রিফাত জাফরীন : ফুটফুটে কাঁকন ১৫ বছরের দূরন্ত কিশোরী। এই তো সেদিনও ওর চঞ্চলতা যেটা হরিণীকেও হার মানাত। কিন্তু হঠাৎ ক’দিন ধরে কাঁকন ভীষণ দূর্বল আর ক্লান্ত। স্বাস্থ্য খুব দ্রুত ভেঙ্গে শুকিয়ে যেন কাঠ হয়ে গেল মেয়েটা। অল্পসময়ে ওজন এতো কমে যাওয়ায় মা-বাবা চিন্তিত হয়ে পড়েন। শরণাপন্ন হন চিকিৎসকের। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জানা যায় কাঁকনের ডায়াবেটিস!
আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের ধারনা ডায়াবেটিস বুঝি শুধু বড় এবং বিশেষ করে শুধু বয়স্কদেরই অসুখ। শিশু কিশোরদেরও যে ডায়াবেটিস হতে পারে, কাঁকনের মা-বাবার মতো বেশিরভাগ মানুষেরই তা অজানা। অথচ শৈশবে যেসব অসুস্থতা শিশুর মানসিক ও শারীরিক বৃদ্ধিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে, ডায়াবেটিস মেলাইটিস তারমধ্যে অন্যতম। শরীরের কোষগুলো বেঁচে থাকতে ও জৈবিক বিক্রিয়াগুলি পরিচালিত করতে শক্তির প্রয়োজন হয়, যা কোষগুলো গ্লুকোজ থেকে পায়।
আমাদের অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত হরমোন, ইনসুলিন রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে এবং কোষের ভেতরে গ্লুকোজের প্রবেশ এবং কোষে এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে। ইনসুলিন ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। যদি কোনো কারণে শরীরে ইনসুলিনের পরিমাণ কমে যায় বা ইনসুলিন যদি ঠিকমতো কাজ করতে না পারে, তবে শরীরে থাকা গ্লুকোজ দেহকোষের বাইরে জমা হয় এবং একটা সময় পর এই গ্লুকোজ প্রস্রাবের সাথে বের হয়ে আসতে থাকে।
অধিকাংশ শিশুর ডায়াবেটিস হয় যখন তাদের অগ্ন্যাশয় প্রয়োজনীয় পরিমাণ ইনসুলিন তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। এ অবস্থাকে টাইপ-১ ডায়াবেটিস বলে। এছাড়া, ইনসুলিন যথেষ্ট পরিমাণ নিঃসৃত হওয়ার পরও যদি তা যথাযথভাবে কাজ করতে না পারে, তাহলে তা টাইপ-২ ডায়াবেটিস। এ অবস্থায় যেসব কোষের ওপর ইনসুলিন কাজ করে তার সমস্যা থাকতে পারে অথবা ইনসুলিনের নিজেরও গাঠনিক সমস্যা থাকতে পারে। এসব রোগীর দেহে ইনসুলিনের বিপক্ষে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। কিছু ক্ষেত্রে আবার অনেক শিশু টাইপ-১ এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উভয় প্রকার ডায়াবেটিসেই একসঙ্গে আক্রান্ত হয়।
টাইপ-১ ডায়াবেটিসে অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী বিটা কোষগুলো বিনষ্ট হয়ে থাকে। অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষগুলো ধ্বংসের কারণ শরীরের ভেতরেও থাকতে পারে। অজানা কারণেও বিটা কোষ ধ্বংস হতে পারে।
টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে শরীরের ভেতর ইনসুলিনের কার্যক্রমের বিরোধী প্রক্রিয়া চালু হতে পারে। ফলে ইনসুলিন নিঃসরণের হার আগের মতো বা বেশি থাকলেও ইনসুলিনের অভাবে শরীরে যে অবস্থা সৃষ্টি হয়, তা পরিলক্ষিত হয়। ইনসুলিনের আপাত ঘাটতির ফলে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়।
সন্তান গর্ভধারণ সম্পর্কিত ডায়াবেটিসে কিশোরী মেয়েদের আক্রান্ত হওয়ার কথা না থাকলেও যদি তারা এ বয়সে গর্ভধারণ করে, তবে এ ধরনের ডায়াবেটিস দেখা দিতে পারে। গর্ভকালীন এ ডায়াবেটিস প্রথম দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে সন্তান জন্মদানের পর তা আর দেখা না গেলেও অনেক ক্ষেত্রে সন্তান জন্মদানের পরও এ ডায়াবেটিস থেকে যায়।
এছাড়া অন্য কোনো কারণেও ডায়াবেটিস হতে পারে। টাইপ-১ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে সাধারণত এক বছর বয়সের কমবয়সী শিশুদের এ ডায়াবেটিস না হলেও ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হবার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। জিন (মবহব) ঘটিত অটোইমিউন ডিসঅর্ডার হলে শরীরের রোগ প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কোষগুলো শরীরের ভেতরের প্রোটিনকে চিনতে ভুল করে এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে। ভাইরাস সংক্রমন, মাম্পস কক্সাকি ইত্যাদি পরিবেশগত কারণ এ ক্ষেত্রে প্রভাবকের ভূমিকায় থাকে। রক্তে কিটো এসিডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া টাইপ-১ ডায়াবেটিসের প্রধান এবং ভয়াবহতম জটিলতা। এতে মৃত্যুও হতে পারে। পৃথিবী জুড়ে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে, যা আশঙ্কাজনক।
শিশুদের সাধারণত টাইপ-২ ডায়াবেটিস হয়না। তবে দৈহিক স্থূলতা বৃদ্ধির সাথে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার সম্পর্ক থাকায় স্থূল শিশুদের ইদানিং টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফাস্টফুডের প্রতি আসক্তি, কম দৈহিক পরিশ্রম, স্থূলতা ও ওজন বৃদ্ধির ফলে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিনে দিনে বেড়ে যাচ্ছে বহুগুণ। এক্ষেত্রে ইনসুলিনের পরিমাণ স্বাভাবিক বা স্বাভাবিকের চাইতে বেশি থাকলেও দেহের কোষীয় পর্যায়ে ইনসুলিন ডায়াবেটিস লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
শিুশুদের ডায়াবেটিসের লক্ষণগুলোও বড়দের মতো। তবে সবচেয়ে লক্ষণীয় লক্ষণগুলি হলো ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, অধিক পিপাসা ও ক্ষুধা পাওয়া, দুর্বলতা এবং দ্রুত ওজন কমতে থাকা ইত্যাদি। শিশুদের বেড়ে উঠার কোনো এক পর্যায়ে ডায়াবেটিস দেখা দিলে তা তাকে সারাজীবন বহন করতে হয়। পাশাপাশি শিশুদের ডায়াবেটিস তাদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি ও বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। আক্রান্ত শিশুদের বয়োসন্ধিকালও দেরিতে আসতে দেখা যায়।
প্রকৃতপক্ষে ডায়াবেটিস মূলত একটি দীর্ঘস্থায়ী ও দীর্ঘসূত্রী রোগ। দেহের এমন কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নেই, যা ডায়াবেটিস জটিলতায় আক্রান্ত হয়না। দৃষ্টিশক্তি হারানো ও অন্ধত্বের প্রধান কারণ ডায়াবেটিস। হৃদপিণ্ডের ধমনির অসুখ, হার্ট অ্যাটাক ডায়াবেটিসের কারণে হতে পারে। ডায়াবেটিসে বিভিন্ন কর্মবিরোধী প্রক্রিয়া চালু থাকে বলে ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ করতে পারেনা। শিশু কিশোরদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসের কারণে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে।
শিল্পোন্নত দেশগুলিতে শিশুদের ডায়াবেটিস সংক্রান্ত জটিলতা বেশ প্রকট। বাংলাদেশেও অভিজাত পরিবারের শিশুদের এ সমস্যা বেশি দেখা যায়। এসব শিশুরা মূলত টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়। ফাস্টফুড, স্থূলতা, ওজনবৃদ্ধি, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব শিশুদের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার উল্লেখযোগ্য কারণ।
আবার বাংলাদেশ ও ভারতের কিছু এলাকা এবং আফ্রিকা ও জ্যামাইকাতে বিশেষ ধরণের ডায়াবেটিস প্রকোপ দেখা যায়। একে অপুষ্টিজনিত ডায়াবেটিস বলা হয়। এক্ষেত্রে দু’ধরনের ডায়াবেটিস-এফসিপিডি বা ফাইব্রেট ক্যালকুলাস প্যানক্রিয়েটিক ডায়াবেটিস এবং পিডিপিডি বা প্রোটিন ডেফিসিয়েন্সি প্যানক্রিয়েটিক ডায়াবেটিস দেখা যায়। এফসিপিডিতে আক্রান্ত শ্রেণির অগ্ন্যাশয়ে পাথর হয়, কিন্তু পিডিপিডি শ্রেণিভুক্তদের অগ্ন্যাশয়ে পাথর হয়না।
পিডিপিডি শ্রেণিভুক্তরা খুব হালকা পাতলা হয় এবং তাদের অপুষ্টিজনিত বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। চোখে ছানিপড়া ও স্নায়ুবিক দূর্বলতাও থাকে তাদের। তবে ডায়াবেটিসের তীব্রতার তুলনায় তাদের শরীরে কিটো ত্রসিড বৃদ্ধির পরিমাণ কম থাকে। এদের চিকিৎসায় অধিক মাত্রায় ইনসুলিন ইনজেকশন দিতে হয়।
ডায়াবেটিস হওয়ার প্রকৃত কারণ এখন পর্যন্ত পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে পরিবেশ জনিত কারণগুলো ছাড়াও গর্ভকালীন মায়ের অপুষ্টি, কম ওজন নিয়ে জন্মানো, অপরিকল্পিত এবং অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাভ্যাস ইত্যাদি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণ। ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় প্রয়োজন ধৈর্য। রোগীকে এক্ষেত্রে ধৈর্যশীল হয়ে সঠিক পুষ্টি পরিকল্পনা অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সুশৃঙ্খল জীবনযাপন এবং পরিমিত ব্যায়াম এক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শমতো ঔষধসেবনতো রয়েছেই।
জীবনঘাতী জটিলতা এড়াতে রোগ শনাক্ত হওয়ার সাথে সাথেই চিকিৎসা শুরু করা প্রয়োজন। আমাদের দেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশু কিশোরেরা বেশিরভাগই ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা নিয়ে প্রথমবারের মতো চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়, যার ফল ভালো নয়। অথচ আক্রান্ত হবার প্রাথমিক পর্যায়ে ডায়াবেটিস শনাক্ত করা গেলে সঠিক চিকিৎসা, সুশৃঙ্খল জীবনযাপন ও পরিমিত পুষ্টি নিশ্চিত করার মাধ্যমে আক্রান্তদের প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তাই সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশে বারডেম ছাড়া ডায়াবেটিসের চিকিৎসা ও গবেষণার আর কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। সরকারি, বেসরকারি পর্যায়ে তালিকা তৈরির প্রয়াস নিলে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশু-কিশোরদের অনেককেই হয়তো ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা যেতো।
আমাদের শিশুদের স্বাস্থ্য তথা ভবিষ্যৎ আমাদের সচেতনতার ওপর নির্ভরশীল অনেকাংশেই। নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনে অভিভাবকদের যেমন অভ্যস্ত হওয়া জরুরি, জরুরি তেমনি আমাদের শিশুদের নিয়ন্ত্রিত আর সুশৃঙ্খল জীবনযাপনে অভ্যস্ত করানো। প্রয়োজন এ বিষয়ক সচেতনতা সৃষ্টি ও বৃদ্ধি করা। গণমাধ্যমগুলি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ ও শিক্ষকবৃন্দ স্থানীয় জনগণ এবং ছাত্রছাত্রীদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। আমাদের সম্মিলিত সহযোগিতা এবং আন্তরিক প্রচেষ্টাই কেবল পারে আমাদের শিশুদের ডায়াবেটিসমুক্ত জীবন উপহার দিতে।
লেখক : কলামিস্ট


