ছিন্নমূল নারী এবং শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা প্রসঙ্গে
সাঈদ চৌধুরী : নারী চিকিৎসা ও শিক্ষা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ঈর্ষনীয়। সরকার নারীদের ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি ও ক্ষমতায়নে প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছে তা বিশ্বে অনন্য দৃষ্টান্ত। বর্তমানে নারীরা আইনী সেবাও পেয়ে থাকেন খুব সহজেই। এ কাজগুলোকে ত্বরান্বিত করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান, এনজিও প্রতিনিয়তই কাজ করছে । কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে নারীদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার বিষয়টি আপেক্ষিক হারে কিছুটা অবনমিত।
গত বছর অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে একটি সংবাদ আমাদের সারা জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছিলো। একজন নারী অনেকগুলো হাসপাতাল ঘুরেও কোনো হাসপাতালে ভর্তি হতে না পেরে রাস্তায় তার সন্তান প্রসব করতে বাধ্য হন। প্রসব করার কয়েক মিনিটের মধ্যে সন্তানটিও মারা যায়। রাস্তার মানুষ স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মাতৃসদনের মত হাসপাতালে নারী ডাক্তার থাকার পরও ঐ নারী যখন রাস্তায় প্রসব করতে বাধ্য হন, তখন অনেক গুলো প্রশ্নের সম্মুক্ষীন হয় মানবতা এবং তার সাথে আরেকটি বড় প্রশ্নের অবতারনা হয়-চিকিৎসা ব্যবস্থা কি শুধু টাকার বিনিময়ের কোনো নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নাকি সেবাও !
এই নারীর বিষয়টি তুলে আনার জন্য যে যে বিষয়গুলো তাড়িত করেছে তা হলো সব নারীই কি সঠিকভাবে চিকিৎসা নিতে পারছেন অথবা খুব বিপদকালীন সময়ে ইমার্জেন্সি স্বাস্থ্য সেবা পাচ্ছেন?
একটি পোষাক কারখানায় কর্মরত ডাক্তারের সাথে সেদিন কথা হচ্ছিল। তিনি বললেন অনেক পোষাককর্মী গর্ভপাত করে থাকেন। হয়ত অনৈতিক সম্পর্কের কারণে অথবা সন্তান চাওয়ার আগেই সন্তান চলে আসা জনিত সমস্যার কারণে গর্ভপাতের মতো ভয়ানক কাজ অহরহ করে যাচ্ছেন নারীরা। ডাক্তারের ভাষায় এমনও নারী রয়েছেন যাদের গর্ভপাতের সংখ্যা তিনেরও অধিক। এই নারীদের গর্ভপাত যারা করান, তারা কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপরিপক্ক এবং অনভিজ্ঞ। যৌন স্বাস্থ্যের অনেক বিষয়ে নারীরা অনেক ক্ষেত্রে চেপে যান। একসময় বেশি অসুস্থ হলেই কেবল জানা যায় তার আগের ইতিহাস। বন্ধ্যাত্ব থেকে শুরু করে জরায়ু ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে এই অনিয়মিত গর্ভপাতের কারণে। এর সাথে গোপন রাখা রোগের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পাইলস জাতীয় সমস্যাগুলো যা সহজেই নারীরা তাদের স্বামীদের কাছ থেকেও এড়িয়ে যান। এই বিষয়গুলো শুধু যে পোষাক কর্মীদের বেলায় ঘটে তা কিন্তু নয়। এ বিষয়গুলো রাস্তায় বড় হওয়া ছিন্নমূল নারী, সুবিধাবঞ্চিত নারীদের বেলায়ও সমানভাবেই প্রযোজ্য।
এবার আসা যাক শিক্ষার ব্যপারটি। গাজীপুরের মাওনা চৌরাস্তা। খুব জনাকীর্ণ একটি এলাকা । এখানে প্রায়ই একজন মহিলাকে দুজন বাচ্চা সহকারে ঘুরতে দেখা যায় । শুধু এই মা এবং বাচ্চাগুলোই নয়, আরও কয়েকটি পরিবারকেও এভাবে ঘুরতে দেখা যায়। কিশোরী হয়ে ওঠা কয়েকজন মেয়েকেও দেখা যায়। এরা কেউই শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত নয়। হাত পাতে ভিক্ষা করে খায়। বেড়ে উঠছে এবং কোনো কোনো অপ সময়ে তারা ভ্রাম্যমান পতিতার খাতায়ও নাম লিখিয়ে ফেলছে। বঞ্চনার আসল জায়গাটি হচ্ছে এরা একদিকে যেমন শিক্ষা পাচ্ছেনা, তেমনি বখে গিয়ে হয়ে উঠছে সমাজের বোঝা !
ছিন্নমূল নারী, কন্যাশিশু ও কিশোরীদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে না পারলে সরকারের একটি অপূর্ণতার জায়গা থেকেই যাবে । সরকার ছিন্নমূল মানুষদের জন্য অনেক উদ্যোগ নিলেও ভাসমান হয়ে বাঁচার কারণে এই সমস্যাগুলো সৃষ্টি হচ্ছে! যাতে করে নারীরা সহজেই চিকিৎসা সেবা পায় বিশেষ করে ছিন্নমূল ও সুবিধাবঞ্চিত নারীরা, সে জন্য প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে একটা নির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর উপর একটি বাধ্যতামূলক নির্দেশনা থাকা, যাতে রাস্তায় কোনো মানুষ অসুস্থ হলে তারা চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা যায়।
তাছাড়া নারীদের স্বাস্থসেবা নিশ্চিতে বড় অন্তরায় হচ্ছে রোগ সম্পর্কে তাদের অসচেতনতা। সকল নারীই যদি রোগ সম্পর্কে সচেতন হোন, তবে তারা আগেই চিকিৎসকের শরনাপন্ন হবেন এবং এতে করে দক্ষ জনশক্তি পাওয়াও সহজীকরণ হবে। আর এজন্য প্রয়োজন ছিন্নমূল ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের মধ্যে রোগ সম্পর্কে সচেতনতা যা শিক্ষার মাধ্যমেই সম্ভব।
শিক্ষার জন্য ছিন্নমূল কন্যাশিশুদের শিক্ষা ছাতাতলে নিয়ে আসতে হবে। বেশিরভাগ সময়ই শিক্ষাহীনতার কারণে ছিন্নমূল শিশুরা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে এবং সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো বর্তমানে ছিন্নমূল কন্যা শিশুরাও নেশার সাথে জড়িয়ে পড়েছে!
একদিকে যে কিশোরীরা বড় হচ্ছে, তারা শিক্ষা পাচ্ছেনা না ও তারা বখে যাচ্ছে এবং অন্যদিকে বড় হওয়ার পরও তাদের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সঠিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তারা। কাজেই এ ক্ষেত্রে নারীদের নিরাপত্তা কিছুটা হলেও বিঘ্নিত হচ্ছে। যাতে করে ছিন্নমূল কিশোরীদের সঠিক শিক্ষার আওতায় আনা যায়, সে জন্য সরকারের জরুরি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। যে শিশুরা যে যে জায়গায় ভাসমান হচ্ছে, সেখান থেকেই তাদের তুলে নিয়ে ঐ এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার ব্যবস্থা করার প্রক্রিয়া চালু করতে হবে। এজন্য থানা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের আওতায় নারীদের সহায়তায় অনেক প্রকল্প থাকলেও শিক্ষা বিস্তারে এমন প্রকল্প হতে পারে নারী উন্নয়নের বিশাল মাইল ফলক ।
নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা বিস্তার এবং সঠিক চিকিৎসা প্রাপ্তিতে এ বিষয়গুলো নিয়ে আরও বিস্তর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে সরকার। উন্নত বাংলাদেশ গঠনে সর্বস্তরের নারীর সঠিক উন্নয়ন বড় হাতিয়ার হবে। আর যেহেতু এই নারীরা সমাজের অনেকটুকু অংশ দখল করে আছে, সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে এদের অন্তর্ভূক্তি আরেকটি ভালো কাজের সুচনা এনে দিতে পারে। সংশ্লিষ্ট সবাই এ ব্যাপারে নতুন করে ভাববেন ও উন্নত বাংলাদেশ গঠনে নিজেদের মেলে ধরবেন এ আমাদের সকলের প্রত্যাশা। আমরা চাই প্রতিটি কন্যা শিশু, কিশোরী ও ছিন্নমূলনারীর জন্য শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপদ জীবন, কারণ এদের প্রত্যেকেই একদিন মা হয়ে ওঠবে। একেকজন হবে নতুন ভবিষ্যতের জন্মদাত্রী।
লেখক : কলামিস্ট


