৯৩ ভাগ করোনা বর্জ্য নিয়ে প্রশ্ন, যাচ্ছে কোথায়?

৯৩ ভাগ করোনা বর্জ্য নিয়ে প্রশ্ন, যাচ্ছে কোথায়?

৯৩ ভাগ করোনা বর্জ্য নিয়ে প্রশ্ন, যাচ্ছে কোথায়?

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : সচেতন নাগরিক হিসেবে দিনভর মাস্ক পরে বাসায় ফিরে হ্যাঁচকা টানে সেটা ছুড়ে মারলেন রান্নাঘরের ময়লার ঝুড়িতে। তারপর হাতে হাতে সেটা চলে গেলো ডাস্টবিনে। ওদিকে ওপরতলার ফ্ল্যাটে আইসোলেশনে থাকা কোভিড আক্রান্ত আরেকজনের এটাসেটা বর্জ্যের শেষ ঠিকানাও হলো সেই একই ডাস্টবিন। বর্জ্যের হাত ধরে এভাবেই ওঁৎ পেতে থাকার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে কোভিড-১৯।

তালিকাটা শুধু মাস্কেই আটকে নেই। পিপিই, গ্লাভস ও রোগীর ব্যবহৃত যাবতীয় সামগ্রী নিয়ে দেখা দিচ্ছে নতুন সংকট। মোকাবিলা করতে মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চটজলদি আধুনিকায়ন ও সমন্বিত নীতিমালা তো লাগবেই, সাধারণ মানুষের সচেতনতাটাও খুব জরুরি। তা না হলে গোটা দেশের আনাচেকানাচে ঘাপটি মেরে বসে থাকবে সরব এ ঘাতক।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে সরকার চলতি বছরের ৩০ মে ঘরের বাইরে মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে। স্বাস্থ্যকর্মীরা ব্যবহার করছেন পিপিই। ব্যবহারের পর এসবই হয়ে যায় কোভিড বর্জ্য। বাসাবাড়ি ও চিকিৎসাকেন্দ্রে কোভিড-১৯ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতর ও পরিবেশ অধিদফতরের জারি করা নির্দেশিকা ও গণবিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও দেশজুড়ে তার বাস্তবায়ন নেই।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের গবেষণায় দেখা গেলো, কোভিড মহামারিতে স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও চিকিৎসা বর্জ্যের মাত্র ছয় দশমিক ছয় ভাগের সঠিক ব্যবস্থাপনা হয়। বাকি ৯৩ ভাগ পড়ে থাকছে আমাদেরই আশপাশে! মেডিক্যাল বর্জ্য নিয়ে কাজ করে একটিমাত্র বেসরকারি সংগঠন ‘প্রিজম’ বাংলাদেশ। করোনার শুরুর দিকে তারা বিভিন্ন হাসপাতাল এবং বাসাবাড়িতে জমা হওয়া বর্জ্যের জন্য দুই সিটি করপোরেশনের সঙ্গে একযোগে কাজ করছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্র জানায়, শুরুর দিকে এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের তৎপরতা থাকলেও এখন আর কেউ তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না। ঢাকার সরকারি-বেসরকারি ২৭টি হাসপাতালের সঙ্গে কাজ করছে প্রিজম বাংলাদেশ। এগুলো থেকে কোভিড বর্জ্য সংগ্রহ হয় প্রায় দুই হাজার কেজি!

জানা যায়, কোভিড হাসপাতালগুলো তাদের উৎপন্ন বর্জ্য বায়োসেফটি ব্যাগ ব্যবহার করে বাতাসনিরোধী (এয়ারটাইট) অবস্থায় সংরক্ষণ করে এবং প্রিজম বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন-এর কর্মীরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে সংরক্ষণকৃত বর্জ্যের ব্যাগে প্রথমে শক্তিশালী জীবাণুনাশক ছিটিয়ে দেয়। তারপর বিশেষায়িত কাভার্ড ভ্যানে সেগুলো নিয়ে যায় মাতুয়াইলে অবস্থিত মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্টে। ইনসিনারেটরে উচ্চ তাপমাত্রায় (১২০০-১৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয় ওই বর্জ্য।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ও ইনফেকশাস রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফরহাদ উদ্দিন হাছান চৌধুরী মারুফ বলেন, ‘মাস্ক, গ্লাভস ব্যবহারের পর রাস্তাঘাটে ফেলে দেওয়া বা ঠিকমতো ব্যবস্থাপনা না করাটা চরম ঝুঁকিপূর্ণ।’ রাস্তাঘাট থেকে শিশুরাও এ ধরনের বর্জ্য সংগ্রহ করছে মন্তব্য করে ডা. ফরহাদ উদ্দিন হাছান চৌধুরী মারুফ বলেন, ‘ওদের তো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অবস্থা নেই। ওরাও করোনা ছড়ানোর সোর্স হিসেবে কাজ করবে।’ গবেষণায় দেখা গেছে, সারাদেশে চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রগুলো থেকে প্রতিদিন প্রায় ২৪৮ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। যার মাত্র ৩৫ টন ব্যবস্থাপনার আওতায়। এর অধিকাংশই ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। আবার মাস্কসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার করছে ৭১ ভাগ মানুষ। তাদের মাস্ক ও অন্যান্য করোনা বর্জ্য পুরোটাই গৃহস্থালি বর্জ্যের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।

পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাও জানিয়েছেন, তারা প্রায় সব বাড়ি থেকেই গৃহস্থালি বর্জ্যের সঙ্গে মাস্ক ও গ্লাভস পাচ্ছেন। ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ বলেন, গত মে মাসে শুধু ঢাকাতেই ৩ হাজার টন মেডিক্যাল বর্জ্য তৈরি হয়েছে। এ থেকেই বোঝা যায়, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য কী বিপদ অপেক্ষা করছে। ‘মেডিক্যাল ওয়েস্ট আগে থেকেই বড় সমস্যা ছিল। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কোভিড ওয়েস্ট।’ প্রিজম বাংলাদেশ-এর নির্বাহী পরিচালক খোন্দকার আনিসুর রহমান আরও বলেন, ‘দুই সিটি করপোরেশনের সঙ্গে এ নিয়ে বহুবার কথা হয়েছে। উত্তর সিটি করপোরেশন পাঁচটি জোন ভাগ করে বাড়ি থেকে সংগৃহীত কোভিড ওয়েস্ট আমাদের দিচ্ছে। কিন্তু দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কিছু করতে পারেনি। আমাদের কিছু বলেওনি।’

প্রতিষ্ঠানটির ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, “সব হাসপাতালেই কোভিড-নন কোভিড রোগীর চিকিৎসা হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে বায়োসেফটি ব্যাগে কোভিড বর্জ্য এয়ারটাইট করে দেওয়ার জন্য শুরু থেকেই বলা হয়েছিল। তাহলে সরাসরি আমরা ইনসিনারেটরে দিয়ে দিতে পারি। কিন্তু পিপিই’র বর্জ্য ম্যানেজ করা কঠিন। কারণ পিপিই-র ফেব্রিক ইনসিনারেটরে দিলে তাপ বেড়ে যায় এবং ইনসিনারেটর দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। অবশ্য কিছু করার নেই। এভাবেই চালিয়ে যেতে হচ্ছে।’

বাসা থেকে কোভিড বর্জ্য আলাদা করে রাখার জন্য জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে গত জুনের দিকে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমোডর এম সাইদুর রহমান বলেন, ‘প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার আমাদের কর্মীরা ওই বর্জ্য নিয়ে আসবে। এরপর তারা আলাদা করে রাখবে এবং পরে প্রিজম বাংলাদেশ নিয়ে যাবে।’ কিন্তু এখন সেভাবে হচ্ছে কিনা প্রশ্ন করলে সাইদুর রহমান বলেন, ‘এখন জোরালোভাবে হচ্ছে না। মানুষের গা-সওয়া হয়ে গেছে। মাস্কও সেভাবে পরছে না। আমরা আলাদা করে আবার নির্দেশনা দিতে পারি। কিন্তু সমস্যা হলো বাসাবাড়িতে কেউ আর আলাদা করে কোভিড বর্জ্য রাখছে না। আমরাও আলাদা করে পাচ্ছি না।’

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *