দেওবন্দ বিমুখতা ও পাকিপ্রেম

দেওবন্দ বিমুখতা ও পাকিপ্রেম

ইবনে কাসেম কাসেমী : আমার সৌভাগ্য দারুল উলূম দেওবন্দে পড়েছি। আমার মুরুব্বীদের দুআ ছিল হয়তো। ৪৭-এর দেশ ভাগের সেই ২৩ বছরে আমার জন্ম হয়নি। স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে যে করেই হোক দারুল উলূম দেওবন্দ যেতে পেরেছি। এটা সৌভাগ্য ছাড়া কিছুই নয়।

২০১২ সাল। আমি তখন দেওবন্দে দাওরায়ে হাদিস শেষ করে তাফসীর বিভাগে অধ্যয়নরত। হঠাৎ শুনলাম বাংলাদেশের খ্যাতিমান আলেমেদ্বীন মাওলানা আবদুল মালেক সাহেব দেওবন্দ সফরে এসেছেন। দেওবন্দের বাংলাদেশী ছাত্রদের মধ্যে একটা হুলস্থূল পড়ে গেল। তারা আবেগে অতিউৎসাহী হয়ে তাঁর একটি আনুষ্ঠানিক দরসদানের চেষ্টাও করে। কিন্তু  দারুল উলূম দেওবন্দ কতৃপক্ষ এতে রাজি হননি। বাংলাদেশের এত বড় আলেমের দারস দানের বিষয়টি কেন দারুল উলূম দেওবন্দ কর্তৃপক্ষ সহজে মেনে নিতে পারলো না তা আমাকে ভাবিয়ে তুললো। আমি ঘোরের মধ্যে পড়ে গেলাম। বাঙালি বন্ধুরা যে আশাহত হলো- এটা দেখে খারাপ লাগলো।

বাঙালি শিক্ষার্থীরা দমে যায়নি। যে করেই হোক মাওলানা মালেক সাহেবকে দিয়ে তারা ক্লাসের আয়োজন করবেই। শেষে বাঙালি ছাত্ররা পুরনো দারুল হাদীসের উপরের স্থানটা যেটা দারুল হাদীস ফাওকানি নামে পরিচিত সেখানে বাংলাদেশী ছাত্ররা বাংলাভাষাভাষি ভারতীয় ছাত্রদের নিয়ে একটি ঘরোয়া দরসের আয়োজন করে। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও উড়িষ্যার ছাত্রদের বাংলাদেশী ছাত্ররা হযরত মাওলানা আবদুল মালেক সাহেবের অনেক সুনাম করে তাদেরকেও এই দরসে উপস্থিত হওয়ার জন্য জোর তাগিদ দেয়। পশ্চিম বাংলা ও আসাম ও উড়িষ্যার বেশকিছু ছাত্র উপস্থিতও হয়। আমাকেও টানে। উপস্থিত হই তার দারসে।

দারসের ফাঁকে মাওলানা আবদুল মালেক সাহেব বলতে শুরু করলেন, এই তোমরা যে এত কষ্ট করে লুকিয়ে লুকিয়ে এইখানে পড়তে আসো, এর কী দরকার? হ্যাঁ, দেওবন্দ আমাদের সেরেতাজ কিন্তু শুধু ইলমের জন্য এখানে আসার কোন মানে নেই,  আল্লাহর রহমতে বাংলাদেশেই এখন যথেষ্ট। তোমরা যে ভিসা ছাড়া বা অন্য প্রদেশের কথা বলে দেওবন্দে পড়-এর কোন প্রয়োজন আছে? এইটা তো নাজায়েজ। এই কথা শুনে আমরা সকলেই থ বনে গেলাম। হতবাক ও বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লাম। বাঙালি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আর যাই হোক দারুল উলূম দেওবন্দের প্রতি ভালেোবাসা ছিল অনেক। তাই একজন আরেকজনের দিকে চোখোচোখি শুরু করলো।

আমিও টেনশনে পড়ে গেলাম। বাঙালি ছাত্ররা জানতো, মাওলানা আবদুল মালেক সাহেবের প্রতি আমার দরদের কথা, ভালোবাসার কথা। ভাবতে লাগলাম, বাংলাদেশী ছাত্ররা কি কষ্ট করে, কি প্রতিকুল পরিবেশ পেরিয়ে দেওবন্দে আসে, দেওবন্দে থাকে তা কমবেশি সবারই জানা।

বাংলাদেশী ছাত্রদের সব বিষয়ই  দারুল উলুম দেওবন্দ কতৃপক্ষ অবগত। তাঁরা প্রত্যেকে স্ব স্ব স্থান থেকে ছাত্রদের সহায়তা করে আসছেন। রাষ্ট্রীয় বহু চাপ এবং সীমাবদ্ধতা থাকা সত্বেও বাংলাদেশীদের ব্যাপারে দারুল উলুম দেওবন্দ এমন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি যাতে তারা রাষ্ট্রীয় চাপে পড়ে কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার সম্মুখীন হয়। এমনকি তাদের ব্যাপারে এ ধরনের কোন ফতোয়াও দেওবন্দ দেয়নি। তাহলে এই ভীনদেশী তিন প্রদেশের ছাত্রদের সামনে কীভাবে তিনি আগ বেড়ে বাংলাদেশী ছাত্রদের দেওবন্দে পড়ার ব্যাপারে না জায়েজ ফতোয়া দিলেন!

পরে তার এই ফতোয়ার কারণে বাংলাদেশীদের সেই তিন প্রদেশের ছাত্রদের কাছে বহু তিরস্কারের সম্মুখীন হতে হয়েছে আমাদের। নানাবিধ চাপের সম্মুখীনও হতে হয়েছে।


আমি বুঝে উঠতে পারিনি তিনি কেন দেওবন্দবিমুখ করছেন শিক্ষার্থীদের। যে মাসআলা পেশ করেছেন তা তো অনেক পূরনো কিসসা। তা উল্টোপথে নৌকা চালিয়ে কী ম্যাসেজ দিতে চাইছেন?


আমি বুঝে উঠতে পারিনি তিনি কেন দেওবন্দবিমুখ করছেন শিক্ষার্থীদের। যে মাসআলা পেশ করেছেন তা তো অনেক পূরনো কিসসা। তা উল্টোপথে নৌকা চালিয়ে কী ম্যাসেজ দিতে চাইছেন? এমন প্রশ্ন দেশের অনেক বড়দের কাছেও আমি করেছি। তারা যা বলেছে এখানে তা উল্লেখ করা সমীচীন মনে করছি না। যা হোক, আমার মনে হয়েছে, বাংলাদেশী ছাত্রদের দেওবন্দ বিমুখ করে তোলার এই হীন কাজটা তিনি না করলেও পারতেন।

দেওবন্দ থেকে ফিরে দেশে এসেও এমন কথা শুনেছি খোদ সেই তাহকীকী মারকায থেকে পড়াশোনা করে আসা তরুণদের মুখ থেকে।

দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে জমিয়তে উলামা হিন্দের গাড়িতে করে মাওলানা আবদুল মালেক সাহেবের দিল্লী সফরে অধমও ছিলাম। তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন মাওলানা ইমদাদ। গাড়িতে পিছনের সিটে হযরত একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলেন আমি আর মাওলানা ইমদাদ মাঝখানের আসনে বসে নানা বিষয়ে কথা হয়। কিছু হালকা বিতর্কও হয়। আমি সেখানে তাকে বলেছিলাম, এই যে আপনাদের উস্তাদগণ সবাই পাকিস্তানে পড়াশোনা করেছেন, এখনো অনেককেই তারা পাকিস্তানে পড়তে যাওয়ার তাগিদ দেন, সেখানে তাদের ভিসা ছাড়া পড়াশোনা কীভাবে জায়েজ হয়? পাকিস্তান বলেই কি সেখানে জায়েজ? আর এখানে দারুল উলূম দেওবন্দ বলেই কি নাজায়েজ হয়ে গেল?

বিষণ্ন মনে চিন্তা করি, আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে হযরত! আপনি পাকিস্তানে বেশ কয়েক বছর পড়াশোনা করেছেন, তারপর সৌদী আরবে চার বছর পড়াশোনা করেছেন, সৌদীতে আপনি কি ভিসাসমেতই ছিলেন?

আরও একটি আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমার যৎসামান্য যে পড়াশোনা শতাব্দীর গৌরব শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ.-এর বিভিন্ন কাজে অন্যদের নাম থাকলেও কোথাও আপনার নাম নেই কেন তা আমাদের কৌতূহলী করে তোলে।

লেখক : ফাযেলে দারুল উলূম দেওবন্দ, ভারত।


মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *