পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম: ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বা যুদ্ধ জনমনে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে। ফলে তারা ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নিয়ে সতর্ক থাকে, খরচ কমিয়ে দেয়। এতে প্রকারান্তরে অর্থনীতি মন্দার দিকে যায়। ইরাসায়েল-হামাসের এ যুদ্ধ নিয়ে উদ্বিগ্ন অর্থনীতিবিদরা।
তাঁরা বলছেন, এ সংঘাত আঞ্চলিক পর্যায়ে বিস্তৃত হলে বিনিয়োগে ভাটা পড়বে, জ্বালানির দাম বাড়বে এবং সুয়েজ খালের মতো বাণিজ্যিক রুট মধ্যপ্রাচ্যে থাকায় বৈশ্বিক পণ্য সরবরাহব্যবস্থাও ঝুঁকিতে পড়বে।
গত বুধবার অনুষ্ঠিত সৌদি বিনিয়োগ ফোরামে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা বলেন, সামগ্রিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইসরায়েল-হামাস সংঘাতের মধ্যে যা দেখা যাচ্ছে, সেগুলো যদি দিনশেষে সব একত্র করা হয়, তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে তার আরো গুরুতর প্রভাব অনুভূত হবে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে চলমান যুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতির দিগন্তে কালো মেঘ ছেয়ে গেছে, যেখানে বিশ্ব অর্থনীতি এরই মধ্যে দুর্বল প্রবৃদ্ধিতে রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, এ যুদ্ধে এরই মধ্যে আঞ্চলিক দেশগুলোর অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করেছে, বিশেষ করে যেসব দেশ পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। মিসর, জর্দান, লেবাননে যুদ্ধের ক্ষতিকর প্রভাব এরই মধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। এ ছাড়া বিশ্বজুড়েই অস্থিরতা শুরু হয়ে গেছে।
গত ৭ অক্টোবর হামাস ইরায়েলে আকস্মিক হামলা চালায়।
এর পরই ইসরায়েল গাজায় হামলা শুরু করে। হামাসের বিরুদ্ধে তারা দীর্ঘমেয়াদি সামরিক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এ যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে, জ্বালানির মূল্য বাড়বে এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুটগুলোতে পণ্য চলাচল ব্যাহত হবে।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা বিষয়ক পরিচালক পাট থাকের সিএনবিসিকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো সংঘাত পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে কম্পন ধরাবে। কারণ প্রথমত, এটি জ্বালানি সরবরাহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল।
দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক পণ্য পরিবহনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুট এ অঞ্চলেই। এক গবেষণায় নোটে জে সাফরা সারাসিনের বিশ্লেষকরা জানান, বিশ্বের অষ্টম বৃহৎ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশ ইরান। যদি সংঘাতে দেশটি জড়িয়ে যায় তবে দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেল তেল বিশ্ববাজারে আসবে না। এ ছাড়া সৌদি আরবের সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে। এতে আরো বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত জাহাজ চলাচলের রুট। এর মধ্যে রয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুয়েজ খাল, রেড সি, পারস্য উপসাগর ও হরমুজ চ্যানেল। ফলে আঞ্চলিক সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এ রুটগুলোও ঝুঁকিতে পড়বে, যা বৈশ্বিক পণ্য সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত করবে।
ইআইইউয়ের থাকের ব্যাখ্যা করে বলেন, যুদ্ধ যদি সিনাই উপদ্বীপ ও সুয়েজ খাল অঞ্চলে বিস্তৃত হয়, তবে জ্বালানি, খাদ্যসহ অন্যান্য পণ্য পরিবহনে হামলার ঝুঁকি বাড়বে। বিশ্ববাণিজ্যের ১৫ শতাংশ হয় সুয়েজ খাল দিয়ে, অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ৪৫ শতাংশ, পরিশোধিত তেলের ৯ শতাংশ এবং এলএনজি ট্যাংকারের ৮ শতাংশ পরিবহন হয় এই রুট দিয়ে।
তিনি বলেন, এর ফলে যুদ্ধ আঞ্চলিক পর্যায়ে বিস্তৃত হলে শুধু তেলের বাজারেই বিপর্যয় ঘটবে না, পণ্য আনা-নেওয়ার পুরো সরবরাহব্যবস্থাই বড় ধরনের বিপর্যয়ে পড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের নতুন এ সংকটে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারে উঠে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে বলে দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, তেলের দাম বাড়লে রাশিয়ার সুবিধা, তারা সেখান থেকে অতিরিক্ত মুনাফা করতে পারবে। গত বছর ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর ইউরোপে রাশিয়ার তেল বিক্রি অনেকটা কমে যায়। এরপর তারা চীন, ভারতসহ বিভিন্ন বিকল্প বাজারে তেল বিক্রি শুরু করে। এখন তেলের দাম আবার বাড়লে পশ্চিমাদের উদ্বেগ আরো বাড়বে। কারণ তারা এমনিতেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে।
সূত্র : সিএনবিসি, এএফপি, দ্য গার্ডিয়ান, আলজাজিরা


