‘মনে হইছে আবার ৭০ সাল আইছে’

‘মনে হইছে আবার ৭০ সাল আইছে’

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ভোলার ভেদুরিয়া লঞ্চঘাটে মঙ্গলবার দুপুরে সাধারণ সময়ের মতোই ব্যস্ততা। স্পিডবোট থেকে নামতেই সিএনজি অটোরিকশা, মোটরসাইকেলচালক ও টেম্পোচালকদের হাঁকডাক। মোটরসাইকেলে চেপে শহরের বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার পথে কথা হয় চালকের সঙ্গে। ‘সিত্রাংয়ে কোন এলাকায় বেশি ক্ষতি হয়েছে জানেন?’

এ প্রশ্ন শুনে রাশেদ নামের চালকের পাল্টা প্রশ্ন, ‘কী কনটন (কী বলেন?) কিসের ক্ষতি! তবে আমরা অনেক ডরাইছি। অনেক গাছপালা পড়ছে। দেখেন, কেমন ঝকঝকে রোদ আর পরিষ্কার চাইরপাশ। কেউ কইবো ঝড় হইছে!’ রাশেদ রাস্তার পাশে পড়ে থাকা গাছের ডালপালা দেখিয়ে বলেন, বড় ঝাপটা দিছে। তবে তেমন কিছু হয় নাই।’

রাশেদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রুবেল নামের আরেক চালকের মোটরসাইকেলে যাত্রা শুরু। ভোলা-চরফ্যাশন সড়কের সংস্কারের কাজ চলছে। ভারি বৃষ্টিতে ক্ষতি হয়েছে গোটা রাস্তার। ভোলা শহর থেকে দৌলতখান উপজেলার বাংলাবাজার, বোরহানউদ্দিন উপজেলার কয়েকটি বাজারঘাট, তজুমুদ্দিনের কুঞ্জেরহাট, লালমোহান উপজেলা হয়ে চরফ্যাশন পর্যন্ত প্রায় ৭০ কিলোমিটার সড়কের একই হাল দেখা গেছে।

ফুলের বাগান বাজার এলাকায় যাত্রাবিরতিতে কথা হয় মন্টু মিয়া নামে স্থানীয় একজনের সঙ্গে। ৫০ বছরের মন্টু বলেন, ২ নম্বর ওয়ার্ডে আমার বাড়ি। আমরা এইবার ঝড়ে প্রথমে কিছু বুঝি নাই। কাইল (সোমবার) বিকাল তনে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমার অনেক ক্ষতি হইছে। একটা আট গণ্ডার মাছের ঘের ভাইসা গেছে। আট শতাংশে এক গণ্ডা। পাঁচটা গাছ পইড়া গেছে। বিকালে মনে হইছে কঠিন কিছু হইবো। সন্ধ্যার পর আস্তে আস্তে কইমা যায়।’

লালমোহন বাসস্ট্যান্ড থেকে আরেক মোটরসাইকেলে চরফ্যাশনের উদ্দেশে যাত্রা। এবারের চালক আব্দুর রহিমও জানালেন, দুপুরের আগেই (গতকাল) রাস্তা থেকে অনেক গাছ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য মতে, ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে চরফ্যাশনের দক্ষিণ দিকে। এরই মধ্যে ভোলা জেলা প্রশাসনে যোগাযোগ করে জানা গেল, চরফ্যাশনের স্থলসীমার শেষ ভাগে মেঘনা তীরবর্তী হাজারীগঞ্জে বেশ কিছু বাড়িঘর ধসে পড়েছে।

হাজারীগঞ্জ ইউনিয়নের খেজুরগাছিয়ার দূরত্ব চরফ্যাশন পৌরসভা থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার। সেখানে পৌঁছাতে বিকেল সাড়ে ৩টা। বেড়িবাঁধের নদীর ঢালে জেলেদের ছোট আকারের শতাধিক ঘর। বাঁধের ওপরই ছোট একটি বাজার। মোটরসাইকেল থেকে নেমে হেঁটে এগোতেই চোখে পড়ল একটি ভাঙা ঘর মেরামত করছেন এক বৃদ্ধসহ পরিবারের সবাই। বৃদ্ধের নাম অজিউল্লাহ দরবেশ। জানতে চাইলে বলেন, ‘বাবা আমার বয়স ৭০ বছরের বেশি। কাইলকা আমার মনে হইছে আবার ৭০ সাল আইছে। এইবার আর বাঁচমু না!’

১৯৭০ সালের বন্যার সঙ্গে সিত্রাংয়ের পার্থক্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, তখন কোনো নম্বর না দিয়াই সরাসরি বলছে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত। এরপর জান নিয়া দৌড়াদৌড়ি। এইবার সংকেত দিলেও প্রথমে বুঝি নাই। তবে শেষ পর্যন্ত বাতাস কমছে, আর জোয়ারও আসে নাই।’ তিনি জানান, গত দুই দিন জোয়ার বাঁধের অর্ধেক অংশ পর্যন্ত উঠে গেছে। পরে নেমেছে সেই পানি।

অজিউল্লাহর ছেলে আলাউদ্দিন পেশায় জেলে। স্ত্রী, সন্তান ও বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে ঝড়ের সময় ঘরেই ছিলেন। ঘরের এক পাশের বেড়া ও চাল ভেঙে গেছে। আলাউদ্দিন বলেন, ‘আমরা কই যামু? ঘরেই আছিলাম! দুপুর বেলা ঘর ভাঙছে। সকাল তনে বাতাস বাড়ছে। আসল বইন্যা (বন্যা) হইছে দুপুর তনে বিকাল পর্যন্ত। আমরা নদীর মুখো আছি। আমরা টের পাইছি।’ ঝড়ের মধ্যে পরিবার নিয়ে বাঁধে থাকার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘কেউ তো জোর করে নাই যাইতে। বলছে রাইতে যাইতে। বাতাস তো আগেই আইলো।’

একই কথা বললেন অন্য জেলেরাও। আব্দুল মোতালেব নামের আরেক জেলের ঘরের অনেকটা অংশ ভেঙে পড়েছে। তিনি বলেন, বিকাল বেলা ঘর হইরা আমার একটা ছাগল মইরা গেছে। সন্ধ্যার আগেই পরিবার নিয়া পাশের বাড়িতে যাই।’

তিনি আরো বলেন, ‘বৃষ্টির সময় নদীর মধ্যে ঘুরাইয়া বাতাস আইছিলো। মনে হইছে দূরে সাগরের তনে হটাত হটাত গরম বাতাস ছাড়ছে। বৃষ্টি মেঘের মধ্যেও মাঝে মধ্যে ফরসা দেখা যায়। একসময় আমরা অনেক ভয় পাই। কিন্তু বাইর হইয়া যাওনের সাহস পাই নাই।’

শেষ বিকেলে বেড়িবাঁধের ঢালে বসে জাল বোনার কাজ করছিলেন কয়েকজন জেলে। তাঁদের একজন বশির নিজের ঘর দেখিয়ে বলেন, ‘আমার ঘরটা পুরাপুরি পইড়া গেছে। ভাগ্য ভালা যে আগে বাইর হইছিলাম। এখন কেমনে চলমু, কী করমু জানি না!’

বাঁধ ঘুরে দেখা গেছে নান্নু মাঝি ও মতিন নামের আরো দুই জেলের দুটি ঘর পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়েছে। তাঁরা পরিবার নিয়ে চলে গেছেন। এ ছাড়া মিজান, মতিন, রবিউল, শামছুসহ অন্তত ১০ জেলের ঘরের আংশিক ধসে পড়েছে। বাজারের ঘর ও মাছ ধরা ট্রলারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মাকসুদুর রহমান নামের এক ট্রলার মালিক বলেন, ‘চেয়ারম্যান একবার দেখতেও আসে নাই। সকালে আইসা লোকজন লিস্ট করছে। আমাগো নাম বেইচা অনেকে টাকা পাইবো। আমরা কী পামু জানি না!’

জানা গেল খাজুরগাছিয়ার মতোই বাঁধের ওপর জেলেপল্লীর বেশির ভাগ বাসিন্দাই সাইক্লোন শেল্টারে না গিয়ে নিজ নিজ ঘরেই ছিলেন। চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী অফিসার আল নোমান অবশ্য বলেছেন, প্রতিটি জেলেপল্লী এলাকাসহ চরাঞ্চলে মাইকিংসহ বিভিন্নভাবে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বলা হয়েছে। ঝড়ের পরেও দ্রুত উদ্ধারের তত্পরতা নেওয়া হয়। এসব কারণে ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *