৯ মাসে ৬ শ্রেণির বই মুখস্ত করেছিলেন ফখরে বাঙ্গাল

৯ মাসে ৬ শ্রেণির বই মুখস্ত করেছিলেন ফখরে বাঙ্গাল

৯ মাসে ৬ শ্রেণির বই মুখস্ত করেছিলেন ফখরে বাঙ্গাল

আমিনুল ইসলাম কাসেমী :: ফখরে বাঙ্গাল তাজুল ইসলাম রহ, এর কথা শুনতাম, প্রিয় উস্তাদ, জামেয়া শারইয়্যাহ মালিবাগের সাবেক মুহাদ্দিস- শায়খুল হাদীস, মাওলানা ফয়জুদ্দীন রহ.-এর কাছ থেকে। তিনি ছিলেন ফখরে বাঙ্গাল এর অন্যতম শাগরেদ।আমরা ফয়জুদ্দীন রহ. এর কাছে বুখারী শরীফ দ্বিতীয় খণ্ড কিতাবুল মাগাজী থেকে শেষ পর্যন্ত পড়েছি। প্রতিদিন বাদ এশা ক্লাস হত। একটানা দুই ঘণ্টা। কখনো সময় বেশী চলে যেত। গভীর রাত পর্যন্ত বুখারী শরীফের দরসে শরীক হয়েছি।

মাওলানা ফয়জুদ্দীন সাহেব রহ. কে দেখতাম, প্রিয় উস্তাদ ফখরে বাঙ্গাল তাজুল ইসলাম রহ.-এর প্রতি গভীর ভালবাসা। উস্তাদের কথা নকল করে শোনাতেন। হাদীসের ক্লাসে বারবার উদ্ধৃতি দিতেন। ফখরে বাঙ্গাল থেকে যা যা শুনেছেন, সবই উপস্থাপন করতেন। প্রতিটি হাদীসের ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে ফখরে বাঙ্গাল সাহেব কি ব্যাখ্যা করেছিলেন, সেটাও আমাদের সামনে পেশ করতেন। উস্তাদের চাল- চলন, ওঠা- বসা, তাঁর দরস, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে তাঁর কি অবদান ছিল, সবই আমরা শুনতে পারতাম। এক কথায় অসম্ভব উস্তাদ ভক্তি ছিল মাওলানা ফয়জুদ্দীন সাহেবের।

সেই থেকেই ফখরে বাঙ্গাল তাজুল ইসলাম রহ, এর সম্পর্কে জানা শুরু হয়। তখন থেকে অনেক ভক্তি- ভালবাসা জন্মে যায়। আরো জানার আগ্রহ হয় তাঁর প্রতি। কি এক রত্ন আমাদের দেশের। কি এক সম্পদ। ছোট্ট বাংলাদেশের মধ্যে এমন প্রতিভাধর, এমন মেধাবী আলেমের জন্ম হয়েছে। এটা আমাদের গৌরবের বিষয়। এ মহামনীষীর জগৎজোড়া খ্যাতি ছিল। এদেশের জন্য তিনি সুনাম- সুখ্যাতি বয়ে নিয়ে এসেছেন বারবার। বাঙালি সন্তান হয়েও তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ আসনে। বাংলাদেশের অজপাড়াগায় জন্ম নিয়ে বিশ্ববরেণ্য আলেম হয়েছেন। বিশ্বের খ্যাতনামা পণ্ডিতদের পিছে ফেলে দিয়েছেন। তাঁর ইলম, তাঁর মেধা- মননশীলতা ছিল সবার ঊর্ধ্বে।

একজন তুখোড় মেধাবী আলেম ছিলেন ফখরে বাঙ্গাল তাজুল ইসলাম রহ.। তাঁরমত মেধাবী আলেম বাংলাদেশের জমিনে খুব কম জন্মগ্রহণ করেছেন। তীক্ষ্ম মেধা। অসম্ভব ছিল উপস্থিত জ্ঞান।হাদীসের কিতাবগুলো ছিল নখদর্পনে। সেই সাথে স্বচ্ছ ধারণা। আকাবির – আছলাফগণের চিন্তা- চেতনার সাথে বড্ড মিল ছিল। এত্ত মেধাবী আলেম হয়ে কখনো পুর্বসুরীদের মতপথ থেকে সরে যান নি। পুরোপুরি পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছেন। দারুল উলুম দেওবন্দের মেধাবী মুখ। পুরোযিন্দেগী দেওবন্দী চিন্তাধারায় চলেছেন।
একজন মর্দে মুজাহিদ। রাজপথের অগ্নিপুরুষ। তিনি বুখারী পড়েছিলেন, আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ.-এর কাছে। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক গুরু ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সিপাহসালার সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ.। আধ্যাত্মিকতার সবক এবং রাজনৈতিক সবক সবই মাদানীর কাছ থেকে নেওয়া। মাওলানা মাদানী এই উপমহাদেশের মুক্তি আন্দোলনে যেভাবে বুক পেতে দিয়েছিলেন। ইস্পাত- কঠিন মজবুতভাবে এগিয়েছিলেন ব্রিটিশ- বেনিয়াদের বিরুদ্ধে, ঠিক ফখরে বাঙ্গাল সেই আন্দোলের একজন সক্রিয় কর্মী, মুজাহিদ এবং নেতা।

এই মহান অগ্নিপুরুষ তাঁর জীনটাও সঁপে দিয়েছিলেন মুক্তিকামী মানুষর জন্য। এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। লড়াকু সৈনিক। তিনি বেশী অবদান রেখেছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে কাদিয়ানীদের উপদ্রব ঠাণ্ডা করতে। যেখানে ফেরআউন সেখানেই মুসা। কাদিয়ানীরা যেভাবে উৎপাত শুরু করেছিল, সেটার জওয়াবে তিনি বীর মুজাহিদের ভূমিকা পালন করেছিলেন। সেই প্রায় একশত বছর আগের কথা। সেই সময়ে খোদাদ্রোহী শক্তির বিরুদ্ধে ছিল তাঁর বজ্র হুঙ্কার। বিন্দু পরিমাণ আপোস ছিল না বাতিলের সঙ্গে।
ছাত্র জীবন থেকেই ফখরে বাঙ্গাল বাতিলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। দারুল উলুম দেওবন্দে পড়াকালীন বিভিন্ন সময়ে ফেরাকে বাতেলার বিরুদ্ধে মুনাজারায় শরীক হতেন। দেওবন্দ মাদ্রাসা থেকে ট্রেনিং নিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তেন। বাতিলকে পরাজিত না করে ঘরে ফিরতেন না।

কাদিয়ানীদের বহু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছিলেন তিনি। একবার দেওবন্দ এলাকায় কাদিয়ানীরা বহাস করার জন্য এসেছিল। তিনি তখন মেশকাত জামাতের ছাত্র। কাদিয়ানীরা আরবী কবিতা বানিয়ে দেওবন্দীদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল। ফখরে বাঙ্গাল সাহেবকে তাঁর উস্তাদগণ পাঠালেন তাদের মোকাবেলা করার জন্য। কাদিয়ানীদের আরবী কবিতার ভুল ধরলেন তিনি। আবার তাদের কবিতার জওয়াবে ৭০টি আরবী কবিতা লিখেছিলেন।

এই ক্ষণজন্মা মনীষীর অসম্ভব মেধা ছিল। যে মেধার তুলনা হয় না। এযেন বাংলার কাশ্মিরী রহ.। হযরত আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী যেমন কোন জিনিস একবার পড়লে এগারবছর মনে থাকত। সেরকম মেধা শক্তি ছিল ফখরে বাঙ্গালের।

জন্ম : ১৮৯৬ সনে ব্রাম্মণবাড়িয়া জেলার নাছিরনগর উপজেলার ভুবন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ফখরে বাঙ্গাল তাজুল ইসলাম। তাঁর পিতার নাম, মাওলানা আনোয়ার আলী।

শিক্ষা জীবন : ফখরে বাঙ্গাল তাজুল ইসলাম আট বছর বয়স পর্যন্ত কোন স্কুল বা মাদ্রাসায় ভর্তি হননি। তিনি মাঠে ছাগল চরাতেন। এভাবে চলে যাচ্ছিল সময়। একদিন তাঁর পিতা চিন্তা করলেন, ছেলেটা বড় হয়ে যাচ্ছে, কোন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা দরকার। তাই তাঁকে স্থানীয় প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি করানো হল। মাত্র নয় মাস তিনি স্কুলে পড়েছিলেন। এই নয় মাসে ৬ষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত সকল বই তিনি মুখস্থ করে নেন।

তিনি বাড়িতে এসে কোন লেখাপড়া করতেন না। তাঁর পিতা একদিন, জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার? তুমি তো বাড়িতে কোন লেখাপড়া করছ না। তিনি পিতাকে বলেছিলেন, কী পড়ব? ৬ষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত সব বই মুখস্থ করে ফেলেছি।

ফখরে বাঙ্গালের এমন ধী- শক্তি দেখে তাঁর পিতা মাদ্রাসায় ভর্তি করার সিদ্ধান্ত নিলেন। কেননা , এত বড় মেধাবী ছাত্র দ্বীনের লাইনে না থাকলে বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারে। স্কুল থেকে বিদায় নিয়ে প্রথমে কিছু দিন জেঠা গ্রামের মাওলানা আব্দুল করীমের নিকট প্রাথমিক কিতাবাদি পড়াশুনা করেন। এরপর ” শ্রীঘর ” মাদ্রাসায় ভর্তি হন। শ্রীঘর মাদ্রাসায় কিছুদিন পড়াশুনা করার পর তিনি হবিগঞ্জের বাহুবল মাদ্রাসায় ভর্তি হন।

বাহুবল মাদ্রাসা থেকে যথাসময়ে সুনামের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি তৎকালীন সময়ে বাংলা- আসামের উল্লেখযোগ্য দ্বীনি প্রতিষ্ঠান সিলেট আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সিলেট আলিয়ার প্রধান মুহাদ্দিস ছিলেন, প্রখ্যাত আলেমেদ্বীন দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান মুফতী আল্লামা সহুল উসমানী ভাগলপুরী রহ.। একজন উঁচু স্তরের আলেম ছিলেন তিনি। ফখরে বাঙ্গাল যখন সিলেট আলিয়াতে ভর্তি হতে যান, প্রথম দর্শনেই সহুল উসমানী সাহেব বলে ফেলেন, এ যুবক ভবিষ্যতে খ্যাতনামা আলেম এবং বুজুর্গ হবে।

সিলেট আলিয়াতে আল্লামা সহুল উসমানী সাহেবের তত্বাবধানে লেখাপড়া করেছিলেন। যেমন উস্তাদ তেমন শাগরেদ। মাঝে মাঝে ফখরে বাঙ্গাল আরবীতে প্রবন্ধ লিখে উস্তাদকে দেখাতেন, তাতে তিনি হতবাক হয়ে যেতেন। সিলেট আলিয়ার সর্বশেষ পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। এরপরে উস্তাদের পরামর্শে দারুল উলূম দেওবন্দে গমন করেন।
দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি : দারুল দেওবন্দে যাওয়ার বিষয়ে তাঁর প্রিয় উস্তাদ আল্লামা সহুল উসমানীর অবদান। উস্তাদ চিন্তা করলেন, সিলেটেই যদি তাজুল ইসলামের জীবন কেটে যায়, তাহলে উচ্চশিক্ষা থেকে মাহরুম হয়ে যাবে। তাই শাগরেদকে নিয়ে মাদারে ইলমী দেওবন্দে ছুটে চললেন। এক আজব বিষয়, সেসময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা ততো ভাল নয়। তারপরেও প্রিয় শাগরেদের ভবিষ্যত উজ্জ্বল করার মানসে দারুল উলুমে নিয়ে গেলেন।

আল্লামা তাজুল ইসলাম রহ. ১৩৩৮ হিজরীতে দারুল উলূম দেওবন্দে ভর্তি হন। দারুল উলুমে মোট চারবছর লেখাপড়া করেন। হাদীস, তাফসীর, ফিকাহ, আকাঈদ,আরবী সাহিত্য তিনি অধ্যায়ন করেন। দেওবন্দেই তাঁর মেধার বিকাশ ঘটেছিল। সেখানে সনদসহ কয়েক হাজার সহী হাদীস এবং বিখ্যাত ফিকাহগ্রন্থ “হেদায়া ” তিনি কণ্ঠস্থ করেন।
দারুল উলূম দেওবন্দে তাঁর উস্তাদবৃন্দ : তদানীন্তন বিশ্বের খ্যাতনামা আলেম, যুগের ইমাম আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ., আল্লামা সাব্বির আহমাদ উসমানী রহ., শায়খুল আদব এ’জাজ আলী রহ., মুফতী আজিজুর রহমান রহ., আল্লামা ইব্রাহিম বলিয়াবী রহ. এবং মিয়া সাহেব সৈয়দ আসগার হোসাইন রহ.,
এছাড়া শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ., ছিলেন আধ্যাত্মিক এবং রাজনৈতিক রাহবার। হযরত মাদানীর কাছ থেকে ইলমে মারেফত এবং রাজনীতি উভয় আত্মস্থ করেছিলেন।

দারুল উলুম দেওবন্দে তিনি “তার্কিক আলেম” হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। দারুল উলুমের উস্তাদগণ তাকে কাদিয়ানী এবং রাফেজীদের সাথে বিতর্ক অনুষ্ঠানের জন্য ভারতের বিভিন্ন জায়গায় পাঠাতেন। এবং অত্যন্ত সুনামের সাথে তিনি সেসব বিতর্ক অনুষ্ঠানে জয়ী হতেন।

একবার দেওবন্দে কাদিয়ানীরা মির্জা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর এক কাব্যগ্রন্থ এনে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল, “এটা ওহী গ্রন্থ। আল্লাহর পক্ষ থেকে গোলাম আহমাদ-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে। তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তাহলে এর সমমানের কবিতা রচনা করে মোকাবেলা কর।

সেদিন আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মারীর নির্দেশে ফখরে বাঙ্গাল তাজুল ইসলাম সাহেব, ৭০টি আরবী কবিতা রচনা করে তাদের দাঁতভাঙ্গা জওয়াব দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, কাদিনীদের কাব্যগ্রন্থের আরবী ব্যাকরণগত ভুল ধরে দিয়েছিলেন।

অত্যন্ত মেধা- ধী-শক্তির পরিচয় দিয়েছিলেন তাজুল ইসলাম সাহেব। যেরকম মেধা, তেমন সাহসিকতা, আত্মবিশ্বাস ছিল তাঁর।

ফখরে বাঙ্গালের একজন শাগরেদ মুফতী নুরুল্লাহ সাহেব বলেন, আমরা যখন দেওবন্দে যাওয়ার ব্যাপারে প্রস্তুতি নিলাম। তখন তিনি আমাদের সাথীদের এভাবে নসীহত করলেন, দেখ, তোমরা দেওবন্দে যাচ্ছ, কিছু নিয়ে আসা চাই। নির্ভীক ভাবে লেখাপড়া করতে হবে। তিনি আরো বলেছিলেন, আমি যখন দেওবন্দে পড়ি, তখন মনে হত, বিশ্ববিখ্যাত শায়খুল আদব এজাজ আলী সাহেব আরবীতে একটা প্রবন্ধ লিখবে, আবার আমি একটা লিখব।দেখা যাবে কারটা বেশী ভাল হয়।

মানে অসম্ভব ক্ষুরধার প্রতিভা এবং আত্মবিশ্বাস ছিল তাঁর মধ্যে।

কর্মজীবন : ১৩৪২ হিজরীতে তিনি দেওবন্দ থেকে ফিরে প্রথমে ঢাকায় এরপর কুমিল্লাস্থ জামিয়া মিল্লিয়াতে শায়খুল হাদীস পদে দ্বীনি খেদমত শুরু করেন। এসময়ে কুমিল্লাতে তাঁর সহকর্মী হিসেবে ছিলেন, কিশোরগঞ্জের মাওলানা আতহার আলী রহ.।

সেসময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে অবস্থান করছিলেন, ভারতের উত্তরপ্রদেশের মোজাফ্ফর নগরের অধিবাসী,প্রখ্যাত আলেমেদ্বীন ওবুজুর্গ মাওলানা ইউনুছ রহ.। যিনি দারুল উলুম দেওবন্দের মজলিসে শুরার সদস্য ছিলেন। একজন বাগ্মি এবং খ্যাতিমান আলেম হিসেবে তাঁর ব্যাপক পরিচিতি ছিল।

ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে সেসময় কাদিয়ানীদের উপদ্রব দেখা দেয়।বহু মুসলমান কাদিয়ানীদের খপ্পরে পড়ে ঈমানহারা হয়ে পড়ে। এসব দৃশ্যে জনাব ইউনুছ সাহেবের প্রাণ কেঁদে ওঠে। তাই তিনি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেন। ব্রাহ্মণবাড়িতে গড়ে তোলেন বিশাল জামেয়া। যেটা আজ আমাদের বাংলাদেশের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান জামেয়া ইউনুছিয়া।
এ প্রতিষ্ঠানে সেসময়ে দেশের প্রতিভাধর আলেমদের একত্র করেন মাওলানা ইউনুছ সাহেব। প্রিন্সিপাল হিসেবে তখন ছিলেন, আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. আরো যারা শিক্ষক ছিলেন, মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ. আব্দুল ওহাব পীরজী হুজুর রহ. মাওলানা সিরাজুল ইসলাম রহ. । এসব খ্যতিমান বুজুর্গ আলেমদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি খুব তাড়াতাড়ি উন্নতির শিখরে পৌঁছে যায়।

বেশ কয়েকবছর পরে আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. এবং হাফেজ্জী হুজুর রহ. ঢাকাতে আশরাফুল উলুম বড় কাটরা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তিতে উনারা ঢাকায় চলে আসেন। তখন বিবাড়ীয়াতে মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল পদে সংকট দেখা দেয়। মাওলানা ইউনুছ সাহেব তখন এই বাংলা-আসামের খ্যাতিমান আলেম এবং প্রতিভাবান ব্যক্তি হিসেবে ফখরে বাঙ্গাল তাজুল ইসলামকে প্রিন্সিপাল হিসেবে নিয়োগ দেন।

১৩৪৫ হিজরী ফখরে বাঙ্গাল তাজুল ইসলাম সাহেব জামেয়া ইউনুছিয়ার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। একটানা ৪২ বছর মোহতামিম এবং শায়খুল হাদীস হিসেবে তিনি দায়িত্বরত ছিলেন।

ফখরে বাঙ্গালের উল্লেখযোগ্য কিছু ছাত্র

১/ মুফতী রিয়াযতুল্লাহ রহ. ব্রাহ্মণবাড়িয়া। খ্যতিমান আলেম এবং বুজুর্গ ছিলেন। ১৯৭৪ সনে ইন্তেকাল করেন।

২/ ডঃ আব্দুল হক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

৩/ মাওলানা আব্দুর রহমান শায়েখে ধুলিয়া, হবিগঞ্জ।

৪/ মাওলানা আব্দুল হক গাজীনগরী। সিলেট।

৫/ মাওলানা সৈয়দ তবারক আলী, হবিগঞ্জ।

৬/ মাওলানা ফয়জুদ্দীন রহ.। মালিবাগ জামিয়া ঢাকা এর শায়খুল হাদীস ছিলেন।

৭/ মুফতী নুরুল্লাহ। ফখরে বাঙ্গালের স্নেহধন্য ছাত্র। ছাত্রজীবনে তিনি যখন মেশকাত জামাতে পড়েন, সেসময়ে আরবীতে ফখরে বাঙ্গালের জীবনী লিখেছিলেন।

একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ তাজুল ইসলাম

ফখরে বাঙ্গাল তাজুল ইসলাম একজন প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব ছিলেন। যার সামনে যে কেউ মুখ পাততে পারত না। তাঁর অকল্পনীয় যোগ্যতা ছিল। অনেক অনেক বড় আলেমকে দেখা যেত তাঁর সামনে সন্ত্রস্ত অবস্থায় থাকতে। যে কেউ তাঁর সামনে কুরআন – হাদীসের আলোচনা এবং বয়ান করার সাহস রাখত না। তাঁর ইলমের সৌরভ ছড়িয়ে পড়েছিল সব জায়গাতে। দেশ- বিদেশের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্ণধারগণ তাঁকে অফার দিত তাদের প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করার জন্য।

১৯৫০ সনে তদানীন্তন শিক্ষামন্ত্রী আব্দুল হামিদ চৌধুরী এবং চীফ সেক্রেটারী এম এন খান ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় সদরুল মুদাররিসীন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার জন্য ফখরে বাঙ্গালকে অনুরোধ জানান। এমনিভাবে কোলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার পক্ষ থেকে অধ্যাপনার জন্য অফার দেওয়া হয়। সব প্রস্তাব তিনি হাসিমুখে প্রত্যাখ্যান করেন।

এমনকি আরো অবাক হব আমরা, ফখরে বাঙ্গাল দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে যখন তিনি ফারেগ হন,সেসময়ে আল্লামা আনোয়ারশাহ কাশ্মিরী রহ. তাঁকে দারুল উলুমে অধ্যাপনার সুযোগের কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু ফখরে বাঙ্গালের পিতা দেশে ফিরতে বলেছিলেন। পিতার নির্দেশ বড় বিধায় তাঁকে উস্তাদগণ দেশে ফিরে পিতার খেদমতে মনোনিবেশের কথা বলেন।

এই ভারতবর্ষসহ বহির্বিশ্বে তিনি পরিচিত ছিলেন। আরব, আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোতে ফখরে বাঙ্গালের সুনাম- সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৯৬৩ সনে মিসরের রাজধানী কায়রোতে বিশ্ব ওলামা সন্মেলনে তিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন।

বিশ্ববিখ্যাত আরবী সাহিত্যিক বিন্নোরী রহ. পাকিস্তান, তিনি বলেন, উক্ত সন্মেলনে ফখরে বাঙ্গালের বক্তব্যকে আমরা সমর্থন জানিয়েছি।তাছাড়া আমরা ভারত এবং পাকিস্তানের কেউ নতুন কোন বক্তব্য দেইনি।

উক্ত সন্মেলনে ইজতেহাদ সম্পর্কে ফখরে বাঙ্গালের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। অনেক বিজ্ঞ ব্যক্তিদের মত ছিল, আমরা বিভিন্ন দেশের বড় বড় ১০০জন আলেম মিলে কোন বিষয়ে ইজতেহাদ করতে পারি। উত্তরে ফখরে বাঙ্গাল বলেছিলেন, ইজতেহাদ এর দরজা বন্ধ নয়।এখনো খোলা। তবে সেরকম যোগ্যতা সম্পন্ন লোক নেই। সেরকম আবু হানিফা রহ. নেই, শাফেয়ী রহ. নেই।

বর্তমানের ১০০ আলেম একত্র করলে কি একজন আবু হানিফা বা শাফেয়ী হতে পারবে? কোনদিন পারবে না।  তিনি আরো বলেন, যুদ্ধের ময়দানের একশত গাধা কি একটা ঘোড়ার সমতুল্য হতে পারবে? কোনদিন হবে না। তদ্রুপ বর্তমানে আমরা যত বড় আলেম হই না কেন, সে যুগের কোন ইমামের সমতুল্য হওয়া যাবে না।

ফখরে বাঙ্গালের রাজনীতি

ফখরে বাঙ্গাল যখন জন্মগ্রহন করেন,তখন এদেশে চলছিল ব্রিটিশ শাসন। ব্রিটিশ বেনিয়ারা এদেশে সেবার নামে এসে এই সোনার দেশকে দখল করে নেয়। পুরো ভারতবর্ষ চলে যায় তাদের আয়ত্বে। এদেশের উপর জুলুম অত্যাচার চালাতে থাকে ইংরেজবাহিনী। এভাবে জুলুম নির্যাতেন সীমা ছড়িয়ে যায়। বিশেষ করে আলেম সমাজের প্রতি ব্রিটিশ বাহিনীর ছিল চরম ক্ষোভ। কেননা, আলেমগণ কখনো ব্রিটিশদের শাসন মেনে নেয়নি। তাইতো অবিরাম ভাবে নির্যাতন করেছে তারা আলেম সমাজের উপর। হাজার হাজার আলেমকে শহীদ করে দিয়েছে। কোলকাতার শেরশাহসুরী রোডের দিল্লি পর্যন্ত এমন কোন বৃক্ষ বাকি ছিল না যেখানে আলেমদের ফাঁসি দেওয়া হয়নি। ইতিহাসের জঘন্যতম অধ্যায় ছিল সেটা।

দেশের এসব পরিস্থিতি দেখে আমাদের পুর্বসুরী ওলামায়ে কেরাম দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু করেন। দেশ কে বাঁচাতে,দেশের মানুষকে বাঁচাতে, ইসলামকে হেফাজত করার মানসে তারা সংগ্রাম শুরু করেন। তারই ধারাবাহিকতায় দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হয়। কাসেম নানুতবী রহ.-এর গোড়পত্তন করেন। শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী রহঃ রেশমী রুমাল আন্দোলনের ডাক দেন। এমনিভাবে হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজেরে মক্কী রহ,, রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ, সকলেই ছিলেন সে আন্দোলনের সিপাহসালার। ঐ সকল মুজাহিদ এবং বুজুর্গদের ইন্তেকালের পরে এ আন্দোলনের নেতৃত্বদেন শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ.।

আমাদের ফখরে বাঙ্গাল তাজুল ইসলাম সাহেব ছিলেন সেই স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন মুজাহিদ। দেওবন্দ থেকেই তিনি সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ,, এর থেকে রাজনৈতিক দীক্ষা নেন। এবং দেশে এসে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ইংরেজ খেদাও আন্দোলনের এক মহান ব্যক্তিত্ব ছিলেন ফখরে বাঙ্গাল।

স্বাধীনতা আন্দোলনে এই দেশে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন, মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন রহ. মাওলানা মোখলেসুর রহমান রহ. মাওলানা আব্দুল করীম শায়েখে কৌড়িয়া রহ. মাওলানা আতহার আলী রহ. মাওলানা আশরাফ আলী ধর্মন্ডলী রহ.প্রমুখ ওলামায়ে কেরাম।

মোটকথা, একজন মেধাবী আলেমদ্বীন, একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ, একজন খ্যাতনামা বুজুর্গ ছিলেন ফখরে বাঙ্গাল। আমাদের এই দেশের গৌরব ছিলেন তিনি। এমন প্রতিভাবান আলেমের দেখা মেলেনা সহজে। চতুর্মুখী জ্ঞানসম্পন্ন এক ব্যক্তিত্ব। আজ অনেকই আমরা সেই মহান ব্যক্তি সম্পর্কে জানি না। বাংলাদেশের অহংকার। আলেম সমাজের গৌরব ছিলেন।

এই ক্ষণজন্মা মনীষী ১৯৬৭ সনে ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতে সুউচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *