অরুণ কুমার বিশ্বাস ● একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, বাংলাদেশের যেসকল শিশুর বয়স দশ বছরের নিচে, তাদের মধ্যে ৫ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে। বাসা-বাড়িতে কিংবা স্কুলে, যাতায়াতের পথে অথবা নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে এসকল নির্যাতন সংঘটিত হয়ে থাকে, যা আশঙ্কাজনক। এই হার ক্রমশ বাড়ছে। শুধু শিশু কেন, নারী নির্যাতনের ঘটনাও প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। এর পেছনে একটি কারণ অবশ্যই অর্থনৈতিক।
বিশেষত গ্রামেগঞ্জে ও মফস্বল শহরে যেসকল নারী নানাভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হন, তাদের একটি বড় অংশ আর্থিকভাবে অসচ্ছল। যারা নিপীড়নকারী তারা সমাজের ক্ষমতাধর ও উঁচুতলার মানুষ। এর ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়, তবে সমস্যার গভীরে গেলে শিকার ও শিকারির মাঝে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টি সহজেই চোখে পড়ে।
নারীনিগ্রহের ক্ষেত্রে নেপথ্যে যা ঘটে তা হল জমিজিরাত জবরদখল, ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ কিংবা উদগ্র লালসা চরিতার্থ করার জন্য এবং খুব সহজেই সমাজের মোড়ল শ্রেণির টার্গেটে পরিণত হয়। ঘটনা ঘটে যাবার পর মেয়েটি যদি কিশোরী হয় সেক্ষেত্রে তার মা-বাবা আপোশে চেপে যেতে চান, আবার কখনও বা অতি উৎসাহী কেউ কেউ এই বলে তাদের ভয় দেখান যে ব্যাপারটি জানাজানি হলে তার মেয়ের আর কখনও বিয়ে হবে না, সে আইবুড়ো থেকে যাবে। বরং মিটমাট করে নিলে ভাল, কিছু টাকাও পাওয়া যাবে। একদিকে ভীতিপ্রদর্শন অন্যদিকে প্রলোভন- দুইভাবে ক্ষতিগ্রস্তকে বশে আনার চেষ্টা করা হয়। এক্ষেত্রে মেয়েটি শুধু নিপীড়ণের শিকার হয়নি বরং সমাজ কর্তৃক পুনর্বার ধর্ষিতা হল।
আর যদি ধর্ষিতা বা নিপীড়িতা কারো স্ত্রী হন, সেক্ষেত্রে স্বামী লোকলজ্জার ভয়ে নিজে থেকে ঘটনা চেপে যায়, নয়তো ওই মোড়ল শ্রেণির চাপে মনের বিরুদ্ধে আপোশরফা করতে বাধ্য হন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যেন দোষ ধর্ষকের নয়, বরং ওই নারীর যিনি কিনা ধর্ষিতা হলেন। বিষধর সাপের বদলে সবাই তখন ওঝার বিষ ঝাড়তে শুরু করে। এর ফলে পুনর্বার এই ঘটনা ঘটলে কোনো কিশোরী বা নারী ধর্ষকের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলারও সাহস করে না। তাতে কাজের কাজ কিছুই হয় না, শুধু লোকলজ্জা বাড়ে।
এহেন নির্যাতনের ঘটনা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। এর পেছনে কারণটা কি শুধু আর্থসামাজিক, নাকি অন্য কারণও আছে! সাদাচোখে দেখলে আমাদের সমাজে মারাত্মক মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে। নইলে একটা সাতআট বছরের শিশুকে কোনো পুরুষ নিপীড়ন করতে পারে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশুরা নির্যাতনের শিকার হয় তার খুব কাছের মানুষের মাধ্যমে। আবার গৃহকর্তার লালসার শিকার হয় গ্রাম থেকে আসা অতি সাধারণ অসহায় গৃহের কাজের মেয়েটিও।
কেন এমন ঘটছে! এর কি কোনো বিচার বা উপশম নেই! এক্ষেত্রে আইন কী বলে! আইনের ভাষায় যাদের বয়স ১৬ বছরের কম তাদের সম্মতি নিয়ে বা জোর করে- যেভাবেই হোক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করলে তা ধর্ষণ বলে গণ্য হবে। আরা যারা প্রাপ্তবয়স্ক নারী তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন মানেই ধর্ষণ। এক্ষেত্রে আইন ও বিচার যতটা কঠোর, অপরাধ প্রমাণ করা ঠিক ততটাই কঠিন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দুর্বল চার্জশিট ও উপযুক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে আদালতে অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় না বিধায় নিপীড়ক সহজেই পার পেয়ে যায়। আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য ধর্ষণ মামলায় তারা জামিন পেয়ে সহজেই বেরিয়ে আসে।
মানুষ মূলত আইন মানে কারণ, আইন অমান্য করলে সেখানে শাস্তি বা পীড়নের ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু একজন ধর্ষক যখন অপরাধ করেও শাস্তি পায় না বা পার পেয়ে যায়, সে তখন আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তার দেখাদেখি অন্যরাও তখন এই অপকর্ম করতে উৎসাহী হয়। তাই পুঁথিগত আইন নয়, বরং আইনের সুষ্ঠু ও কঠোর প্রয়োগই পারে ধর্ষণের মতো একটি অমানবিক অপরাধের লাগাম টেনে ধরতে। অন্যথায় সম্ভব নয়।
এবার একটু মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় আসা যাক। নারীর উপর শারীরিক নিপীড়ন কি কেবল গ্রামাঞ্চলে কিংবা যার অর্থবল কম তার উপরেই হয়! উচ্চবিত্ত পরিবার বা শহরে কি এসব নেই! অবশ্যই আছে, তবে সেখানে নিপীড়নের ধরন ভিন্ন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বামী কর্তৃক স্ত্রী নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। বাস্তবে দেখা যায় কোনো কোনো উচ্চবিত্ত পুরুষ স্ত্রীর অমতে একাধিক বিয়ে করছেন, তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়তো করছেন না, তবে অমানবিক আচরণের মাধ্যমে তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছেন। শুনতে অসংগত শোনালেও তা সত্যি। এও এক ধরনের নিপীড়ন।
এসব ক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণও খুব সহজসাধ্য হয় না। নিপীড়নকারী স্বভাবতই ক্ষমতাধর বিধায় প্রভাব খাটিয়ে মামলা ভিন্নখাতে পরিচালিত করে থাকে। প্রত্যক্ষদর্শী কম থাকে বা থাকলেও তারা সাহস করে কোর্টে গিয়ে সাক্ষ্য দিতে চায় না। ফলে এসকল মামলায় সুবিচার পাওয়া প্রায় দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু এমন অবস্থা চলতে দেয়া যায় না। এজন্য চাই আমাদের সবার সমন্বিত প্রয়াস। নারী ও শিশু নির্যাতনকারীদের রুখে দেবার দায়িত্ব সরকারের একার নয়, আমরা যারা সচেতন মানুষ তাদের সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে যে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আমরা সবাই মানুষ। কারো সাথে অসভ্য আচরণ করা মনুষ্যত্বের পরিচয় নয়।
নারী ও শিশুদের সাথে সম্মান দিয়ে কথা বলতে হবে। এমন কিছু করা যাবে না যাতে তারা কষ্ট পান। বস্তুত, সভ্যতার শিক্ষা মানুষ পরিবার থেকেই প্রথম গ্রহণ করে থাকে। তাই সন্তানদের লালনপালনের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। সঠিক আদর্শ ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে তাদেরকে যথেষ্ট সময় দিতে হবে। শুধু ক্লাসের উপযোগী পাঠশিক্ষা দিলেই হবে না, মানুষকে সম্মান করা ও তাদের ভালমানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্যও উদ্যোগী হতে হবে। এই দায়িত্ব কেবল রাষ্ট্রের নয়, আপনার আমার সবার।
সর্বোপরি, আইনের কঠোর প্রয়োগ অতীব জরুরি। মানুষ তখনই আইন ভাঙে যখন কোনো অপরাধ করলেও তার যথোচিত শাস্তির বিধান হয় না। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন-২০১০, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা বিধিমালা-২০১৩, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০১৩-২৫ ইত্যাদি আইন ও বিধিসমূহ বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধের জন্য যথেষ্ট।
এত শক্ত আইন ও বিধি বিশ্বের অনেক দেশে নেই। তবে চলমান এই আইন অমান্য করার প্রবণতা বা আইনের কঠোর প্রয়োগের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটবে না। ধর্ষণ, নারীনিগ্রহ ও শিশুদের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চলতেই থাকবে। সভ্যজাতি হিসেবে নিজেদের আর পরিচয় দিতে পারবো না আমরা।
লেখক : কলামিস্ট


