শেখ নাঈমুল ইসলাম : হেফাজতে ইসলামের নৈতিক ভিত্তি যে কত ঠুনকো তা প্রমাণ করে দিলেন হেফাজত নেতারা। কওমি মাদরাসার সনদের স্বীকৃতি দেওয়ায় ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শোকরানা মাহফিলে হেফাজতে ইসলামের কফিনের শেষ পেরেকটি ঠুকে দিলেন হেফাজত নেতৃবৃন্দ। মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় কোন সম্প্রদায়ের এমন ‘একশত আশি ডিগ্রী’ এঙ্গেলে উল্টো ঘুরে যাওয়া পৃথিবীর ইতিহাসে যুক্ত হওয়া এক বিরল ঘটনা। যেটাকে আমরা ঐতিহাসিক রুজুনামা মাহফিলও বলতে পারি।
প্রশ্ন আসতে পারে এই শোকরানা মাহফিল তো আর হেফাজতের পক্ষ থেকে ছিল না, ছিল কওমি মাদরাসার সনদের স্বীকৃতি দেবে যে সংস্থা, “আলা হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়্যা” তার পক্ষ থেকে। এর উত্তর খুঁজতে আমাদের সুদূর চীনদেশে যেতে হবে না। ঘিলু আছে এমন যে কোন মানুষ মাত্রই জানে যে হেফাজত আর হাইয়াতুল উলিয়া সংগঠন ভিন্ন কিন্তু ডিসিশন মেকার এক। দুই সংগঠনের কাজ ভিন্ন কিন্তু নেতৃবৃন্দ এক শুধুমাত্র একজন ব্যতীত। হেফাজত যেটি করেছে সেটা হল রথ দেখা ও কলা বেচা একসাথে অর্থাৎ হাইয়াতুল উলইয়ার ব্যানারে শোকরানা এবং রুজুনামা দুই মাহফিল একসাথে।
ঘুরেফিরে হেফাজত এখানে আসার প্রাসঙ্গিকতা অনেক। সেইদিকে যাওয়ার আগে চলুন আমরা একটু ফ্ল্যাশব্যাকে যাই। কারণ মানুষ বড় ভুলোমনা। সবকিছু খুব দ্রুত ভুলে যায়। তাই একটু পিছন ফিরে তাকাই-
২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলাম শাহবাগ আন্দোলনের নাস্তিক ব্লগারদের ফাঁসির দাবীতে মহাসমারোহে আবির্ভূত হয়। শুধুমাত্র আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ এবং তার অনুসারী গুটিকয়েক আলেম ছাড়া অন্য সকল আলেমই হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও মহাসচিব ছাড়া আর সমস্ত নেতৃবৃন্দ সরাসরি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। দীর্ঘদিন ধরে তারা বিএনপি জামাতের সাথে হাতে হাত রেখে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ক্ষমতার মসনদে সমাসীন হয়েছেন। আর এ কথা সকলেই জানেন আল্লামা শফী সর্বজন শ্রদ্ধেয় অশীতিপর একজন আলেমে দ্বীন। শায়খুল ইসলাম মাদানী রহঃ এর খলিফা। বার্ধক্যজনিত কারণে হেফাজতে ইসলামের মত এত বিশাল একটি সংগঠন চালানো এবং তার সকল সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার মত অবস্থায় তিনি নেই। সুতরাং সংগঠন চালানো এবং তার সিদ্ধান্ত এই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে কাঁধে তুলে নেন এবং আমরা তখন দেখতে পাই রাসূল সাঃ ও ইসলাম অবমাননার বিচারের দাবিতে যে সামাজিক আন্দোলন শুরু হয়েছিলো তা রূপ নেয় ক্ষমতার মসনদে বসার লোভে সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রে। এবং সেই নাটকের সমাপ্তি হয় ৫ মের ১৫ মিনিটের ক্র্যাকডাউনে।
এদিকে এই পাঁচ বছরে বিএনপি, জামায়াত কোমায় চলে গেছে ঠিক কিন্তু জনবিচ্ছিন্ন লিয়াজোঁভিত্তিক পরজীবী ধর্মীয় রাজনীতিবিদদের ক্ষমতা লাভের অভিলাষ তো আর থেমে যায়নি। সুতরাং আমরা নতুন নাটকের অংশ হিসেবে বেশ কিছুদিন ধরেই সেই কুশীলবদের দেখতে পাই পল্টিবাজী রাজনীতির নতুন উদাহরণ হিসেবে। যাদের আমরা আওয়ামী লীগকে ইসলাম বিরোধী বলে প্রচার করতে দেখেছি, আওয়ামী লীগ আসলে দেশে আর কোন ইসলাম থাকবে না বলে ভোটের রাজনীতি করতে দেখেছি। হেফাজত আন্দোলনের নামে আওয়ামী সরকার উৎখাতের নীলনকশা করতে দেখেছি । খোদার কি লীলাখেলা আজ তারাই আওয়ামী লীগের নৌকাকে নূহের কিশতি ভেবে ইসলাম রক্ষার কোশেশ করছেন এবং এই নাটকের সফল মঞ্চায়ন হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শোকরানা মাহফিলে।
চির আওয়ামী বিরোধী মুফতি আমীনী রহঃ এর সন্তান দাবী করলেন শেখ হাসিনাকে আবারো ক্ষমতায় দেখতে চান, মুফতি ফয়জুল্লাহ তো আগেই বলে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের জন্য তিনি রক্ত দিতে প্রস্তুত। নড়াইলের সিট পেতে শামছুল হক ফরিদপুরী রহঃ এর সন্তান মুফতি রুহুল আমিন তো শেখ হাসিনাকে কওমি জননী উপাধিতে ভূষিত করেছেন। শায়খুল হাদিস আজিজুল হক র.-এর পুত্র আহ্লাদে গদ গদ চিত্তে প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এরশাদের ভায়া হয়ে আওয়ামী সিট পেতে মরিয়া এবং একটি সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী দলের কার্যালয়টিও আওয়ামী লীগের এরশাদ ভায়া হয়ে কিনে দেওয়া। এ সবই নতুন নাটকের সফল মঞ্চায়ন।
এতক্ষণ পিছন ফিরে তাকিয়ে এখন আসুন হেফাজতের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। লক্ষ করলে দেখা যায় উপমহাদেশের মুসলমানদের সবথেকে বড় রাজনৈতিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় বিপর্যয়ের সাথে হেফাজতের একটি গভীর সূত্রপাত আছে সেটি হচ্ছে, ”রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহার, বিরোধী দল ও মতকে দমন করতে ধর্মের ব্যবহার, বিভিন্ন ক্ষমতা লাভে ধর্মের ব্যবহার।”
৪৭ এর দেশভাগের সময় ‘ইসলাম খাতরে মে হে’ এই জিগির তুলে একদল ক্ষমতালিপ্সু এই উপমহাদেশকে টুকরো টুকরো করে দিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের যে অপূরণীয় ক্ষতি করেছে তার দ্বিতীয় কোন নজির নেই। পরবর্তীতে এই বাংলাদেশের জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে পাকিস্তানিরা সেই একই ‘ইসলাম খাতরে মে হে’ বলে জুলুম নির্যাতন করেছে। এবং বাঙালী নিধনের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম গণহত্যা চালানো হয়েছে এই ধর্মের দোহাই দিয়েই। বাংলাদেশ পরবর্তী যুগেও সেই একই ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার একটা প্রবণতা সেই শুরু থেকেই অধিকাংশ ধর্মীয় রাজনীতিবিদদের মধ্যে দেখা গেছে এবং এরই ধারাবাহিকতায় ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক মসনদে বসার জন্য সবথেকে বড় গণজাগরণের নাম হেফাজতে ইসলাম।
হেফাজত আন্দোলনের কুশীলবরা যে আল্লামা শফী দাঃবাঃ এর মত সর্বজন শ্রদ্ধেয় বুজুর্গ আলেমকে সামনে রেখে লক্ষ লক্ষ মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষককে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে ইসলামের নামে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলো তা আজ প্রকাশ্য দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট। এই কারণেই আল্লাহ্ এইসব পদলেহী জনবিচ্ছিন্ন পরজীবী রাজনীতিবিদদের এমন লজ্জিত করছেন। জাতির সামনে সম্মিলিত তওবা করিয়েছেন। যে শাহবাগে যাওয়ার কারণে একজন বুজুর্গ আলেমকে এরা জাতির সামনে লাঞ্ছিত করেছিলো মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় সেই বুজুর্গের সামনেই এবং সেই শাহবাগে বসেই আল্লাহ্ এই ধর্ম অপ ব্যবহারকারীদের রুজু করিয়েছেন। এই হল খোদার বিচার। তিনিই সব করেন, তিনিই সব পারেন।
লেখক : রাজনীতি ও সমাজ বিশ্লেষক


