মুফতী আবদুস সালাম : কালে কালে মাদরাসা ছাত্রদের মাঝে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আগের মত তারা আর বোকাটি নেই। মগজধোলাইর ময়দানে ‘হুজুররা বলবে আর ছাত্ররা গিলবে’ ছেলে ভুলানো সেইসব তন্ত্রমন্ত্রের আবেদন ফুরিয়ে গেছে বহু আগেই৷
তারা কারো কথা এখন আর অন্ধের মত বিশ্বাস করে না। ‘পেয়ারা’ পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে স্বদেশ ও মুক্তিযুদ্ধকে কেউ কটাক্ষ করলে তারা এখন প্রতিবাদ করে। বুড়োদের পাকিজম এখন আর তরুণদের ভেতর অনুপ্রবেশ করে না।
তাদেরকে কেউ যদি বলে মুসলিম জাতির পিতা একজন কেবল হযরত ইবরাহীম আ., তারা তখন পালটা প্রশ্ন করতে জানে তবে জিন্নাহকে তোমরা বাপ ডেকেছিলে কেন? জাতিসত্ত্বার পরিচয়ের আড়ালে ‘মুজিব বিদ্বেষ’ আজ আর তাদের সম্মুখে ধোঁয়াশার তৈরী করে না।
তারা স্বীকার করতে দ্বিধা করে না যে, তাদেরই একদল বয়স্ক মাতৃভূমির বিরোধিতা করে কোন একদিন পাকিস্তানের গোলামি করেছিলো। মুসলিম লীগের নুনের মূল্য চুকাতে নিরীহ বাঙ্গালীদের উপর পাকিস্তানী আর্মির গণহত্যা ও জেনোসাইডকে হালাল করার পায়তারা চালিয়েছিলো। স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশীদের গণহারে হিন্দু বলে ঘোষণা করে তাদের সম্পদকে গনিমতের মাল আর নারীদের ধর্ষণ করা নেকির কাজ বলে ফতোয়া দিয়েছিলো। এসব তারা অকপটে স্বীকার করে৷ এই সত্যকে চেপে রেখে পঞ্চাশটা বছর পার হয়েছে, আর কত? আর কতকাল?
তাদেরকে যুগের পর যুগ নির্দিষ্ট কয়েকটি উর্দূ-ফার্সী-আরবী কিতাবের পাতায় বন্দি করে রাখা হয়েছিলো, যেন তারা বাইরের দুনিয়ায় এসে আসল সত্যটা জানতে না পারে। কিন্তু তারা সেই দেয়াল ডিঙ্গিয়ে ঠিকই বাইরে বেরিয়ে এসেছে। বয়স্কদের রাজাকারী আর দালালির ইতিহাস পড়ে তাদের ভুল ভেঙ্গেছে। হুমায়ুন আহমদের টিয়া পাখির মত তারাও চিৎকার করে বলতে পারে ‘তুই রাজাকার’ ‘তুই রাজাকার ‘।
আজ মাদরাসা ছাত্ররা জানতে চায়। তারা আজ জানে বাংলাদেশ, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, পাকিজম, যুদ্ধাপরাধ, মানবতা বিরোধী অপরাধ আর পাকিস্তানীদের বর্বরতা সম্পর্কে। ত্রিশ লাখের বেশি শহীদের রক্ত আর দু’লক্ষাধিক নারীর সম্ভ্রমের হিসেব তাদের কাছে এখন মোটেও দুর্বোধ্য নয়৷ স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান আর ঘোষণাপত্র পাঠ দুটিকে গুলিয়ে মানুষকে গেলানোর হঠকারিতা সম্পর্কেও তারা বেখবর নয়।
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সব ধরণের হিংসা ও মিথ্যার রহস্য তারা জানে। তারাও পাকিস্তানীদের বিচার চায়, ঘাতক দালাল রাজাকারদের ফাঁসি চায়, প্রতিটি মাদরাসাকে তারা গড়ে তুলতে চায় একেকটি জীবন্ত গণআদালতে। আবেগ বিজড়িত কণ্ঠে হৃদয়ের গভীর থেকে তারাও উচ্চারণ করতে চায়— ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’
লেখক : আলেম মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম ফোরামের দপ্তর সম্পাদক ও সমাজ বিশ্লেষক


