কিছু ওয়ায়েজীনদের নিয়ে কাটছে না সংশয়
মাওলানা আমিনুল ইসলাম : আমি সব সময় ওয়ায়েজীনদের (বক্তা) পক্ষে কথা বলি। বক্তাদের পক্ষ নিয়ে ইতোপূর্বে অনেক লেখা আমি লিখেছি। কারণ, ওয়াজ মাহফিলের বক্তাদের দ্বারা বিশাল এক খেদমত চলছে। লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের আত্মার খোরাক জোগান দিয়ে থাকেন ওসব বক্তা ভাইয়েরা।
এখনো পর্যন্ত আমি বক্তাদের পক্ষে। যারা হক হক্কানিয়্যাতের পক্ষে কথা বলে যাচ্ছেন, তাদেরকে মনে প্রাণে সমর্থন জানাই। ওসব বক্তা ভাইদের আরো খেদমতের দ্বার উন্মোচন হয়, সাধ্যানুযায়ী পক্ষে কাজ করার চেষ্টা করি।
তবে বন্ধু, খুবই আফসোস হচ্ছে, বর্তমান সময়ের কিছু কিছু জাহেল, মুর্খ,অশিক্ষিত, অল্প শিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত বক্তাদের নিয়ে।
বড় দুঃখ হয়, ওয়াজের নাম দিয়ে যারা ওয়াজ মাহফিলকে নাট্য মঞ্চ বানায়ে ফেলেছেন।
আজকাল এমন অবস্হা, ওয়াজ মাহফিলের বক্তাদের মুখে কোরআন হাদীসের ওয়াজ নেই। ওয়াজ যতটুকু করেন, তার থেকে আজাইরা প্যাঁচাল বেশী।
গল্প গুজব, আজগুবি কেচ্ছা, দেশী বিদেশী গানের সুরে শ্রোতা মাতানোর চেষ্টা করেন।
জনপ্রিয় হিন্দি গান, বাংলা সিনেমার গান, ভাটিয়ালী গান, সবই বক্তাদের মুখস্হ। ওয়াজ মাহফিলে এসব গান যখন বক্তারা গায়, স্রোতাদেরকে স্মরন করিয়ে দেয় জনপ্রিয় সেসব গানের কথা।
বহু বক্তা এখন সিনেমার ডায়ালগ মুখস্থ করে রেখেছেন। ওসব স্টাইলে বক্তা তার ওয়াজ উপস্থাপন করেন।
বক্তাদের একটা গ্রুপ আছে, যারা ঈমানহারা কথা বার্তা বলেন। ওরা নিজেরা গোমরাহ এবং যারা তাদের ওয়াজ শুনছে, তারাও গোমরাহীর দিকে ধাবিত হচ্ছে।
আর কিছু বক্তাতো একদম কমিকবাজ। সিনেমা নাটকে মানুষ আগে কমিক দেখতে যেত, এখন ওয়াজ মাহফিলের বক্তাই বড় কমিকবাজ।
মানে কিছু বক্তা হায়া শরম এর মাথা খেয়ে ফেলেছেন। কোন লাজ-লজ্জা নেই। ওয়াজের স্টেজে বেফাঁস কথা বার্তা লাগামহীনভাবে বলতে থাকেন। তিনি যে ওয়াজের মঞ্চে আছেন, সেটা যেন একদম ভুলে যান।
এই ভাবে সারা দেশে বহু বক্তার আবিষ্কার হয়ে গেছে। আগে মুষ্টিমেয় কিছু ওয়াজ নসীহত করে বেড়াত। বিশেষ করে দেশের ভাল কোন আলেম, বা কোন যোগ্য ইমাম তাদের মাদ্রাসা মসজিদের খেদমতের পাশাপাশি মানুষের হেদায়েতের উদ্দেশ্যে ওয়াজ মাহফিলে যেতেন। তাদের চলাফেরা ছিল একদম সাদাসিধে। তারা ছিলেন, নির্লোভ। তখনকার সে সব আলেম বক্তাদের মাঝে আল্লাহ ভীতি কাজ করত। তাদের আমলও ছিল ঈর্ষনীয়।
কিন্তু হাল জমানায় বক্তাদের অধিকাংশ এখন কমার্শিয়াল। ইল্লা মাশাআল্লাহ কিছু আলেম বক্তা এখনো ভাল আছেন। তবে বেশীর ভাগ এখন বে- লাইন। আমল আখলাক অনেকেরই ঠিক নেই। শুধু মাল কামানোর উদ্দেশ্যেই ওয়াজ মাহফিল করে বেড়ান।
এসব ওয়ায়েজীনদের নিয়ে জাতি খুব চিন্তিত। ওনারা ওয়াজ মাহফিল কে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন। যে ওয়াজ মাহফিলের ওছিলায় মানুষ হেদায়েতের নুর হাসিল করত, সেই ওয়াজ মাহফিল গুলোর বেহাল অবস্থা।
এখন আর ওয়াজ মাহফিলে মানুষ ইছলাহ হয় কম। মুখলিস আমলদ্বার ওয়ায়েজের বড্ড অভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঠে ময়দানে সব এখন পেশাদার ওয়ায়েজ। অনেকেই নিজের সাংসারিক উপার্জনের রাস্তা বেছে নিয়েছেন ওয়াজের মাহফিলকে।
তবে ওয়াজের ময়দানের কিছু কিছু মুখলিস আমলদ্বার আলেম ছাড়া বাকি প্রায় অধিকাংশ বক্তাদের নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। শরীয়ত বহির্ভুত ওয়াজ এবং যে সব বক্তাদের ওয়াজে মানুষ গোমরাহীর দিকে যাচ্ছে, সে গুলো একদম বন্ধ হওয়া চাই।
যারা মানুষদের গোমরাহ বানাচ্ছেন, তাদের যদি নিয়ন্ত্রণে না আনা হয়, তাহলে ওয়াজ মাহফিল গুলো আরো বিতর্কিত হয়ে যাবে। ওয়াজের মাহফিলে মানুষ আস্হা হারাবে। আলেমদের প্রতি মানুষ আস্হা হারায়ে ফেলবে।
আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক ও সমাজ বিশ্লেষক


