দেহে এসব উদ্যোগ দেশের জনগণের স্বাস্থ্য রক্ষা এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে শারীরিক পরিশ্রমের সুযোগের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
দেশে ১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হয় (তখন পাকিস্তান ডায়াবেটিক এসোসিয়েশন নামকরণ করা হয়)। ১৯৮২ সালে বারডেম বহুমূত্র প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে কম্যুনিটিভিত্তিক কর্মসূচি গঠনের লক্ষ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগী কেন্দ্র হিসেবে দায়িত্ব লাভ করে। ইউরোপের বাইরে এ ধরণের প্রতিষ্ঠান এটাই প্রথম। এছাড়া বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রচারের পাশাপাশি ধর্মীয় বিশ্লেষকদের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আমাদের করণীয় বিশেষভাবে ‘ডায়াবেটিস প্রতিরোধ’ বিষয়ে একটি বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করেছে।
ডায়াবেটিস এখন আর কোনো ছোটখাট অসুস্থতা নয়। এ রোগের ব্যাপারে জনগণকে আরো সচেতন করার জন্য আমাদের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসে এ বিষয়ক কর্মশালা, মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, জনগণকে ডায়াবেটিস সম্পর্কে জানানো এবং সর্বোপরি সবার মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। সরকারের পাশাপাশি আমাদেরকেও এক্ষেত্রে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। সকলে মিলে সচেতন হয়ে এগিয়ে আসলে আমরা ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবো এবং ফিরে পাবো সুস্থ স্বাভাবিক জীবন।
লেখক : কলামিস্ট


